দায়: মাহবুবা স্মৃতির গল্প


মাহবুবা স্মৃতি


দায়

"মেয়েদের মতো আপনি এভাবে নাক টেনে কান্না করছেন কেন?" কথাটা শোনা মাত্র সামনের চেয়ারে বসে থাকা মানুষটা এবার শব্দ করে কান্না জুড়ে দেয়ডাক্তার ইলারা হক অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকায়মনে মনে খুবই বিরক্ত সেএমন পুরুষ মানুষ ইলারা কোনোদিনও দেখেনিকয়েকমিনিট চলে যাওয়ার পরও যখন কান্না থামার কোনো লক্ষণ পেলো না লোকটার, এবার জোরেই ধমকে উঠে, "মেয়ে মানুষের মতো কান্না না করে থামবেন আপনি! আমার আরো অনেক কাজ আছে, এখানে বসে থেকে আপনার কান্না শোনার মতো সময় নেই.." ধমক খেয়ে হোক কিংবা- ভয় পেয়েই হোক, মানুষটা চুপ হয়ে গেছে, আর কিছু বলছে না সে। শুধু একটু পর পর মাথায় হাত দিয়ে টুপিটা ঠিক করছে।হঠাৎ কান্না থামিয়ে টুপির প্রতি কোনো মানুষ এতো মনোযোগ দিতে পারে, জানা ছিলো না ইলারার। কপাল কুঁচকে তাকালো লোকটার দিকে
শুকনো শরীর রোদে পুড়ে তামাটে রং ধারণ করেছে, গালভর্তি লম্বা দাঁড়ি, পরনে লুঙ্গি আর সাদা রঙের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির কয়েক জায়গায় ফুটো থাকলেও কোনো সূক্ষ্ণ হাতের স্পর্শে জায়গাগুলো সুন্দরভাবে সেলাই করে দেয়া আছে। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে চোখেই পড়বে নাইলারা ভালো ভাবেই লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করছে, বয়স পঁয়ত্রিশের বেশি হবে না। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, বয়স একটু বেশিই মনে হচ্ছে। অভাবের তাড়নায়ও হতে পারে!

