সাঈদ কামালের গল্প: আম কাহিনি


আম কাহিনি

সাঈদ কামাল



সম্রাট ভাইকে নিয়ে কৃষকদের একটা মিটিংয়ে যাচ্ছিসিনজেনটা নামীয় কীটনাশক কোম্পানির বিভিন্ন ওষুধের
আলোচনা হয়ে থাকে এসব মিটিংয়েআমি ইতিপূর্বে বেশ কয়েক বার অংশ গ্রহণ করেছিমন্দ লাগে না ওদের আলোচনাগ্রামের নির্জনতার মধ্যে সরল কৃষকদের সৎ পরামর্শ বিলিয়ে দেওয়া দেখতে আনন্দ হয়তাছাড়া দোকানে বসে থাকার পাশাপাশি ঘুরে বেড়ানো, নতুন জায়গার সঙ্গে পরিচিত হতে বেশ লাগেএকগুঁয়েমি কাটেঅল্প সময়ের জন্য হলেও মন ফুরফুরে হয়

আষাঢ় মাসের প্রথম দিকের সময়বেশ কদিন বৃষ্টি নাইআকাশ উত্তপ্তমেঘের ছায়াও নাইআবহাওয়া এমন যে বৃষ্টি যখন শুরু হয় তখন থামে না, রোদ শুরু হলে না পুড়িয়ে শেষ হয় না আগের আবহাওয়া কত মিষ্টি ছিল রোদের মধ্যে একটা মায়া মায়া ভাব থাকত, শীতের মধ্যে স্নিগ্ধতা থাকত, বর্ষার মধ্যে স্নেহ থাকতকিন্তু সময়ের ব্যবধানে ঋতুগুলো ভয়ংকর রকম বিদ্রোহী হয়ে গেছেঅসহ্য করে ছাড়ে মানুষদেরপ্রকৃতির স্রষ্টা হয়ত মানুষ নিষিদ্ধতায় আসক্ত হওয়ার দরুণ এক আধটু অসন্তোষ হনযার পরিণাম আবহাওয়াতে প্রভাব ফেলেদোকানে বসে চায়ের পর পান মুখে নিয়ে সম্রাট ভাই বাইক স্টার্ট করে বললেন, -‘এবার যাওয়া যাক, ওরা অপেক্ষায় আছে
আমি বাইকে ওঠে বসে বলি, -‘আজ কোথায় মিটিং?’
সম্রাট ভাই বললেন, -‘মুন্সির হাটের দক্ষিণ দিকের একটাগ্রামেরাস্তা ভালো না থাকায় হোন্ডা ধীরে চালাতে বাধ্য হতে
হয়উঁচুনিচু গর্তময় রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে যায়উত্তপ্ত রোদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলি যেআপনাদের সিঙ্গাপুর, না?’ সম্রাট ভাই হাসেনমৃদু গলায় বলেন, ‘কত মজা যে করেন

একটা সিএনজি সাইট নিতে গিয়ে পুকুরের মত গোল গর্তে অর্ধেক ডুবে যায়সম্রাট ভাই সেদিকে তাকিয়ে বলেন,-‘ঢাকা শহরই ভালোদুদিকে পানি রোড হয়েছেতবে দুঃখের ব্যাপার হলো পানি গাড়ী এখনো চালু হয় নি
হেসে হেসে বলি, ‘যেহেতু পানি রোড হয়েছেপানি গাড়ীও হবেনৌকার মত পানির উপর দিয়ে গাড়ী চলবেআমাদের অপেক্ষা করতে হবে সে উন্নয়নের জন্য
সম্রাট ভাই বলেন, ‘আমাদের অপেক্ষা করতে হবেসুস্থ্য, সুন্দর, নিরাপদ জীবনের জন্যতারপর আমাদের পরবর্তীরা অপেক্ষা করবেএই অপেক্ষার শেষ কবে?’
আমি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলি- ‘মুন্সির হাট আসছেকোনদিকে যাবেন?’
