শোক দিবসের অধ্যাস: রফিকুর রশীদের গল্প

শোকদিবসের অধ্যাস

রফিকুর রশীদ



আগুয়ান - রফিকুর রশীদ - Agooan - Rafiqur rashid




বউ সাথে করে বাইরে যাবার সময় রায়হান বাবাকে বলল, তুমি বাসাতেই থাকো, আমরা একটু ঘুরে আসছি
রায়হানের বাবা জলিল মাস্টার গ্রাম থেকে এসেছেন দুদিন হলো ছেলের বাসায় আগে কখনো আসা হয়নি কল্যাণপুর বাসস্টান্ডে নেমে অনেক খুঁজে পেতে শুক্রাবাদের এই বাসায় উঠেছেন শুক্রাবাদ হাই স্কুলের পেছনের এই এলাকাকে যে পান্থপথও বলা হয়, এখানে আসার পর সেটা জেনেছেন এসে নাগাদ ছেলে আর বউমার কাণ্ডকীর্তি দেখছেন দুজনেই চাকরি করে; কী চাকরি সে খবর খুব স্পষ্ট করে জানা নেই জলিল মাস্টারের সকালবেলা দুজনেই বেরিয়ে যায় বাসা থেকে, ফিরে আসে সন্ধ্যার পর দুদিন তো তা- দেখছেন জলিল মাস্টার আজ একটা বাড়তি ছুটির দিন সরকার বিদায় নিলে ছুটি আর মিলবে! তো এই ছুটির দিনেও তাদের বাইরে কত কাজ! সারাদিন বুকে কালো ব্যাজ সেঁটে ঘুরে এলো রায়হান, এখন আবার বউ সাথে করে বেরুচ্ছে, কখন যে ফিরবে আল্লা মালুম!

বেরুনোর ঠিক পূর্বমুহূর্তে রায়হান বলল, রাতের বেলা তুমি তো আর বাইরে যাচ্ছ না, দরজাটা বাইরে থেকে লক করে যাচ্ছি ঘরে বসে কাগজ পড়, টিভি দ্যাখ আমরা আসছি জলিল মাস্টার একবার চোখ তুলে তাকাতেই রায়হান দরজার মুখ থেকে ব্যাখ্যা দেয়-এটা ঢাকা শহর দরজা খোলা থাকলেই বিপদ

জলিল মাস্টার কিছুই বলেন না দরজায় তালা লাগিয়ে ওরা গটগট করে সিঁড়ি ভেঙে নেমে যায় ওদের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় তিনি উঠে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে এসে চেয়ার টেনে বসতেই বন্ধ দরজায় দৃষ্টি আছড়ে পড়ে, নিজেকে ভয়ানক বন্দি মনে হয় না, ড্রয়িংরুম গেস্টরুম, বেডরুম কোনোটাই বন্ধ নয় ইচ্ছে করলে ঘর থেকে -ঘর যেতে কোনো বাধা নেই বাধা কেবল বাইরে বেরোতে মেইন-গেটে লক করা তা এই রাতের বেলা তিনি যাবেনই বা কোথায়! দিনের বেলাতেই পথঘাট ভুলভাল হয়ে যায় আর রাতের বেলা তো কথাই নেই কোথায় কোন গলি ঘুপচির মধ্যে পথ হারিয়ে তালকানা হয়ে ঘুরতে হবে তার ঠিক আছে!

