একটি অটোগ্রাফ: মীর মেহেদী হাসানের স্মৃতিগদ্য


একটি অটোগ্রাফ

মীর মেহেদী হাসান


Agooan - Al Mahmud- Mir Mehedi Hsana - আগুয়ান - আল মাহমুদ - মেহেদী হাসান



দুই হাজার ষোলো সনের  অক্টোবরের  চৌদ্দ তারিখ  দুইজন আনমনা যুবক মগবাজারের ওয়ারলেস এলাকার অলিগলি চষে বেড়াচ্ছে তাদের এলেমেলো চুল,  ঢাকা মেট্রোর  রাষ্ট্রের ধূলোতে শক্ত হয়ে গেছে হন্য হয়ে খুঁজছে একজন শক্তিমান কবিকে? সোনালি কাবিনের কবিকে,  উপমহাদেশের ঔপন্যাসিককে, জলবেশ্যার গল্পকারকে
যিঁনি অবলীলায়  লিখতে পারেন  সোনালী কাবিনের মত কাব্য
"-তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেলো সুন্দরী,
মুকুন্দরামের রক্ত মিশে আছে -মাটির গায়,
ছিন্ন তালপত্র ধরে এসো সেই গ্রন্থ পাঠ করি
কত অশ্রু লেগে আছে এই জীর্ণ তালের পাতায় "
                 
এক কথায় কবিতার জাদুকর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিযিঁনি আপন মহিমায় সৃষ্টি করেছেন নিজস্ব কাব্যশৈলী চির প্রণম্য কবি আল মাহমুদ

তাঁর বাসা মগবাজারে কিন্তু মগবাজার তো আর মগের মত ছোট নয়হাঁটতে হাঁটতে যুবকদ্বয়  ঘেমে গেলো, থামলো না পথচারী, চায়ের দোকানদার,  স্কুলের ছাত্র,  কেউ বাদ পরলো না কারো উত্তর: জানি না কারো উত্তর: " আল মাহমুদ কে আবার?" আমি আর ইমরান ভাই বেশ হেসেছিলাম সেদিন ইশঃ আমরা যদি শাকিব খানের জান্নাতে যেতে চাইতাম, সহজেই পেতাম! আমরা বুদ্ধি করলাম, কোন এক লাইব্রেরির দোকানিকে জিজ্ঞাসা করি আখেরে যৌক্তিক ফল পেতেও পারি পূর্বোক্ত ধারণাই সত্য হলো

আমরা ফুটপাত থেকে দুটি আনারস, আর আধা কেজি পেয়ারা কিনলাম এদিক হয়েছে কী! আমাদের কাছে খাতা-কলম নেইকোথায় কীভাবে অটোগ্রাফ নেবো? আমরা খাতা-কলম কিনে, দিকনির্দেশনানুযায়ী, হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছিলাম, আয়শা গোমতী ভিলাতেআমার বুক কাঁপতে থাকলো, হাঁটুও তাহলে কী তিতাসের কবিকে দেখতে পারবো, এবার? এত বড় কবি!  তার সামনে কীভাবে দাঁড়াবো?  বসবো কীভাবে? কথা বলবো কীভাবে?  

তত্বাবধায়কের নির্দেশনা মোতাবেক দ্বিতীয় তলার B-2 ফ্ল্যাটে নক করার কিছুক্ষণ পর খুলে দিলো জনৈক ব্যক্তিটি আরাম সোফায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বললেন আমরা ঘাড় নাড়লাম আমাদের দু'জনের ফোনই চার্জশূন্যতায় ভুগছে আমারটায় অবশ্য চার শতাংশ হলেও আছে একটি ফটোগ্রাফ তো অন্তত নিতেই হবে বাপুরে, আমরা বড় হলে, বুড়ো হলে, স্মৃতিচারণ করবো না? যদিও দূর্ভাগ্যবশতঃ ছবি তোলা হয় নাই সেটা না হয় পরে বলা যাবে ড্রয়িং রুমের দেয়ালে দেয়ালে কবির ছবি বুকশেলফে কবির লেখা বই, অনেক লেখকের সৌজন্য কপি, পত্রিকার ঈদসংখ্যা ইত্যাদি দেয়ালে আবেদনময়ী ফটো সম্ভবত কবি আল মাহমুদ শামসুর রাহমানের যুগল ছবিটি  দেয়ালে তাকালে এই ছবিই সবার আগে নজরে আসবে, বোধ করিআলমারিতে পরম যত্নে স্মারক, পদক, পুরস্কার থরে থরে সাজানো
বেশ উচ্ছ্বসিত আমি এবং ইমরান ভাই আমি মনে হয় আরও একটু বেশি উদ্বেলিত, যেনো পারদ উথলে পরছে

