ইনসাফ: মাহবুবা স্মৃতির গল্প



ইনসাফ

মাহবুবা স্মৃতি






ঘড়ির কাঁটাটা ১২টার মধ্যে এসে থেমে আছে! খটখট কোনো শব্দও নেই তাতেএই বাড়িটাও বেশ পুরনো, কয়েক জায়গায় ভেঙে পড়েছেকোনো জীবন্ত মানুষের চিহ্ন চোখে পড়ে নাপড়বে কি করে? মৃতকে তো চাইলেও জীবন্ত করে তোলা যায় না! অন্তত যার সামর্থ্য নেই তার ক্ষেত্রে তো কখনোই সম্ভব নয়

পুরনো সিলিঙে অনেকক্ষণ ধরে লাশটা যে ঝুলছে, বুঝা যাচ্ছে! মাইসা ওর আপুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠে, খুব ভয় পেয়েছে সেঅবন্তী ওর বোনকে জড়িয়ে ধরে ঘরটার দিকে তাকায়, লাশটা চোখে পড়াতে সে- ভয় পেয়ে যায়কি করবে ভেবে পাচ্ছে না সে
সাহস করে ভালো ভাবে তাকায় লাশটার দিকে, তাকিয়েই চমকে উঠে সে!
মেয়েটার বয়স আনুমানিক ১৪ -১৫ হবেমুখটা কেমন মলিন আর ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে, এক ধরনের আতঙ্কও তাতে স্পষ্ট! জিহ্বাটা কেমন অল্প বেরিয়ে আছে মুখেমাইসা মেয়েটার লাশটা দেখে আবার চমকে উঠেঅবন্তী নিজেও সেখানে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে নাওর শরীর কাঁপছেবাড়িতে এসেই বমি করে সেবাড়ির কাজের মেয়ে শান্তা অবন্তীর এমন অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির কর্তৃকে ডাক দেয়, "খালাম্মা গো দেইখ্যা যান, অবন্তী আফায় কেমুন জানি করতাছে.."শাহনাজ বেগম দৌড়ে আসে, "একি! কি হয়েছে তোমার অবন্তী! এমন করছো কেন?" তারপর শান্তার দিকে তাকিয়ে বলে, "চেয়ে দেখছিস কি? যা, তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে আয়" ওদিকে মাইসাও মাথা ঘুরে পড়ে যায়জীবনে কখনো লাশ দেখেনি সেআজ ১ম লাশ দেখলো, তা- ঝুলন্ত লাশ! ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক

মাইসাকে খাটে শুইয়ে দেয়া হয়অবন্তী যখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়, তখন সে চাচীকে সব খুলে বলেসব শুনে শাহনাজ তাড়াতাড়ি অবন্তীর চাচা আশরাফকে খবর দেয়ওর চাচা এলাকার একজন প্রতাপশালী চেয়ারম্যানজানা যায় পুলিশ গিয়ে লাশ নামিয়ে থানায় নিয়ে গেছে ময়নাতদন্ত করার উদ্দেশ্য
অবন্তী রাতেও স্বাভাবিক হতে পারে নাসে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এতো অল্প বয়সে একটা মেয়ে মরতে যাবে কেন! আজ দুপুর নাগাদ ঢাকা থেকে গ্রামে আসে অবন্তী আর মাইসাপুরনো বাড়িতে কখনো সেভাবে যাওয়া হয়নিতাই ছোট বোনকে নিয়ে সে বিকেলে তাদের পুরনো বাড়িতে ঘুরতে যায় কাউকে কিছু না বলেইওর চাচা আশরাফ উদ্দিন শুনে খুব রাগ করেছেন, "এভাবে কাউকে কিছু না বলে যাওয়াটা একদমই ঠিক হয়নি তোমার জায়গাটা বেশি ভালো না.."! অবন্তী চুপচাপ সব শুনেকিন্তু স্বপ্না নামের যে মেয়েটি মারা গেল, সেটার রহস্য সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না! এতো অল্প বয়সে একটা মেয়ে গলায় দড়ি দিতে যাবে কেন? শান্তা যা বলেছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়সে বলেছে, "আফা জানেন না, আমনেগোর পুরান বাড়িতে ভূত আছে, রাইতের বেলা ভূতগুলান বের হইয়া নানারকম গণ্ডগোল করেএইজন্য সন্ধ্যার পর ওদিক দিয়ে কেউ যায় নাস্বপ্নায় মনে হয় ঐদিক দিয়া যাওনের সময়.."শান্তা আর কিছু বলতে পারে নাওর চোখে-মুখে ভয় স্পষ্ট অবন্তী বিষয়টা নিয়ে কার সাথে কথা বলবে বুঝতে পারছে না" নোমান ভাইয়া থাকলে জানা যেতো, আসলেই বাড়িতে ভূত আছে কিনা"
নোমান অবন্তীর চাচাত ভাইদুপুরে আসার পর থেকে অবন্তী নোমানকে দেখতে পায়নিরাত হয়ে গেছে, এখনো বাড়িতে আসেনি"আশ্চর্য!চাচা-চাচীর কোনো চিন্তাই হচ্ছে না!"
পরেরদিন অবন্তী শান্তার কাছ থেকে যা শুনলো, তা ছিল আরো অবিশ্বাস্য! "আফা জানেন খবর পাইছি, মাইয়াডায় পোয়াতি আছিলপোয়াতি মাইয়াগোরে তো ভূতেরা এট্টু বেশিই ধরেতারে যে কোন মরায় কইছিল পুরান বাড়ির দিকে যাইতে!" কথাগুলো বলে শান্তা গালে হাত দিয়ে বসে থাকে
"এতোটুকুন মেয়ের বিয়ে কবে হলো শান্তা?" অবন্তী জিগ্যেস না করে পারে নাশান্তা নিজেও থতমত খেয়ে যায় প্রশ্ন শুনে"আফা এইডাতো আমি ভাইব্যা দেহি নাই এতোক্ষণ! আরে..এই মাইয়ার তো বিয়া হয় নাই! তাইলে বাচ্চা আইলো কেমনে পেটে! ছি ছি.. কারো লগে বোধহয় অবৈধ সম্পর্ক আছিল আফা.. নইলে বাচ্চা আইবো কেমনে বিয়া ছাড়া?" কথাটা বলেই শান্তা ফিক করে হেসে দেয়অবন্তী রেগে যায় শান্তার কথা শুনেঅবন্তী কিছুতেই বুঝতে পারছে না আরো বেশি অবাক হয়েছে যখন শুনলো, পুলিশ এই লাশের ব্যাপারে তদন্ত করার কথা বললেও লাশ নাকি বাড়িতে দিয়ে চলে গেছে

