নিসিন্দার ফুল অথবা কাঁটাবনে ফোটা কোমল কলি: মুহিম মনির


নিসিন্দার ফুল অথবা কাঁটাবনে ফোটা কোমল কলি


মুহিম মনির 


২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত 'শব্দঘর গল্পসংখ্যা' ওপর আলোচনা চাওয়া হলে বিশেষত তরুণদের গল্পগুলো নিয়ে একটা নাতিদীর্ঘ আলোচনা লিখি আমি সেখানেই সাঈদ আজাদের গল্পের সঙ্গে পরিচয় এবং মনের অগোচরে জন্মে মুগ্ধতা আর তা প্রকাশও করি এইভাবে--

'আমাদের চিরায়ত বাংলায় আমরা দেখে আসছি, অনেক সময় বাবা সন্তানদের ছেড়ে চলে যায়; আবার অন্যকোথাও সংসার গোছায় কিন্তু গল্পজগতে আমাদের চেনাজানা পরিমণ্ডলে একটা পরিবর্তন আসে তাই হয়তো আচমকা দুএকবার হোঁচটও খাই আমরা তবে সব সম্ভাব্যতার পেছনে যে অসম্ভাব্যতা আর অসম্ভাব্যতার পেছনেও যে সম্ভাব্যতা থাকে, তা গল্পপাঠে টের পাওয়া যায়'

সাঈদ আজাদের 'নিসিন্দার ফুল' পড়েও মোটের ওপর এমন কথা বলা যায় বলেই প্রসঙ্গক্রমে উপরোক্ত উদ্ধৃতাংশের উল্লেখ সাঈদের বয়ানভঙ্গি বেশ সরল হলেও গল্পের চরিত্ররা খুব বেশি সরল নয় বরং মানবিক বিপর্যস্ততা আর জটিলতায় আক্রান্ত, ভারাক্রান্ত অথচ তাঁর গল্পগুলো কী নির্ভার নির্মেদ! পড়তে গিয়ে পাঠককে বেগ পেতে হয় না খুব সহজেই গল্পের গহনে প্রবেশ করতে পারেন পাঠক এবং পদে পদে অবলোকন করেন যাপিত জীবনের জলছবি যে জীবন তিনিও দেখেছেন; হয়তো এভাবে দেখেননি আর সেজন্যেই চমকে উঠতে হয় তাঁকে আর মুখ ফুটে বেরিয়েও আসে,

--এভাবেও দেখা যায়! এত নিবিড়ভাবে!

হুম সাঈদের দেখার চোখটা ঠিক এমনই চিলের মতো চোখ তাঁর নিখুঁত ছবি তোলায় অবাক করার মতো পারদর্শিতা কয়েকটি ছবি সামনে আনা যাক তাহলে--

ফুটপাথ ঘেষে হাত পাঁচেক মতো জায়গা তারপর উঁচু দেওয়াল ওপাশে স্কুল এপাশে, পাঁচ হাতখানেক জায়গা আর ফুটপাথের অনেকটা অংশ জুড়ে ওদের ঝুপড়ি সারি সারি বেড়া বাঁশ বা টিনের ছাউনি টিন বা পলিথিন বা নারিকেল পাতার নয় নয় করেও সত্তর ঘর (৪১ পৃষ্ঠা; জীবনযাপন)

দিনদিন যেন মশার সংখ্যা বাড়ছে কত ঢুকেছে আজ কে জানে! সরে গিয়ে ফের কানের সামনে গুনগুন করছে মশারা মারবেন আর কত!... তা মশারা তো ঢুকবেই মশারিটা যে জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া! ইঁদুরটাও মনে হয় আবার কোথাও খানিকটা কাটল (৮৬ পৃষ্ঠা; মশারি)

লোকজন খুব একটা নেই পার্কে দুপুর বলে হয়তো এখানে ওখানে বেঞ্চে দুএকজন ঘুমাচ্ছে ওরা দুজন একটা বেঞ্চে বসে ঘাসের উপর বাদামের খোসা কাগজের প্যাকেট চিপসে্র খালি প্যাকেট (১২৫ পৃষ্ঠা; অথচ দুজনেই জানে)

কাব্যিকতাও গল্পগুলোর অন্যতম অনুষঙ্গ সম্ভবত সাঈদের সহজাত প্রবণতা এটি যেন করবীর বীজ পিষে মধু বের করেন এই কথাকার নাকি বেদনাকে বীভৎসতাকে সৌন্দর্যের চাদরে মোড়াতে চান তিনি? প্রকাশ করতে চান চরিত্রে অন্তর্গত পরিহাস একটু হেঁয়ালিপনায়, মুখে মিটিমিটি হাসি নিয়ে? যাওয়া যাক তাঁর গল্পের কাছে--

বৃষ্টি ততক্ষণে ধরে এসেছে তুমুল স্বরে ডাকছে ঝিঁঝিঁ আকাশে মস্ত চাঁদ জ্যোৎস্না ফুটফুট করছে উঠান জুড়ে বাড়ির শেষে ফসলের মাঠ মাঠ জুড়েও জ্যোৎস্না হাসছে (৫১ পৃষ্ঠা; খুনী)