সম্রাট ভাই বললেন- ‘উত্তর দিকে

মুন্সির হাট বাজার পার হয়ে দক্ষিণ দিকে যেতে থাকিপথে একটু সময়ের জন্য থামি এই কারণে যে, একটি বকুল ফুলের গাছ দৃষ্টি স্থিত হয়রাস্তার এক পাশে বাইক রেখে ছোট আল দিয়ে খানিক সময় হাঁটিএক পাশে পুকুর অন্যপাশে পতিত জমিপুকুর পাড়ে মসজিদমসজিদের সামনে বকুল ফুল গাছপ্রথমে আমরা দু’জন পুকুর পাড়ের সিঁড়ির উপর বসিসম্রাট ভাই তাঁর ব্যাগ থেকে দুটো আম বের করে বললেন, ‘গাছের আম, আপনার জন্য এনেছিলাম, নেন, ধুয়ে নেনসম্রাট ভাইকে ধন্যবাদ দিয়ে পুকুরের জলে আম ধুয়ে সিঁড়িতে সম্রাট ভায়ের সঙ্গে বসিআম দুটো সম্রাট ভাযের হাতে দিইসম্রাট ভাই অবাক হলেন নাপুকুরের জলে ভেসে থাকা বকুল ফুলের পাতার দিকে তাকিয়ে কাব্যিক ঢঙে বললেন, ‘আজো তার লাগি আম খান না? আমের কিইবা দোষ, হৃদয় নিয়েছে যে বীণা তাঁরই তো নেই হুঁশ’‘ওর নাম কি বীণা ছিল?’ খানিক পরে আমি বলি
সম্রাট ভাই হেসে হেসে বলেন, ‘যার নামও জানেন না, তার জন্য এই ত্যাগ
নাম জানেন আপনি?’-আবার প্রশ্ন করি
সম্রাট ভাই আমের খোসা ছড়াতে ছড়াতে বলেন, ‘আমিও তাঁর নাম জানি না
কত বছর হয়ে গেল না?’ আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সম্রাট
ভাই ফের প্রশ্ন করেন
হ্যাঁ, সাত বছর তিন মাস কুড়ি দিন ঘণ্টাবললাম আমি
আমার হিসেব দেখে সম্রাট ভায়ের অবাক হওয়ার কথা ছিলবাহ বলার কথা ছিল কিন্তু তিনি সেসব কিছু না করে বললেন, ‘ভাবী কি জানেন আম কাহিনি?’
মাথা নেড়ে বলি, ‘হ্যাঁ, বিয়ের দ্বিতীয় রাত্রিতেই জানিয়েছি
আমার চোখে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তিনি আবারো বললেন, ‘বাচ্চারা জিজ্ঞেস করে না আম না খাওয়ার কাহিনি?’
হাসতে চেষ্টা করে বলি-‘জিজ্ঞেস করলে মিথ্যা বলি না
-‘সত্য বলেন?’
-‘সত্যও বলি না
-‘তবে?’
-“বলি, অনেক দিন আগে একজন আম খেতে দিয়েছিলসেদিন ছিল সোমবারআষাঢ়ের প্রথম দিকের সময়খুব রোদ ছিলগরমে হাঁপিয়ে উঠেছিলামসেদিন তোমার সম্রাট আংকেলের সঙ্গে একটা মিটিংয়ে গিয়েছিলামমিটিং শেষ করে যখন ফিরে আসি তখনই ঘটে ঘটনাটাএকজন বসতে বললউঁনার দিকে তাকিয়ে না বসতে ইচ্ছে হল নাঅল্প সময় পরে উঁনি আম কেটে নিয়ে এলেনআমি উঁনার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা সুন্দর পুষ্প বাগান দেখিসে বাগানে অনেক পাখিশাদা পাখি, সবুজ পাখিউঁনি যখন বললেন-‘আম খানআমি শুনিনি কিছু তোমার সম্রাট আঙ্কেলও বললেনদুবারশুনিনিআমি তো পুষ্প বাগান দেখিসে বাগানে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখিতোমার সম্রাট আঙ্কেল ধাক্কা দিলেনতখন ঘোর ভাঙে এবং বলি, ‘আম খাব নাসেও বলল, ‘খুব সুস্বাদু আম, খেয়ে দেখেনআমি মাথা নেড়ে না করিমেয়েটি আমার কোলে মাথা রেখে মিহি গলায় প্রশ্ন করে, ‘কিন্তু আম খেলে না কেন আব্বু?’ আমি হেসে উত্তর দিই, ‘সে ছিল আমার অপিরিচতঅপিরিচিত কারো থেকে কিছু খাওয়া কি ঠিক? তুমি কি কখনো খাও? এই যে দেখো নেত্রকোনায় কেমন একটা ঘটনা ঘটে গেল

ফাতেহা আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে- ‘তা ঠিক না, আমিও খাই না, কিন্তু সম্রাট আঙ্কেলের তো পরিচিতসে হিসেবে তুমি খেতে পারতে, না?’
