‘বারুদের মুখোশ’ অথবা বিনির্মিত বাস্তবতা: মুহিম মনির


‘বারুদের মুখোশ’ অথবা বিনির্মিত বাস্তবতা


মুহিম মনির 



মন বলে, সকল শিল্পের মধ্যে একটা অভিন্নতা আছে; অভিন্ন যোগাযোগ আছে; গোপন সুঁতোয় গেঁথে আছে একে অপরের সঙ্গে সে গল্প-কবিতাই হোক কিংবা কোনো চিত্রকলা সকলেরই শ্রী বাড়ায় কিছুটা নীরবতা, নৈর্ব্যক্তিকতা অব্যক্ততার আকুলতা না মিললে শিল্পের অতুলতা খুব বেশি মেলে না
মুহিম মনির

কে না জানে জীবনের গল্প? অক্ষরজ্ঞানও তো আছে অনেকের। তাহলে কাগজ নিলাম, যা দেখেছি লিখে গেলাম আর করেই লেখক হয়ে উঠলামবিষয়টা এমন কি? হয়তো কারো কারো কাছে; কিন্তু কালের কাছে, শিল্পকলার কাছে এমনটা নয় মনে হয়। তাই বলা কথাই একটু অন্যরকম করে বলতে হয়। বিকল্প বাস্তবতা গড়তে জানতে হয়। নইলে সাহিত্য-পদবাচ্য সেই সৃষ্টির থেকে সংবাদ-গদ্য অধিক নান্দনিক তো হতেই পারে
এসব সাতপাঁচ যে সকলেই জানে, তা আমিও জানি। তবু আসল কথায় আসার আগে ওদিকটা থেকে একটু ঘুরে এলাম বা বলা যায় ফজলুল কবিরীর 'বারুদের মুখোশ' আমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে এল
প্রচ্ছদ
বারুদের মুখোশ প্রকাশক: বাঙলায়ন প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল প্রকাশকাল: একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৫

*
যা ভালো লাগলো না, তা যে ভালো না, এমনটি কখনোই নয়। আসলে কেনো কিছু মূল্যায়িত হয় কে মূল্যায়ন করছেন তাঁর নিজস্ব দর্শনের ওপর। একজন গড়পড়তা পাঠকের বাইরে বেশিকিছু নই আমি। তাই সাহিত্যমান-বিচারের মাপকাঠি আমার আয়ত্তে নাই (আরোধ্যও নয়) আমি শুধু আমার পাঠের কথা বলে যাই। তাও অন্য কারো মতো করে নয়
বলতে দ্বিধা নাই, 'বারুদের মুখোশ'-এর একাধিক গল্পে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার হুবহু ব্যবহার লেখকের সাহসিকতার পরিচয় দিলেও বুঝতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ভাগ্যিস কয়েকজন চাটগাঁইয়া বন্ধু ছিল, নইলে সেসব সংলাপ অনেকটা অবোধ্যই থেকে যেত। মৃত মা যে কত দরদভরা কণ্ঠে তাঁর সন্তানকে শ্বাপদসঙ্কুল পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছেন, তা বুঝতে না পারলে 'মা তার হলুদ বোরকা' মতো এত সুন্দর গল্পের পাঠ নিঃসন্দেহে বিঘ্নিত হতো। হচ্ছিলও
যে, শুরুতেই শিল্পের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা বললাম, তা এজন্য যে, এই বইয়ের অন্তত তিনটি গল্প কবিতার মতো সুন্দর! বেশ ভালো লেগেছে গল্পগুলো