কিন্তু সন্ধ্যার পর জলিল মাস্টারের এক খিলি পান মুখে দিতে ইচ্ছে করছে যে! পান-তামাকে তিনি যে প্রবল নেশাগ্রস্ত এমন নয় ধূমপানের তীব্র নেশা চাপা দিতে গিয়ে সারাদিনে দুচার খিলি পানের অভ্যেস হয়েছে সকাল-সন্ধ্যা অন্তত দুখিলি পান না হলে বেশ অস্বস্তি হয় সব দিকে কড়া নজর রায়হানের বাসার নিচে গলির মুখের দোকান থেকে বেশ কটা স্পেশাল অর্ডারের পানের খিলি কাগজে মুড়ে নর্মাল ফ্রিজের ডালায় রেখে বউকে বলেছে, চায়ের পরে বাবাকে দিয়ো ব্যস্ততার মধ্যেই বউমা এত কথা মনে রাখে কী করে! এই যে সন্ধ্যার পর বাইরে বেরুনোর তাড়াহুড়োর মধ্যেও শ্বশুরকে নুডুল্সের সঙ্গে চা দিয়েছে ঠিকই, পানের কথাটা আর মনে পড়েনি এমন তো হতেই পারে! চায়ের স্বাদটা এখন তিতকুটে বিস্বাদ হয়ে জিহ্বায় ছড়িয়ে পড়লে জলিল মাস্টার কী করবেন? অগত্যা পায়ে পায়ে চলে আসেন ডাইনিংরুমে ফ্রিজের ডালা মেলে ধরেন-নাহ্, পান কই! ভেজা ন্যাকড়ায় জড়িয়ে পানি ছিটিয়ে রাখা পান আজ সকালেও একটা খেয়েছেন তবে কি স্টক ফুরিয়ে গেল! মনটা ভারি ব্যাজার হয়ে গেল মুখভরা তিতকুটে বিস্বাদ নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে টিভি ছেড়ে দিলেন কী আশ্চর্য! রিমোটে কাজ করছে না পাওয়ারই অন হচ্ছে না, তো টিভি চলবে কী! অথচ আজ সকালেও তিনি একাএকা টিভি চালিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে শোকদিবসের অনুষ্ঠান দেখেছেন আবার নিজে হাতে রিমোটের বোতাম টিপে বন্ধও করেছেন টিভি হঠাৎ সেই রিমোটের হলোটা কী! বাম হাতের তালুতে দুবার ধাক্কাধাক্কি করে তিনি রিমোট ছুঁড়ে দিলেন ডানদিকের সোফার উপরে পিঠ এলিয়ে দিলেন বিরক্তিতে তখনই নজরে পড়ে বামদিকের ছোট্ট টি-টেবিলের উপরে সাদা ধবধবে পিরিচে পড়ে আছে এক খিলি পান অবাক কাণ্ড, এখানে পান এলো কোত্থেকে! বাব্বা! রাংতা কাগজে মোড়া! দেখে মনে হবে বুঝিবা এক্ষুনি দোকান থেকে সাজিয়ে এনে রাখা হয়েছে বউমা পারেও বটে অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে পানের খিলি মুখে পুরতেই চম্কে ওঠেন জলিল মাস্টার, হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর মতো করে টেলিভিশন চালু হয়ে গেল, কোন চ্যানেলে যেন বঙ্গবন্ধু তখন আঙুল উঁচিয়ে সেই অমর ঘোষণা দিচ্ছেন-এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম

সারাদিন ধরে সবগুলো চ্যানেলে যেন বা একই অনুষ্ঠান ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রচার হচ্ছে-বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে যত কথা যত গান যত কবিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার নিয়ে কত যে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ক্যাদ্দানি চলছে, সব আর শুনতে ইচ্ছে করে না নতুন কথা কিছু নেই কী সেই নতুন কথা! বঙ্গবন্ধু আবার ফিরে আসবেন! সোহরাওর্দী উদ্যানে আবারও গণসংবর্ধনা হবে! তাঁর চতুর্পার্শ্বে আবারও ঘিরে থাকবেন তাজউদ্দীন আহম্মদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর, কামরুজ্জামান! কোথায় নতুন স্বপ্ন! সব কথা ভাবতেই জলিল মাস্টারের বুকে হিক্কা উঠে পড়ে কী জানি পানের ভেতরে জর্দার পরিমাণ বেশি ছিল কি না! হঠাৎ তাঁর মনে হয় টেলিভিশনের চ্যানেলটা বদলে দিতে পারলে হিক্কা থেমে যেত রিমোট কাজ করছে না, তবে কি সোফা থেকে উঠে গিয়ে ম্যানুয়াল চেঞ্জ করবেন চ্যানেল! নাহ, তাতেও আলস্য সকালের বাসি কাগজটা হাতে নিয়ে আনমনে পাতা ওল্টান ছবি দেখেন মোটা অক্ষরের শিরোনাম উপশিরোনাম দেখেন কোথাও নতুন খবর নেই কখন, কী কী পদক্ষেপ নিলে ১৫ আগস্টের এই মর্মান্তিক ট্রাজেডি এড়ানো যেত, সেই বিশ্লেষণও কোথাও নেই খবরের কাগজ টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে টিভির সামনে আঙুল উঁচু করতেই সহসা চ্যানেল চেঞ্জ হয়ে গেল জলিল মাস্টার ভীষণ অবাক! অবিশ্বাসের চোখে তাকান পাশে পড়ে থাকা নির্বোধ রিমোটটির দিকে তারপর আবার আঙুল উঁচু করেন আবারও পাল্টে যায় চ্যানেল না, ভারতীয় চ্যানেলের রংবাহারি ড্যান্স তাঁর ভালো লাগে না আঙুল তুলে আবার চ্যানেল চেঞ্জ করেন ফিরে আসেন বাংলাদেশে

বাংলাদেশের এটা কোন চ্যানেল কী অনুষ্ঠান হচ্ছে সে দিকে মনোযোগ দেবেন কিনা, জলিল মাস্টারের বিস্ময়-বিস্ফারিত দৃষ্টি পড়ে থাকে নিজেরই ডানহাতের শাহাদাৎ আঙুলের প্রতি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না-তাঁর সামান্য এই আঙুল এমন অসামান্য ক্ষমতা কী করে পেল! আবার আঙুল তুলে চ্যানেল বদ্লাতেই দৃষ্টি চলে যায় বঙ্গবন্ধুর সেই আকাশ ছোঁয়া আঙুলের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেন তিনি-বঙ্গবন্ধুর কোন হাত ওটা, কোন হাতের কোন আঙুল? জলিল মাস্টারের সারা গায়ে কাঁটা দেয়, লোম শিউরে ওঠে এবং অবশেষে টের পান-নিজের ওই বিশেষ আঙুলটি শিরশির করে কেঁপে উঠছে, আঙুলের ভেতরে কী এক অনন্যসাধারণ বোধ সঞ্চারিত হচ্ছে একবার নিজের উপরেই অবিশ্বাস হয়, আঙুল কি তবে তার নয়, বঙ্গবন্ধুর সেই সাতই মার্চের জাদুকরি আঙুল, সাড়ে সাত কোটি মানুষকে পথনির্দেশ দিয়েছে যে আঙুল!
এতক্ষণ আঙুলের আস্ফালন দেখতে গিয়ে জলিল মাস্টার ভুলেই গিয়েছিলেন তার গালের মধ্যে জর্দামাখা পান ঠাসা আছে, দাঁতের হামানদিস্তায় সেটা পিষতে হবে, রস নিংড়ে নিতে হবে দুচার বার চিবোতেই সারা মুখ তিতকুটে বিস্বাদে ভরে যায়, গলার কাছে বুনো কচুর তরকারির মতো কিটকিট করে এবং আবারও হিক্কা উঠতে চায় জলিল মাস্টার এদিক-ওদিক তাকিয়ে পিকদানিটা খোঁজেন, বাবার অসুবিধার কথা ভেবে রায়হান প্রথম দিনেই পিকদানি এনে দিয়েছিল; কিন্তু সেটা গেল কোথায়! গালের ভেতরে জমা পিক সামলাতে না পেরে তিনি দ্রুত উঠে যান বেসিনের কাছে ওয়াক করে পিক ঢেলে দেন বেসিনে পানের পিক নয় যেনবা লাল টকটকে রক্তে ডুবে যায় সাদা বেসিন ট্যাপ ঘুরিয়ে সর্বোচ্চ বেগে পানি ছেড়ে দেন পানিতে ভরে ওঠে বেসিন কিন্তু পানি কই, বেসিনভরা রক্ত যে! জলিল মাস্টারের চোখের মণি ফেটে বেরোয়-রক্ত এত লাল! কার রক্ত?
ড্রয়িংরুমে ফিরে আসতেই নজরে পড়ে সোফার পাশে ছোট্ট সাইডটেবিলের নিচে রূপালি পিকদানি তাকে দেখে হাসছে আবার বিভ্রম হয়, পিকদানিটি কি কিছুক্ষণ আগেও ওইখানে ছিল! নাহ্, মনে পড়ে না সে কথা ওটা কি গত দুদিনের ব্যবহৃত পিকদানি, নাকি রক্ত গোলাপে ঠাসা ফুলদানি! মনের ভেতরের ঘোর কাটে না নিঃসংশয়ে, ভয়ানক ক্লান্তিতে তিনি শরীর এলিয়ে দেন সোফাতে
এদিকে টেলিভিশন চলছে