"তদন্ত করে তো আর কোনো লাভ নাই স্বপ্নার মা, তোমার মেয়ের পেটে বাচ্চা ছিলমানুষ জানাজানি হবে সেই ভয়ে গলায় দড়ি দিয়েছেলোক জানানো থেকে তোমাকে বাঁচিয়েছেতারচেয়ে বরং মেয়ে যেনো শাস্তি না পায়, সেজন্য উপরওয়ালার কাছে দোয়া করোসেটাই ভালো হবে তোমার জন্য" পুলিশ যখন কিছু করতে পারবে না বলে চলে যায়, তখন স্বপ্নার মা আশরাফ উদ্দিনের বাড়িতে আসলে তাকে এটা বলেই সান্ত্বনা দেয় অবন্তীর চাচা স্বপ্নার মা কয়েক ফোটা চোখের পানি ফেলে চুপচাপ সেখান থেকে বাড়ি চলে যায়এতোক্ষণে নিশ্চয় লাশটাও কবর দেয়া হয়ে গেছে!
অবন্তীর মন খারাপ হয়ে যায় ভীষণতাছাড়া ওর চাচা তেমন কথাবার্তাও বলছে না এবার ওর সাথেঅন্যসময় আসলে কতো খুশি হয়চাচীকেও তেমন খুশি দেখাচ্ছে না ভুল সময়ে ভুল জায়গায় কেউ এসে পড়লে প্রিয় মানুষগুলোও কখনো কখনো বৈরী আচরণ শুরু করেঅবন্তীর সাথে সেটাই হচ্ছে এখন
আজ অবন্তীদের চলে যাবার কথা বিকেলের দিকেযাওয়ার আগে সে স্বপ্নার মায়ের সাথে একবার দেখা করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়চাচীকে বলেছিল, ওনি সহজভাবে অথচ কঠিন গলায় না করে দিয়েছেন"শুনো অবন্তী, তোমাকে খুব স্নেহ করি, তারমানে এই না যে তুমি যা খুশি তা করে বেড়াবে মরা বাড়িতে যাবে কেন তুমি? পুকুরঘাটে গিয়া মাছ ধরা দেখোতোমার নোমান ভাই বাড়ি আসছে, তার সাথে গল্প করো, ভাল্ লাগবে.."
কিন্তু দুপুরের দিকে সবাই যখন বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত, সেই ফাঁকে সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েমানুষদের জিগ্যেস করে করে অবশেষে স্বপ্নাদের বাড়িতে আসেএকটা ভাঙা দুচালা ঘর৭বছরের একটা মেয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে আছেদেখেই বুঝা যাচ্ছে, ক্ষুধার্ত সেঘরের ভিতর বছর তিনেকের আরেকটা মেয়েকে দেখা যাচ্ছেমাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেআর স্বপ্নার মা বসে আছে দরজায়দৃষ্টিতে একধরনের শূন্যতা, বাচ্চাটা যে চকির নিচে রাখা বটিটার দিকে এগোচ্ছে, সেদিকে ওনার কোনো খেয়ালই নেই
"আপনার মেয়ে হাত কেটে ফেলবে! ধরুন ওকে" অবন্তী ভয়ে চিৎকার করে উঠেস্বপ্নার মা চমকে তাকায় দরজায় দাঁড়ানো মেয়েটার দিকেতারপর বাচ্চাটাকে বটিটা থেকে দূরে সরিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেন

"তোরাও মইরা যা, তোরা বাঁইচা থাইক্যা কি করবি! আমার স্বপ্না মা' যহন বাঁচবার পারলো না, তোরা কি করবি!" এই বলে আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকেন তিনিঅবন্তী গিয়ে তাড়াতাড়ি ধরে স্বপ্নার মাকে"কাদবেন না প্লিজ.."
"তুমি কেডা মা?" স্বপ্নার মা মিনারা বেগম অবাক হয়ে জিগ্যেস করে
"আমি আশরাফ চাচার ভাতিজি.. " কথাটা শুনেই মিনারা বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়তারপর রাগত স্বরে বলেন, "এই হানে কি?''
অবন্তী বলে, "আসলে... স্বপ্নার ব্যাপারে মানুষ যা বলছে, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ওর আসলে কি হয়েছিল?"
"হাঁচা কইলে কি হইবো? আমার নাতনিরে ফিরাই দিবার পারবা?" চকির উপর যে স্বপ্নার দাদি শোয়া, খেয়ালই করেনি সে
"আমার নাতনি বেশ্যা ছিল না, হেয় গলায় দড়িও লয় নাই" এই বলে স্বপ্নার দাদি শুয়ে শুয়ে কাঁদতে থাকেনমিনারাও এবার দরজার পাশে বসে কাঁদতে থাকে, "স্বপ্না..
স্বপ্নারে.. মারে তুই কই গেলিরেজা লিমরা তোরে বাঁচতে দিলো না.."
"কি হয়েছিল ওর?"
"আমার মাইয়ায় খারাপ ছিল না, বিশ্বাস করো মাহেয় গলায় দড়িও লয় নাই, খুব বালা ছাত্রী আছিলঅষ্টম শ্রেণিতে পড়তোগায়ের রংডা ফর্সা আছিল, পাড়ার ছেলেরা খুব জ্বালাইতো বাপমরা মাইয়াডারেতোমার চেয়ারম্যান চাচার পোলায়ও জ্বালাইতোহেয় একদিন খালি বাড়িত আইসা আমার মাইয়াডারে...স্বপ্নারে...চেয়ারম্যান এর কাছে গেলে আমারে চুপ থাকতে কয়পুলিশেও কিছু করলো নাবাচ্চা হইছে, অহন তো মানুষ জানাজানি হইতো, আমরা তোমার চাচার কাছে যাইওনি পরে দেখছেন বইল্যা আমাদের চইল্যা আসতে কয়হেইদিনই আমার মাইয়াডারে নোমান ঘর থাইক্যা পুরান বাড়ি ডাইক্যা নিয়া যায়ঘরে ওর অচল দাদি আছিল শুধু তারপর..."মিনারা এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন

"আমার মাইয়ায় খারাপ আছিল না মাআমার নিরপরাধ মাইয়াডা বিচার না পাইয়াই মইরা গেল, মইরা গেল ক্যান কইতাছি! হেরে তো মাইরা ফেলাইছেআল্লায় বিচার করবো তাগো..স্বপ্নারে...!"
অবন্তীর হাতপা কাঁপছে আর কিছু বলতে পারে নাকোনো মতে স্বপ্নাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে মাঝরাস্তায় বসে কাঁদতে থাকেঅনেকক্ষণ ধরে কাঁদে সেসে যে ঢাকায় যাবে, তার যে বাড়ি যাওয়া দরকার সব ভুলে সে স্বপ্না মেয়েটার জন্য কাঁদতে থাকেনিজেকেও ধিক দেয় সে, অপবিত্র কিছু রক্তের দাগ ওর শরীরেও যে লেগে আছেনিজের চুল টেনে ছিঁড়তে থাকে একটা পর্যায় ক্ষমতা এতো খারাপ কেন? ক্ষমতা ভালো মানুষকে নিকৃষ্ট প্রাণী হিসেবে যেমন প্রমাণ করে, তেমনি খারাপ একটা মানুষকেও ক্ষমতা সমাজের চোখে সর্বোৎকৃষ্ট প্রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেকিন্তু অবন্তী বিষয়টা কোনোভাবেই নিতে পারছে না কাঁদতে থাকে চিৎকার করেবড় বেশি আবেগপ্রবণ মেয়ে অবন্তীওর কান্নার বেগ বাড়তে থাকেহঠাৎ আকাশ কেঁপে বৃষ্টি ঝরতে থাকে..

পরেরদিন অবন্তীকে জেলে ঢুকানো হয় চাচাত ভাই নোমানকে হত্যার দায়েজেলে বসে অবন্তী তৃপ্তির একটা হাসি দেয় উপরের দিকে চেয়ে হ্যাঁ সে পেরেছে..একটা অসহায় মেয়ের মৃত্যুর পর হলেও ইনসাফ দিতে সে পেরেছেতবে অবন্তীর আচরণে অনেক বেশি অস্বাভাবিকতা দেখা যায়তাকে অন্য কোথাও পাঠানোর চিন্তা করতে হচ্ছে পুলিশকে!


No comments

Powered by Blogger.