*
'
মা তার হলুদ বোরকা' 'মড়কের মৌসুম' 'বারুদের মুখোশ' গল্পগুলোয় লেখকের দৃষ্টিরেখা যতোটা গভীরে গড়িয়েছে, যতোটা নৈর্ব্যক্তিকতায় ফুটে উঠেছে বর্তমান বাস্তবতা, তা আমাদের সমসাময়িক গল্পে খুব বেশি দেখা যায় না
যদিও যাঁরা চোখকান খোলা রাখেন তাঁরা শুরুতেই অনেকটা আঁচ করে নিতে পারবেন, বুঝতে পারবেন 'কুকুর' কিংবা 'অজগর' আসলে কী বা কারা? রক্তের সঙ্গেই বা তাদের সম্পর্কে কী কিংবা কেন? তারপরও গল্পকারের গল্পগাঁথুনির গুণে বইটা বন্ধ করতে পারবেন না তাঁরাও
কিন্তু 'মা তার হলুদ বোরকা' কুকুরের আক্রমণ কিংবা 'দাগ' গল্পে শেয়ালের আক্রমণ অনেকটা একই হয়ে গেছে কি? হলেও একে ঠিক পুনরাবৃত্তি বলবো না, বলবো যে, আমরা এখনও এই বেড়া থেকে বেরুতে পারিনি বলেই আমাদেরকে একবার কুকুরে খায় তো আরেকবার শেয়ালে। অজগরও গিলে খায় পাহাড়ি মানুষের স্বপ্ন। যেজন্য কবিরীর মতো সময়-সচেতন শিল্পীর কলমে লেখা হয়--
. '...এমন ফুলেল ঘ্রাণময় বাগানে এতগুলো দুষ্প্রাপ্য কুকুর এল কেমন করে সে বুঝে উঠতে পারে না। -বাড়িটা আসলে কার? ভিনদেশি দাতার অর্থায়নে এমন সুন্দর ইমারতটি গড়েছে কেউ। তারা কুকুর ভয়ানক ভালবাসে।' (মা তার হলুদ বোরকা)
. '...যুবকের স্থির অবিচল সংকল্পে ভরসা পেয়ে নিজেদের পথকে সঠিক যথাযথ ভাবতে কসুর করে না। তারপর একদিন পরিকল্পনা মোতাবেক মধু ফুলের বনে ছিটিয়ে দেয় বারুদের গুঁড়া। তাগুতি আইনের বিরুদ্ধে তাদের অবিচল বিশ্বাস আরও পোক্ত হয়। আক্রমণের প্রথম ধাপে শত শত হলুদ প্রজাপতি সঙ্গীতরত অবস্থায় নিমেষে ধুলোয় মিশে যায়। -ঘটনায় নগরের উষ্ণ মানুষেরা শোকে মুহ্যমান হয়ে যায়। প্রজাপতিগুলোর সারা শরীরে লেপ্টে থাকে মরিচের গুঁড়ার মতন টকটকে লাল রক্ত। এসব প্রজাপতিই ছিল নগরীর শোভাবর্ধনের সর্বশেষ প্রতীক।' আর এই যুবক যখন ধরা পড়ে, তখন তার 'দীর্ঘ আলখাল্লা মুখোশ খুললে শৈশবের সে-বালককে কেউ খুঁজে পায় না। চেহারায় ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে।' (বারুদের মুখোশ)
কিসের প্রতিহিংসা? নিজেদের পরাজয়ের? যে মনে করিয়ে দেয়, আমাদের ইতিহাস আর রাজনৈতিক অপচর্চা। যা বাকরুদ্ধ করে ফেলে। আমরা লজ্জিত হই

*
ফজলুল কবিরী, পাঠশেষে আমার মনে হলো, আপনার গল্পপাঠের সময় পাঠক যদি অখণ্ড মনোযোগ জোগাতে না পারেন, তবে তাঁর প্রাপ্তি তেমন কিছু হবে না হয়তো। তবে একবার লুকোনো সৌন্দর্যের হাতছানি পেলে তিনি আচ্ছন্ন হয়ে যাবেন খুব সহজেই। আর কে না জানেন, আমাদের গল্পরাজ্যের যুবরাজ বলেছেন, 'একটু ভাবলেই বোঝা যায়, যা আমাদের মনোযোগ দাবি করে না, তার কোনো মূল্যই থাকতে পারে না'?
এখন কথা হচ্ছে, এই যে একাডেমিক পড়ালেখার প্রচণ্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও সময় নিয়ে আপনাকে পড়লাম, দু-চার কথা লিখে পাঠানুভূতি জানালাম, এজন্য আপনাকে কী জরিমানা করা যায়, বলুন তো? আপনার পাঠক হিসেবে একটা জিনিসই চাই, আমাদের দেশকালের যে হালচিত্র আপনি তুলে ধরেছেন, তুলে ধরছেন, তা এমনই অব্যাহত রাখুন!
আপনাকে অভিবাদন, প্রিয় কথাশিল্পী




1 comment:

Powered by Blogger.