-‘সে সময় তো এমন করে ভাবিনি আম্মাজান
-‘কিন্তু এখন খাও না কেন?’
আমি ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলি, -‘তুমি তো বুড়ি আম্মাজানতোমার বুঝতে পারার কথা
ফাতেহা খিলখিল করে হেসে বলে, -‘বুঝতে পারছিআম সামনে এলেই তুমি পুষ্প বাগান আর পাখি দেখ, তাই না, আব্বা?’
আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলি, -‘ঠিক বুঝতে পারছকিন্তু আম্মাজান তোমার এই যে এত বছর হল, বুড়ি হলে তোমার চুল তো পাকেনি?’
ফাতেহা আমার দিকে তাকায়, গলায় হাত রাখে, -‘আমি কি দাদির মত বুড়ি হয়েছি নাকি? দাদি হলেন বড় বুড়ি আমি ছোট
বুড়িছোট বুড়িদের চুল যে পাকে না তাও জানো না, কি যে বোকা তুমি
আমার কথা শেষে সম্রাট ভাইও হাসেন-‘খুব পাকনা বুড়ি হয়েছে আপনার আম্মাজানকিন্তু সেদিন আপনার আম না খাওয়ার রহস্য কি?’
-‘কি বলব ভাই, সাত বছর আগের এক দুপুরের কথাআমার আটাশ বছরের জীবনে সেদিনই প্রথম মুগ্ধ হইএর আগে গল্পে উপন্যাসে মুগ্ধ হওয়ার কথা জেনেছিকিন্তু মুগ্ধতা আসলে কি যে ভয়াবহ যন্ত্র সেদিনই প্রথম বুঝতে পারিবুঝতে পারি বুকের ভিতর একটা নারীমুখ চিরদিনের মত বন্দি হয়ে গেছেতাকে আর কখনই কোন ভাবে সরানো যাবে নাচারপাশে তাঁর হাসি সুঘ্রাণ বকুল ফুলের মত ছড়াবেকিন্তু বুঝিনি এমন একটা নিষ্ঠুর বেদনা হাহাকার করে আমাকে পোড়তে থাকবে
আমার কাঁধে হাত রেখে সম্রাট ভাই বললেন, -‘আম খাননি কেন সেটা বলেন?’
দাঁড়িয়ে বকুল ফুলের ঢেউ খেলানো পাতায় হালকা টান দিয়ে তিনটি ছোট তারার মত ফুল হাতে নিয়ে ঘ্রাণ নিই- ‘আমার কাছে মনে হয় বিষয়টা এমন-একবার কোন এক ফেরেশতা বেহেশতের নারীকে দেখে জ্ঞান হারিয়েছিলেন- ঠিক সে সময়ে আমিও ফেরেশতার মত হয়ে গিয়েছিলামযখন আমার জ্ঞান ফিরে আমি আর সে আমি থাকতে পারি নাআমার ভিতর কি যে প্রবেশ করে, ভালো থাকার মত ওষুধ কিংবা বেদনার মত কাঁটা অথবা বিদ্যুতের আলোর মত ঝকমকে এক টুকরো সুখ অথবা মৃত্যুর মত হারানোর ভয়তখন আমি যেন আমি ছিলাম নাআমাকে যেন নিয়ন্ত্রণ করেছিল অন্য কেউহয়তো সেহয়ত তার হাসিহয়ত তার চোখের বাগান বা উড়তে থাকা সেসব পাখিরাআমি তখন আম খাব কেমন করে? যখন আমাকেই খাচ্ছিল অন্য কেউ?’