"আশ্চর্য! অভাব কতো ভয়ঙ্কর জিনিস! মুহূর্তেই মানুষকে পাল্টিয়ে দিতে সক্ষম! খারাপকে ভালো, ভালোকে খারাপ হতে এই অভাবই মুখ্য ভূমিকা পালন করে!'' আপনমনে বিড়বিড় করে ইলারা। মাথা থেকে অভাবের চিন্তা সরিয়ে সামনে বসা লোকটার দিকেই আবার মনোযোগ দেয় সে। লোকটা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে এখন চিন্তিত, বুঝা যাচ্ছে
-"নাম কি আপনার?"
-"জ্বি, মো: রমিজ উদ্দীন মুন্সী, আমি মাদ্রাসার শিক্ষক।"
-"আচ্ছা, নার্সের কাছে জানতে পারলাম আপনি আমার কাছে এর আগেও নাকি কয়েকবার এসেছিলেন... কেন বলুন তো?"
-"জ্বি... আপা সমস্যা..."
-"কিন্তু আমি তো গাইনোকোলজিস্ট…"
-"জ্বি জানি আপাআমি সেইটার জন্যই আসছি..."
-"ঠিক আছে বলুন, কার কি সমস্যা? আর রোগীকে না এনে আপনি আসলেন কেন?"
-"আমার সাথেই আছে.."
-"তাহলে রোগী কোথায়? ভিতরে নিয়ে আসুন"
কথাটা শোনামাত্র রমিজ আবারো শব্দ করে কান্না করতে থাকে। ইলারাও পূর্বের মতোই হুজুরকে ধমকে উঠে
"কান্না না করে সমস্যা বলুন।"
"আপা... আপনে আমার বউটারে আল্লাহর মেহেরবানি কইরা বাঁচান... বউটা আইজ এক সপ্তাহ ধইরা খুব কষ্ট পাইতাছে।"
ইলারা নড়েচড়ে বসলো এবার, "কেন? কি হয়েছে আপনার স্ত্রীর?"
কাঁদতে কাঁদতে লোকটা যা বললো, তাতে ইলারা বিস্মিত আর রাগে ফেটে পড়ে
-"কোন যুগে আছেন আপনি? রোগী কোথায়? এখুনি আমার চেম্বারে নিয়ে আসুন" রমিজ বেড়িয়ে যায় তার স্ত্রীকে নিয়ে আসার জন্য। যাওয়ার সময়ও মাথার টুপি ঠিক আছে কিনা দেখে নিচ্ছে!
মনে মনে ইলারা রমিজকে ইচ্ছামতোন গালি দিতে থাকে!
"যতোসব আহাম্মকের দল! বউ আজ এক সপ্তাহ যাবৎ কষ্ট পাচ্ছে, রক্ত পানি ভাঙছে, তবুও হাসপাতালে নিয়ে আসার নাম নেই! যখন হুশ হলো, তখন আবার মহিলা ডাক্তার দরকার! এই যুগে এসেও..." ইলারার বিড়বিড় থেমে যায় রমিজের সাথে রমিজের বউকে দেখে! মেয়েটা রমিজের মতোই শুকনো। চোখ দুটো গর্তের ভিতরে, তবে তা অনেক বেশি স্বচ্ছ। বয়স অনেক কম মেয়েটার। রমিজের চেয়ে প্রায় তের-চৌদ্দ বছরের ছোট হবে। সুন্দর মুখটাতে মাতৃকষ্ট ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। বোরখার ভেতর থেকে একটা লিকলিকে হাত দিয়ে কোনোমতে রমিজকে ধরে আছে মেয়েটি। ইলারা ভিতরে ভিতরে চমকে উঠলেও নিজেকে সামাল দিয়ে রোগীকে বসতে সাহায্য করে। মেয়েটা কষ্টে কাতড়াচ্ছে। রমিজ তখনো বিষণ্ণ মনে বউকে ধরে ইলারার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখভরা তার পানি, যার অর্থ অনেকবেশি গভীর!
"আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"
"জ্বি বউ..."
"আপনার বউ কোথাও চলে যাচ্ছে না। আমাকে দেখতে দিন।"