ঝোপঝাড়ে জোনাকি জ্বলছে নিভছে জ্বলছে নিভছে হাওয়া বইছে হালকা আকাশের গায়ে কৃষ্ণাতিথির ক্ষয়াটে চাঁদ মরা জোছনায় মাটির উঠানটাকে নদীর মতো লাগে মামুনের কাছে... ম্লান জোছনায় মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে মামুনের চোখে ভাসে একটা মুখ সে মুখটা ঘামে ভেজা, কুপির আলোয় রাঙা! (৬৮ পৃষ্ঠা; নিসিন্দার ফুল)

চিলটারও কি মনে দুঃখ? সাইফের মতো? পাখিদের কি মন থাকে! মানুষের মতো? (৯৪ পৃষ্ঠা; নিঃসঙ্গ চিল)

আলোচ্য গ্রন্থটিতে মোট ১৯টি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে শিল্পশর্ত যে সবগুলোতেই পূরণ হয়েছে সে-কথা বলা যাবে না কোনো কোনো গল্প নিজস্ব নৈর্ব্যক্তিকতা হারিয়ে গল্পকারের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়েছে তবে এসবই সব কথা নয় কোনো লেখকেরই সকল লেখা শিল্পচূড়া স্পর্শ করতে পারে না তবুও তারপরও স্পষ্ট করেই বলা যায়, গ্রন্থভুক্ত 'জীবনযাপন' 'খুনী' 'মাংস' 'নিসিন্দার ফুল' 'ঝড়' গল্পগুলো নিঃসন্দেহে ভিন্ন মাত্রার, আলাদা আবেদনের

এই যেমন, 'খুনী' গল্পটির কথাই যদি বলি, তবে একশব্দে 'অনন্য' বলতে হয় গল্পটিতে লেখকের সংযম শিল্পসত্তা শক্তিমত্তা ভাস্বরিত হয়ে উঠেছে ভালোবাসা আর প্রতারণার গল্প এটি রফিক মাস্টারের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন আয়না যা স্বভাবতই সহ্য হয়নি তাঁর অসহ্য উত্তেজনায় তাই খুনও করেছেন প্রিয়তমা স্ত্রীকে আর এর দায় গিয়ে পড়েছে সালামের ওপর যে এখন গ্রামছাড়া আপাতদৃষ্টিতে এক গতানুগতিক গল্প কিন্তু সাঈদের কলমে ফুটে উঠেছে অন্যরকমভাবে প্রকাশিত হয়েছে লেখকের মুন্সিয়ানা আর গল্পবোধের গভীরতা নিম্নোক্ত অংশটুকু পড়লে কিছুটা আঁচ পাওয়া যেতে পারে--

'এসো আয়না এই পিঁড়িটায় বস বসে বসে আমার রান্না দেখ

কী রাঁধো?

খিচুড়ি আর ডিম ভাজা হাঁসের ডিম খিঁচুড়ি রান্না তোমার কাছ থেকেই শেখা বিকালে কেমন ধুম বৃষ্টি হয়ে গেল! গরমটা এখন কমেছে, না?

হু

নীল শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে আয়না মনে হচ্ছে জোছনা রাতে পরী নেমেছে আকাশ থেকে নীল পরী

তোমার খাওয়া দাওয়াতে খুব কষ্ট হয় না?

তা কষ্ট কিছুটা হয় অবশ্য

গন্ধরাজ লেবু গাছটায় ফুল ফুটেছে মনে হয় কেমন সুন্দর গন্ধ বাতাসে!

তাই তো! এতক্ষণ খেয়াল করিনি তুমিই তো লাগিয়েছিলে গাছটা... মনে হয় জ্বর আসছে আমার আয়না শীতে কেমন গায়ে কাঁটা দিচ্ছে

বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক হয়নি

ইচ্ছে করল যে

সারাদিন একা একা থাক এত বড় বাড়ি, তোমার খারাপ লাগে না?

সারাদিন তো স্কুলেই কাটে সমস্যা রাতে তুমি ছাড়া কেউই তো নেই কথা বলার...'

পরাবাস্তবতায় বাস্তব কী চমৎকার করে পেখম মেলল, কতোটা অতলে তলিয়ে গেল এই আপাতসরল আলাপ, পুরো গল্পটি পড়া না-থাকলে নাও বোঝা যেতে পারে ব্যাপারটা

এভাবে আলোচনা আরো অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নেয়া যেতে পারে তবে আর এগোতে চাইছি না কথা বলেই তাই শেষ করছি--

সাঈদ তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ 'নিসিন্দার ফুল'-এর প্রায় প্রতিটি গল্পেই দেখিয়েছেন, পরিচ্ছন্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দেশের অন্ত্যজ শ্রেণির দৈন্য-দুর্দশা আশা-আকাঙ্ক্ষা কামনা-বাসনা ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি যা পাঠককে ক্ষণিকের জন্যে হলেও আলোড়িত করবে বলে বিশ্বাস করি আর সম্ভবত এখানেই সাঈদের শিল্প-প্রয়াসের সার্থকতা

আগুয়ান - মুহিম মনির- সাঈদ আজাদ - নিসিন্দার ফুল Agooan - Muhim Monir - sayeed Azad - Nishindar ful - Boi Alochona
নিসিন্দার ফুল


গল্পগ্রন্থ: নিসিন্দার ফুল
লেখক: সাঈদ আজাদ
প্রকাশক: জনান্তিক
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৭
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা মাত্র

No comments

Powered by Blogger.