সম্রাট ভাই খানিক্ষণ চুপ করে থাকেনকি যেন ভাবেনসে মুহূর্তে আমাদের পাশে দুটো বাচ্চাকে দাঁড়াতে দেখলামসম্রাট ভাই ওদের নাম জিজ্ঞেস করলেনআমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেনবললেন, -‘উঁনি কবিআমার দুটো বই বের হয়েছে অলসল্প লিখি সম্রাট ভাই বেশ ভালো করে জানতেনকারণ তিনি আমার লেখা মাঝে মধ্যে পড়েনআমার
একটা গল্পের বই পড়ে শেষ করেছেনপ্রথম শেষের পৃষ্ঠা মুখস্তও করেছেনবাচ্চাদের একজন বলল, -‘নজরুলের মত লম্বা চুল রবীন্দ্রনাথের মত দাঁড়িদুকবি একজনের ভিতরএকটা কবিতা শুনান
ওদের কথা খুব ভালো লাগলো এই কারণে যে, ওরা বুড়ো খাটাশদের মত লম্বা চুল দাঁড়ি দেখে আলবদর বা জঙ্গির মত কোন উপমা প্রয়োগ করেনিএই জন্যই বোধয় ওদের ফেরেশতার সঙ্গে তুলনা করা হয়যারা নিষ্পাপযন্ত্রণা দিতে জানে নাঅথচ দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই ফুলের মত, ফেরেশতার মত শিশুদের একটা শ্রেণি ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছেবাচ্চারা তো সুন্দরের নক্ষত্র, অতি আদরের, ভালোবাসার, চোখের মণি, হৃদয়ের অস্তিত্বআমার দুটো বাচ্চা আছে তা আমি বুঝতে
পারিভয় লাগে এই রকম একটি দেশে সন্তানের নিরাপত্তার আশংকা নিয়ে বেচেঁ থাকতে হয়এদেশ উন্নয়নের দেশঅগ্রগতির দেশচারপাশে বর্ষার জলের মত উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়ছেআইন সবল সুবিচারের আস্থা যে আছে পদে পদে বুঝতে পারা যায়কিন্তু যারা পদ্মা সেতুর দোহাই দিয়ে ব্যাগে করে কল্লা নিয়ে ঘুরে সেটাকে গুজব বলেএটা কেমনে বলে বোধ করতে পারি নাআর এসব দেখে রাষ্ট্র কেমন যন্ত্রের মত স্বাভাবিক থাকে তাও বুঝতে পারি নাকল্লা না হয় ব্রিজের জন্য লাগলো না কিন্তু বাচ্চাদের কল্লাহীন হওয়ার সূত্র যে বের করতে হবে উদ্বেগ কারো নাইআজব রাষ্ট্রবাচ্চাদের দিকে তাকাইবলি- ‘কবিতা আমি কম লিখিগল্প আমার প্রিয়কবিতার চেয়ে গল্প লিখতে ভালোবাসি বেশিঅল্প সময়ে তো গল্প পাঠ করে শেষ করতে পারব নাবাচ্চারা আড়দৃষ্টে আমাকে দেখলএকজন জিজ্ঞেস করল, -‘তবে
আমি ম্লান গলায় বললাম, ‘গান করি একটা, কি বলো?’

দু’জন হো হো হেসে বলল- ‘খুব ভালো
এমনিতেই ওর কথা মনে করে বুকের ভিতরটা হঠাৎ যেন সমুদ্রের নোনা জলে ভরে গেছেযে জল যেকোন সময় চোখ দিয়ে বৃষ্টির মত ঝরে পড়বেতখন কী হবেসম্রাট ভাই নিশ্চয় ভালো দৃষ্টিতে দেখবেন না মন্দ ধারণা করবেনপাঁচ বছর সংসার দুসন্তানের জনক হয়েও সাত বছর আগের আম খাওয়ার ঘটনা স্মরণ করে যে মানুষে চোখে পানির বন্যা হয় সে
অবশ্যই খারাপ একটা মানুষএমন ধারণা হওয়া তো স্বাভাবিকতাই, নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, কেঁদো না মজনুশান্ত
হওযখন একা হবে যত ইচ্ছে কেঁদোচোখ ভরে জল ফেলোএকটা নদী বানিয়ে সাঁতার কেটোকিন্তু এখন হাসোকিছু হয়নি এমন ভান করোমুচকি হেসে ওদের দিকে তাকালাম, নাম জিজ্ঞেস করে বললাম,-
একটা সাঁওতালি গান শুনাই?’