অতঃপর কবির পায়ের আওয়াজ আসতে লাগলোতিনি আসছেন...ধীরে ধীরে পা ফেলছেন একজন বয়স্ক তরুণ যেনো একটি পৃথিবী গড়াতে গড়াতে আসছে আমাদের দিকে আমরা দাঁড়ালাম এক আরেক পৃথিবী সালাম দিলাম সালাম গ্রহণপূর্বক তিনি হাতের ইশারায় বসতে বললেন বসলাম আমরা দু'জন এক সোফায়, আর কবি আরেক সোফায় আমাদের দূর্ভাগ্য আমরা এমন এক সময় দেখতে গেছি, যখন তিঁনি কানে কম শোনেন, আবার বলতেও তাঁকে বেশ বেগ পোহাতে হয় অনেক কষ্ট করে বুঝালাম, আমরা বগুড়া থেকে এসেছি তিঁনি আমাদের কথা শুনতে পারগ হচ্ছেন না, বুঝে:  তিঁনি তার সোফায় ডাকলেন ইমরান ভাই বললেন, 'যাও' পরম আবেশে আমি কবির  পাশে বসলাম বসে, যে পরিমাণ আত্মিক সুখ লভেছিনু তা বর্ণনাযোগ্য হলেও ভাষাগত দৈন্যতার দরুন এখানেই থামতে হলো তারপর আমাদের সৌজন্যমূলক কথাকথি হলো তার দেখভালের জন্য নিয়োজিত জনৈক ব্যক্তির (সম্ভবত ছেলে) কাছ থেকে কবির শারিরীক, মানসিক অবস্থা জানার চেষ্টা করলাম কবি কীভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক নিগৃহীত হচ্ছে শুধুমাত্র ভাবাদর্শ আলাদা হওয়ায়, তাও শুনলাম নিজেরাও বেশ লজ্জিত হলাম দুঃখবোধে জারিতও হলাম জনৈক ব্যক্তি আমাদের চা প্রস্তাব করলেন ইমরান ভাইয়ের অতিবিনয়ের খেসারত হিসেবে চা খাওয়া হলো নাইমরান ভাই বললেন, " না না, থ্যাক" ভেবেছিলাম, চা খেয়ে  নিই; পরে বলতে পারবো: কবি আল মাহমুদের বাসায় কত চা খেলাম এবার ফটোসেশনের পর্ব তবে পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষিত আর আমরা অপরিচিত হওয়ায় ছবি তোলা হলো না সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে অটোগ্রাফ পেলামকবির অটোগ্রাফ দিতে হাত ঠকঠক করে কাঁপছিলো অথচ এই হাতেই লিখেছেন হাজারো কবিতাবিদায়বেলায় কবির সাথে করমর্দন করে বেশ আপ্লুত হয়েছিলাম কেননা আমার মতন মামুলি মানবের হাত, কবির হাতের স্পর্শ পেয়েছে 

আমি আর ইমরান ভাই বেশ সুখিত হলাম আমাদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে, অক্টোবরের চৌদ্দ তারিখ, কবির মুখ,  কবির হাতের স্পর্শ, একটি অটোগ্রাফ চলতি বছরেই প্রথমেই কবি পরলোকগমন করলেন (কত সহজে হয়ে গেলো বলা, কাঁপলো না গলা) বাংলা সাহিত্যে রেখে গেলেন, অনন্য স্বাক্ষরতাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি, বেঁচে থাকুন সাহিত্যমোদী মানুষের মননে, মানসে


No comments

Powered by Blogger.