"জ্বি.." রমিজ অস্পষ্ট স্বরে কথাটা বলেই আবার কাঁদতে থাকে..
ইলারার বিরক্তের সীমা থাকে না
"আপনি কাঁদছেন কেন? এমনিই রোগীর অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না, তারমধ্যে আপনি করছেন আরেক নাটক! বের হোন রুম থেকে।"
"আপা ওনারে যাইতে দিয়েন না, ওনি কষ্ট পাইবো, তাছাড়া ... আমার ভয় লাগতাছে, ওনি আমার পাশে থাকুক.."
মেয়েটি ইলারাকে কথাগুলো বলেই তার বরের দিকে তাকায়, "কাইন্দেন না আপনি! দেখবেন আল্লাহর রহমত আর আপনের দোয়ায় আমার কিছু হইবো না।" রোগীর কথা শুনে ইলারার বিস্ময়ের সীমা থাকে না! মেয়েটা বাঁচবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই; সে করছে স্বামীর চিন্তা! স্বামীকে দিচ্ছে অভয়! বাঙালি নারীর এটা বড় গুণ, যা' কিছু হয়ে যাক না কেন, সান্ত্বনা দিতে পারে বেশ
আর কিছু না বলে ইলারা রোগীর জরায়ু মুখটা পরীক্ষা করে।আলট্রাতে যা দেখাচ্ছে, অপারেশন ছাড়া উপায় নেই।বাচ্চা উল্টো+শুকনো অবস্থায় পড়ে আছে। এবং যতোদূর বুঝতে পারলো বাচ্চাটাও ক্রিটিকাল মুভমেন্টে রয়েছে। নার্সকে ডেকে বলে,
-"নার্স, অপারেশন থিয়েটারে দ্রুত রোগী নেয়ার ব্যবস্থা করো। এখনি সিজার করা লাগবেআর আপনি বণ্ড সই দিয়ে দিন কাগজে..."!
ইলারা টেবিল থেকে একটা কাগজ নিয়ে রমিজের দিকে এগিয়ে দেয়। কিন্তু রমিজ কাগজ কলম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
-"কি হলো, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সই করুন... বললাম তো, সময় নেই হাতে!"
-"আপা বউটারে সিজার না করাইলে হয় না... মানে.."
অগ্নিচোখে তাকায় ইলারা রমিজের দিকে
-"কি বললেন আপনি? আবার বলুন.."
-"না মানে আপা..." ইলারার চোখের দিকে তাকিয়ে রমিজ আর কিছু বলতে পারে না
-"আপনার বউয়ের গর্ভফুল জরায়ু মুখে এসে আটকে গেছে, বাচ্চা শুকনো স্থানে রয়েছে, তা- উল্টোআর আপনি কিনা
-"আপা আল্লায়.."
-"কি? সিজার করলে পাপ হবে! একজন মানুষকে বাঁচাতে সিজার করা লাগবে, সেটা যদি পাপ মনে করেন... বেশ, রোগীকে নিয়ে এখুনি আমার চেম্বার থেকে বের হোনযান বলছি..." রাগে ইলারার হাত-পা কাঁপছে। যদিও মেয়েটার জন্য তার খারাপ লাগছে। মেয়েটা যে কষ্ট পাচ্ছে খুব, কষ্টকে সহ্য করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে.. ওর চোখ-মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। কয়েক সেকেণ্ডই মনে হয় অনেক দীর্ঘ সময়!
"কি হলো, আপনি এখনো রোগীকে নিয়ে যাচ্ছেন না কেন?"
"আপা ভুল হইছে.. আপনে.." ইলারা যেই তাকালো রোগীর দিকে, দেখে রোগীর একলামশিয়া হচ্ছে, দ্রুত গিয়ে রোগীকে ধরে সে
"নার্স, স্যালাইনের ব্যবস্থা করো।" এবার আর সে রমিজের কোনো কথাকেই পাত্তা দেয় না। নার্সের সহায়তায় রোগীকে OT'তে নিয়ে যাওয়া হয়। রোগী যে তাঁর বরের হাত খিঁচুনি হওয়ার সময়ও ধরে ছিল, সেটা চোখ এড়ায়নি ইলারার! বাঙালি মেয়েরা পারে বটে! এতো কষ্টের মাঝেও স্বামীভক্তি কমবে না!
রমিজ বিমর্ষ চোখে ot' সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, আরেকবার গিয়ে বারান্দায় দাঁড়ায়। মনে মনে সে আল্লাহকে অবিরত ডেকে যাচ্ছে।কয়েকবার মানতও করে ফেলেছেতবুও যদি তার বউ আর বাচ্চাটা সুস্থ থাকে।রমিজের বউয়ের নাম তাবাস্সুম। বছর পাঁচেক আগে বিয়ে করে সে। বাচ্চা নেয়ার জন্য অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করেছে দুজন, কিন্তু তাবাস্সুমের গর্ভে বাচ্চা আসার মাস তিনেক যেতে না যেতেই কোনো না কোনো কারণে পেটের বাচ্চা নষ্ট হয়ে যেত।এবার খুব সাবধানেই ছিলো ওরা।রমিজ যখনি সময় পেত,বউয়ের যত্ন নিতো। বড় ভালোবাসে সে বউকে