ওরা দু’জন একসঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, -‘তবে দারুণ মজা হবে
ওদের দেখে আমার পথের পাঁচালি উপন্যাসের কথা মনে পড়ে দু’জন যেন দূর্গা অপুর প্রতিচ্ছবিভাবলাম, অল্প সময় যদি ওদের হাসাতে পারি নিশ্চয় এই সময়টির হিসাব সৃষ্টিকর্তা নিবেন নাএই সময়টুকু কেন্দ্র করে নিশ্চয় আমার জন্য অল্প ভালো সময় আসবেকিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল, ওদের হাসাতে পারলামতাতে আমার ভেতরটাও হাসবেযেহেতু বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছি তাই বকুল ফুলের একটা গান শুনাই?’
দুজনে একসঙ্গে বলল, -‘সোনা দিয়া দাঁত কেন বান্ধাইলা এই গান বলেন
একটা আম ওদের দিকে দিয়ে বললাম, -‘দুজনে মিলে একটি আম খাওআর আমি গান শুনাই
আমার গলা অসুন্দরতবুও ওদের আনন্দ দিয়ে নিজে আনন্দ পাওয়ার লোভে বীভৎস গলায় গান শুরু করলামগান শেষ করে ওদের কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করি -‘কেমন লাগছে?’
দু’জন খিলখিল করে হেসে বলে, -‘হেব্বি ভালো লাগছেমজা পাইছি
ওদের থেকে বিদায় নিয়ে মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে যেতে শুরু করিসম্রাট ভাই জিজ্ঞেস করলেন, -‘আপনার মন ওর প্রতি এত আকর্ষণ করতো জানাননি তো কখনোআমাকে জানাতেন তখনবলি- ‘বেশ কয়েক মাস ওর খোঁজ নিয়েছিজিজ্ঞেস করেছি অনেককেযেহেতু তাঁর নাম জানতাম নাতাই সঠিকভাবে জিজ্ঞেস করতে পারতাম না কিছুতখন ওখানের অনেকদের সঙ্গে মোটামুটি বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপন করিতাতে লাভ হয় নি কিছুসঠিকভাবে ওরা কিছু বলতে পারত না আমি তাদের বুঝাতে পারতামতবুও কেউ যখন বলল, ওর বাড়ি তো নওগাঁএখানে বেড়াতে এসেছিলআমি জিজ্ঞেস করি নওগাঁর কোথায়? ওরা সঠিকভাবে কিছুই জানাতে পারেনিতবুও নওগাঁ গিয়েছিলামমিঠাইপুর গ্রামেপাইনি ওকেআবার এখানে এসে সন্ধান করে ব্যর্থ হইমানুষের তো একটা পরিচয় থাকেপরিচয় ছাড়া বিশ্লেষণ দিয়ে মানুষ পাওয়া সম্ভব নয়দেড় বছরে আমার অবয়ব পাল্টে গিয়েছিলরাতে ঘুম না হওয়ার দরুণ মাথাও কেমন যেন
করতোআমার মুখ আশ্চর্য রকম কালো হয়ে গিয়েছিলশরীর ভেঙে এক অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছিলামতারপর আব্বা আমার দিকে ফিরলেনবুঝতে বুঝাতে চেষ্টা করলেন এবং আমাকে বাধ্য করলেন বিয়ে করতেতখন আর কি করার ছিল আমার? কি করতে পারতাম?’
সম্রাট ভাই অবাক হয়ে পিছনে ফিরে আমাকে দেখলেন- ‘এত পাগল হয়েছিলেন বুঝতে পারিনি এত কাছাকাছি থেকেওওর জন্য মন আজোও কাঁদে আপনার, না?’