মানুষ ইচ্ছে করলেই চোখ বুজতে পারে, কান বন্ধ করবে কী করে! জলিল মাস্টার সোফাতে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করেছেন; তবু চোখের ক্যানভাস থেকে রক্তভরা বেসিন এবং রক্তাক্ত পিকদানির ছবি কিছুতেই সরাতে পারছেন না; এরই মাঝে টিভি চ্যানেলে কে যেন প্রত্যয়দৃঢ় কণ্ঠে গেয়ে ওঠে- যদি রাত পোহালেই শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই
গানটির অবশিষ্ট কথা শ্রবণেন্দ্রিয় গ্রহণ করে কিনা বুঝা যায় না, কানের দরজায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে-‘বঙ্গবন্ধু মরে নাইএই বাক্যবন্ধটুকু জলিল মাস্টার হঠাৎ খাড়া হয়ে উঠে বসেন, নিজেকেই প্রশ্ন করেন, বঙ্গবন্ধু মরে নাই? টিভির পর্দায় চোখ পড়তেই দেখতে পান- বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের প্রতিটি কক্ষের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, জামাকাপড়, পাইপ, চশমা, কলম, বইপত্র, উপহারসামগ্রী, বুলেটবিদ্ধ ঘরের দেয়াল, রক্তাক্ত সিঁড়ি-খুঁটিনাটি সবকিছু গতকাল একাএকাই জাদুঘরে গিয়ে এসব দেখে এসেছেন জলিল মাস্টার এখান থেকে কতই বা দূর বড় রাস্তাটা পেরোলেই হলো, তারপর জনতার স্রোত ঠিকই নিয়ে যাবে বত্রিশ নম্বর সেই স্রোতে মিশেই তিনি গিয়েছিলেন সারাদিন ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখেছেন আজ দেখছেন টেলিভিশনের পর্দায় বঙ্গবন্ধুর বুলেটবিদ্ধ ছবিটি দেখে তিনি সহসা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, মুখে বিড়বিড় করেন-বঙ্গবন্ধু মরে নাই
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি - আগুয়ান
সোফার হাতলে দুহাতের ভর রেখে সটান উঠে দাঁড়ালেন জলিল মাস্টার এই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে তিনি নিচে যাবেন রাজপথের মিছিল দেখবেন স্লোগান শুনবেন তার-পর ফেরার পথে গলির মাথার দোকান থেকে চমনবাহার দিয়ে এক খিলি খাবেন মেইন গেটে পৌঁছুনোর পর তাঁর মনে পড়ে যায়, রায়হান বাইরে থেকে লক এঁটে রেখে গেছে এখন উপায়! অসহায় ভঙ্গিতে দরজার হতলে হাত রাখতেই অবাক-দরজার দুই পাল্লা হা হয়ে খুলে গেল তবে কি ওরা যাবার আগে তালা না লাগিয়ে বাবাকে মিছেমিছি ভয় দেখিয়েছে! নাকি সত্যিসত্যি আজ তার ডানহাতের