একজন নার্স বেরিয়ে আসলে দৌড়ে যায় নার্সের কাছে
"আমার বউটা কেমন আছে এহন? "
"রোগীকে অচেতন করা হয়েছে হুজুর, ইলারা ম্যাম বলেছে রোগী আর বাচ্চার অবস্থা নাকি খুবই খারাপ.. কিছু বলা যাচ্ছে না.."
চলে যাবার জন্য পা বাড়ায় নার্স, কি ভেবে থেমে পিছনে রমিজের দিকে তাকায়, "আসল কথাই তো বলা হলো না আপনাকে, রক্তের ব্যবস্থা করুন দ্রুত.. "" পজিটিভ রক্ত লাগবে। রক্ত ছাড়া অপারেশন সম্ভব না। কারণ রোগীর শরীরে রক্ত একেবারেই নেই। আমাদের কাছে ১ ব্যাগ ছিল, ঐটা দেয়া হচ্ছে.. আরো ৪ ব্যাগ লাগবে।" কথাটা বলেই নার্স আর দাঁড়ায় না। ভিতরে চলে যায়। নার্স কথাগুলো এতো দ্রুত বলে যে রমিজ অনেক কিছুই বুঝতে পারে না। শুধু বুঝেছে, বউয়ের অবস্থা ভালো না; রক্ত লাগবে
রমিজ ২ ব্যাগ রক্ত নিয়ে এসেছে প্রায় ঘণ্টাখানেক হলো। বাকি ব্যাগ রক্ত যোগার করতে পারেনি সে। তবে ডাক্তার ইলারা বলেছেন, আপাতত এইটুকুতেই চলবে। পরে কখন লাগবে জানাবে
ডাক্তার ইলারাকে প্রথম খুব রাগী মনে হলেও এখন রমিজের কাছে ইলারাকে ফেরেশতার মতো মনে হচ্ছে। রমিজ মানত করে, 'যদি বউ বাচ্চা সুস্থ থাকে তাহলে একটা ছাগল আল্লাহর নামে এতিম মিসকিনকে খাওয়াবে, সেখানে ডাক্তার ইলারাকেও থাকতে বলবেন। শুধু থাকতেই বলবে না, বলবেন ওনি যেনো নিজ হাতে এতিম বাচ্চাগুলোকে খাওয়ান। তাতে ওনারও সওয়াব হবে।'
ডাক্তার ইলারা বের হওয়া মাত্র সে তার মনের কথাটা জানায়। ডাক্তার ইলারার চোখ যে অশ্রুসিক্ত,  সেটা রমিজ খেয়াল করেনি। সে কি কি করবে এক বাক্যে শেষ করে। ইলারা কি বলবে ভেবে পায় না!
মানুষ বড় আজব প্রাণী। খারাপ মুহূর্তেও তারা এমন কিছু কাণ্ড করে বসে, যেখানে কোনোভাবেই চুপ থাকা যায় না, রাগও হয় প্রচণ্ড! কিন্তু ইলারা রাগলেন না। সে দেখলো রমিজের চোখ-মুখ আবার বিমর্ষ হয়ে গেছে
-"আপা, আমার বউ আর বাচ্চা বাঁচবো তো?"
ইলারার খারাপ লাগে, যেটা বলার জন্য সে এসেছিল, সেটাই বলতে পারলো না। আবার রমিজকে সংবাদটা দিতেও মন চাইছে না। বেচারা কতো আশা নিয়ে আছে। কিন্তু তবুও তাকে সত্যিটা বলতেই হবে... তাই সে এবার গলার স্বর স্বাভাবিক করে বলার চেষ্টা করে,
-"রমিজ সাহেব, আপনি মেয়ের বাবা হয়েছেন। কিন্তু বাচ্চাটার অবস্থা ক্রিটিকাল। যদি ২টা দিন আগে নিয়ে আসতেন তাহলে হয়তো সুস্থ .."
-"আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ ভরসা!"