বলি -‘না, ছিল আমার প্রথম মুগ্ধ হওয়ার বাগানপ্রথম ভালো লাগার ঠিকানাসেই আটাশ বছরে যখন আমাকে পৃথিবীর কিছু ভালো লাগাতে পারেনিকোন নারী স্পর্শ করাতে পারেনি ঠিক সে সময়ে সেই হয়ে গিয়েছিল আমার সব কিছুর প্রথমঅথচ তাকে একবারের অধিক দেখার সুযোগ হয়নিআমার হৃদয় যার এক টুকরো হাসি দেখার জন্য সাত বছর ধরে ছটফট করে, যার বিরহে আজো আমি গভীর ঘোরে ডুবে থাকি তাঁর জন্য আমার হৃদয় কাঁদে নাউন্মাদের মত তার
দর্শন চায়ভাদ্রের কাঠফাটা রোদে মানুষ যেমন শীতল হাওয়া চায়, প্রচুর যন্ত্রণায় মানুষ যেমন ব্যথা মুক্ত হতে চায়, আমার হৃদয় তেমনি তাকে একবার দেখতে চায়আমার হৃদয় কাঁদে না শূন্য হৃদয় কখনো কাঁদতে জানে না
-‘তবুও তো সংসার নিয়ে বেশ আছেন
-‘তা আছিভালো লাগার বেদনা এমনই এর ভাগ একজনকে নিতে হয়অন্য কাউকে বুঝতে দেওয়া যায় না
সম্রাট ভাই অনেক সময় কথা বলেন নাআমিও চুপ করে থাকিরাস্তার দুপাশের বিল দেখিমিটিংয়ের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে কোম্পানির দুজন অফিসারের সঙ্গে দেখা করিএকজন বলল- ‘এত দেরি করে এলেন যে সব মানুষ তো চলে গেলনামাজের পর মিটিং শুরু হবেচলেন নামাজ পড়ে আসি
এখানে আহলে হাদিস বেশিযোহরের নামাজ ওরা বিশ মিনিট আগে পড়েতাই বিলম্ব না করে মসজিদের পথে যাচ্ছিঠিক সে মুহূর্তে তাকে দেখলামসেই তাকেসাত বছর আগে যাকে দেখেছিলামঠিক একি রকমঅপরূপহাসল তেমনি করেযে হাসি অচিন জগতেরযে হাসি এক নিমিষে খুন করতে পারেপ্রাণ দিতে পারেকপালে অনুস্বারের মত ঘাম যেন মুক্তারআমি তাকে দেখলাম সাত বছর পরহাসছে সেযার মুখের দিকে তাকালে পৃথিবীতে বসন্ত শুরু হয়আনন্দেরা ভিড় করেযার চোখে পুষ্পের বাগানসে বাগানে পাখিরা উড়ে উড়ে বহু দূরে যায়দাঁড়িয়ে থাকলামসে দাঁড়ালদুজন মুখোমুখি দৃষ্টি কি কোনদিন ফেরাতে পারব? ফেরানো সম্ভব কি?
-‘আম খাবেন? সাত বছর ধরে আমি আম খাই নাআপনার জন্যআম খাবেন?’
কে কথা বলছে? পাখির কণ্ঠে? কে? নিজেকে মনে মনে প্রশ্ন করিসাত আসমানের উপর থেকে কেউ নাকি সাত সমুদ্রের ওপাড় থেকে কেউ নাকি স্বর্গ গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে কেউ? বজ্রপাতে মানুষ যেমন স্থির হয়ে যায় আমি তেমনি হইভুলে যাই কে আমি, কোথায় দাঁড়িয়ে আছিসে আবার বলল, -‘এই যে আমি আপনার জন্য দাঁড়িয়ে আছি সাত বছর ধরেবিশ্বাস করেন সাত বছরে আমার
হৃদয়ে আপনি ছাড়া কেউ আসেনিসেদিন আপনি আম খেলেন না কেন? আহা-যদি খেতেনআমি কথা বলতে চেষ্টা করেও পারলাম নাযেন বোবা হয়ে গেছিআমার জিভ কোন পাথরের সঙ্গে যেন আটকে গেছেসে আবার রিনরিনে গলায় সাত বছর পর বলল-‘আম খাবেন?
খুব মিষ্টি আম
অনেক চেষ্টা করেও আমি কথা বলতে পারলাম নাজিহ্বা এক বিন্দু নাড়াতে পারলাম নাআমার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছেদৃষ্টি একদিকে স্থির হয়ে গেছে
সম্রাট ভাই আমার পিঠে মৃদু থাপড় দিয়ে বললেন, -‘এইতো সেই, যার জন্য সাত বছর অপেক্ষায় আছেনআম খাবেন নাকি জিজ্ঞেস করছেআজও কি আম খাবেন না?’
আমি যেন নড়তেও পারছি নানিজেকে মনে হচ্ছে জীবন্ত ভাস্বর্যযে সবকিছু শুনতে পায়, দেখতে পায় কিন্তু নড়তে পারে না, কথা বলতে পারে নাঅথচ তার কত কথা বলার আছেবুকের ভিতর উষ্ণ বরফের বিক্রিয়া হওয়ার কথাসাত বছরের জমানো কথা, বেদনার কথা, প্রেমের কথা, ভালো লাগার কথা, আম না খাওয়ার কথা





No comments

Powered by Blogger.