কথাটা বলে রমিজ চুপ হয়ে যায়কিছুক্ষণ বাদেই আবার ইলারার দিকে তাকায়
-"তাবাস্সুম! সে কেমন আছে আপা?"
-" তাবাস্সুম.."
-"কি হইলো আপা? চুপ কইরা আছেন যে?"
-"রমিজ সাহেব, তাবাস্সুমকে যখন নিয়ে এসেছিলেন তখন রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। সিজার না করলে বাচ্চাটাকেও বাঁচানো যেতো না।কিন্তু..
তাবাস্সুমের এখন পর্যন্ত জ্ঞান ফিরছে না। আমরা চেষ্টা করছি দু’জন ডাক্তার.."
রমিজ এবার ইলারার হাত ধরে কেঁদে ফেলে
"আপা আমার বউটারে যেমনে হোক বাঁচান, বড় মোহাব্বত করি দুজন দুজনরে.. বাপ-মা ছাইড়া আমার কাছে চইল্যা আইছিলআর আমি বউটার কোনো যত্নই নিতাম পারলাম না ঠিকমতোন..ডাক্তারের কাছেও নেই নাই.. আপনি বউটারে বাঁচান.. আমি বড় ভুল করছি.."
-"এখন আর এসব বলে কি লাভ? সময় মতো না আসলে আল্লাহকে ডাকুন।" এই বলে ইলারা আর দাঁড়ায় না। ভিতরে চলে যায়। ভিতরে গিয়ে তাবাস্সুমকে আরেকবার দেখে, নাড়ী পরীক্ষা করে। রোগীকে দেখেই নার্স নাসরিনকে বাইরে পাঠিয়ে দেন। ইলারা নিজে গিয়ে কিছু বলতে পারবে না আর... ক্লান্ত লাগছে তার খুব। মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে সে। বাইরে থেকে রমিজের কান্না শোনা যাচ্ছে। কোনো পুরুষমানুষ এভাবে তা- বউয়ের জন্য কাঁদতে পারে, জানা ছিলো না ইলারার। মাথা ধরেছে ইলারার। ধমক দিয়ে আসবে নাকি! তাবাস্সুম তো বাঁচতে পারতো! এইতো বাচ্চা মেয়েটার কান্না শোনা যাচ্ছে। সে- কি তবে বুঝতে পেরেছে তার মা আর বেঁচে নেই! হতভাগী তাবাস্সুম! মেয়ের কান্নাটা শুনেও মরতে পারলো না। কি হবে বাচ্চা মেয়েটার ভবিষ্যত! যে অবস্থা রমিজের এখন, সেটা কি থাকবে! পরিবর্তন তো অবশ্যই হবে; সেটা নিজের প্রয়োজনে, কিংবা সময়ের প্রয়োজনে! হয়তো দুদিন পর বউয়ের মায়া ভুলে গিয়ে আরেকটা বউ নিয়ে আসবে ঘরে, নিজের জন্য না হলেও বাচ্চাটার জন্য হলেও তো লাগবে। কিন্তু সঠিক আদর পাবে তো! মনে মনে স্রষ্টার উপর ক্ষেপে যায় ইলারা। অনেক চেষ্টা করেও তাবাস্সুমকে বাঁচাতে পারলো না!  মা ডাক শোনার আগেই তাবাস্সুম ওপারে পাড়ি জমালো। মেয়েটার দু’চোখের কোণে পানি জমে আছে তখনো। প্রসবকালীন কষ্টের, নাকি প্রিয় স্বামীকে ছেড়ে যাবার কষ্ট তাঁর চোখের কোণে! এমনও হতে পারে, সন্তানের মুখটা দেখতে পারেনি বলে! অভাগীই বটে! তারচেয়েও বড় অভাগী ইলারার নিজেকে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। কম চেষ্টা কি আর ইমতিয়াজ করেছে একটা বাচ্চা নেয়ার জন্য! তবুও তো হলোনা! আর এখানে! একটা মেয়ে মা হয়েছে, এর চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কি হতে পারে! অথচ সন্তানের মুখটাও দেখতে পেলো না। তার আগেই... ইলারার চোখের কোণে পানি জমে। যার দরকার নেই, তার কাছেই অমূল্য ধন অবহেলায় পড়ে থাকে; আর যার দরকার, সে শূন্য হাত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে


রমিজের কান্না আর শোনা যাচ্ছে না। নার্সকে ডেকে জানতে পারলো, লাশ নেয়ার ব্যবস্থা করতে গেছে সে। এখন নাকি সে খুব স্বাভাবিক আচরণ করছে। "আল্লাহর জিনিস, আল্লাহ নিয়া গেছেন... কাইন্দা আর কি হইবো!"
নার্স রমিজের কথা শুনে বেশ ভয় পেয়েছে

-"জানেন ম্যাডাম, রমিজের কথাবার্তা আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বাচ্চার কথা বলার পর সে বলে, ‘আল্লায় যখন দিছে... তখন আর কি করার!’ অথচ একটা বারও মেয়েটাকে কোলে নিলো না!"
রমিজ স্বাভাবিক আচরণ করলেও লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় সে খুব কান্না করেছে। কিন্তু মেয়েটাকে একবারের জন্যও কোলে নেয়নি সে। ইলারা অবাক হয় রমিজের আচরণ দেখে। নার্সের কোলে বাচ্চাটা কান্না করছিল, তাই ইলারা নিজেই বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশ্চর্য! ইলারা কোলে নেয়ার সাথে সাথে বাচ্চাটার কান্না থেমে যায়!
ডাক্তার হিসেবে নিশ্চয় তার এতোকিছু করার দরকার ছিলো না। কিন্তু আজ কেন সে এতো কিছু করছে, তা নিজেও জানে না। এমনকি যে খরচ হয়েছে অপারেশনে, তার একটা টাকাও নেয়নি রমিজের থেকে। দরদ তাবাস্সুমের চলে যাওয়ার জন্য নাকি মা মরা বাচ্চাটার জন্য... ডাক্তার ইলারা জানে না।
এইতো, রমিজ চলে যাচ্ছে তার মৃত বউকে নিয়ে। কিন্তু চলে যাওয়ার সময় রমিজের বলা কথাগুলো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না ইলারার!
"মেয়েটারে আপনার কাছে রেখে যাইতাছি আপা, কারণ আপনে অযত্ন করবেন না মাইয়াটার, সেইটা জানি। আপনার নার্সের মুখে শুনছি, আল্লায় আপনারে কোনো সন্তান-সন্ততি দেয় নাই। আজ থাইক্যা ওরেই আপনার মাইয়া মনে কইরেন। মাইয়ার মুখটা আর দেখলাম না, যদি মায়া পইরা যায়, দূর থাইক্যা মাইয়ার জন্য আমি দোয়া করে যামু..." কথাগুলো বলে রমিজ আর দাঁড়ায় না। যাওয়ার সময় চেয়ারে পড়ে থাকা টুপিটা মাথায় দেয়। "বউয়ের দেয়া টুপি আপা..." পাঞ্জাবির উল্টো পৃষ্ঠা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে তারপর চলে যায় সে
ইলারা বাচ্চা মেয়েটাকে কোলে নিয়ে একবার নার্স নাসরিনের দিকে আরেকবার চলে যাওয়া রমিজকে দেখছে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে হাসপাতালের বারান্দায় নাসরিন ভয়ে ভয়ে ডাক্তার ইলারার দিকে তাকায়, দেখে ইলারার চোখের কোণে পানি জমতে শুরু করেছে, ছুঁলেই যেনো গড়িয়ে পড়বে অজস্র শ্রাবণইলারা
চোখের কোণটা আলতো করে মুছে ফেলে, কিন্তু এই জলের ক্ষমতা অনেক, মুছেও লাভ হয়নি। জলটা এবার অঝোরে গাল বেয়ে নেমে পড়ছে বাচ্চাটার মুখে, কেন এতো জল, বুঝতে পারে না সে! অতো গভীরে যাবার ক্ষমতা নাসরিন কেন শুধু, কারোই নেই!


No comments

Powered by Blogger.