তর্জনিতে সাতই মার্চের অলৌকিক আঙুলের সম্মোহনিশক্তি সঞ্চারিত হয়েছে! কিন্তু কী! মেইন গেট পেরিয়ে সিঁড়ির মুখে আসতেই বিদ্যুৎ চলে গেল যে! সঙ্গে সঙ্গে নিকষ কালো অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বত্র তখন কী করবেন জালিল মাস্টার? সামনে নাকি পিছনে যাবেন! সিঁড়ির দিকেই তাকিয়ে থাকেন আকুল হয়ে প্রগাঢ় অন্ধকার সামান্য একটু চোখসওয়া হয়ে আসতেই তিনি অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন-অন্ধকার ফুঁড়ে সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে উপরে উঠছেন বঙ্গবন্ধু চোখে সেই চশমা, চুলে সেই ব্যাক ব্রাশ, সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবির উপরে কালো মুজিবকোট; ঠোঁটে ঝুলছে টোবাকো পাইপ তিনি উঠছেন, অন্ধকার পথ কেটে দিচ্ছে আলোর দেবতা আলো ছড়াতে ছড়াতে উপরে উঠছেন উপরে মানে যে কোথায়, কত উপরে সে সবের কোনো ধারণাই নেই তাঁর
যতদূর দৃষ্টি যায় জলিল মাস্টার উপরের দিকে তাকিয়ে থাকেন সিঁড়ি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে আলোর দূত উপরে উঠে যান এই বিল্ডিং তো সাততলা, এরপর তিনি আর কত উপরে যাবেন ভেবে পান না-এখানে কেন এসেছেন তিনি, এখানে কী কাজ! জলিল মাস্টার সিঁড়ি ভেঙে উপরে যেতে সাহস পান না, পা ওঠে না; তিনি নিচেই নামবেন কিন্তু দিকে যে নিরেট অন্ধকার! অগত্যা ডান দিকের দেয়ালে হাত রাখেন, দেয়াল ঘেঁষে অনুমাননির্ভর পা ফেলে ধীরে ধীরে ঠিক নেমে যাবেন, এমনই ভাবেছেন হঠাৎ ডান হাতের তর্জনিতে ছোট্ট একটা সুইচ বোর্ডের নাগাল পান আর তক্ষুনি সিঁড়িজুড়ে আলো জ্বলে উঠে ফকফকা তিনি কি সুইচ টিপেছিলেন! নাকি ওই শাহাদৎ আঙুলের ছোঁয়া লেগে এরকম আলাদীনের চেরাগ জ্বলে উঠল এবং তিনি চমকে উঠলেন

জলিল মাস্টার গলির মুখে এসে দেখেন পানের দোকান খোলা আছে ঠিকই, অন্ধকারে ঢেকে আছে সারা এলাকা অধিকাংশ দোকানে জ্বলছে টিমটিমে কুপির আলো দুএকটা দোকানে চাজার্র লাইট জ্বলছে তবু গা-ছমছমে ভৌতিক পরিবেশ যেন চেপে বসে আছে এর মধ্যেই পানের অর্ডার দেবেন? নাহ্, মন সরে না ভুতুড়ে অন্ধকারে কি ঠিকমতো পান বানাতে পারবে! চুনের অনুপাতে একটুখানি তারতম্য হলেই তো গালমুখ জ্বলেপুড়ে ঝালাপালা থাক, সামনের রাস্তা পর্যন্ত একটু হাঁটাহাঁটি করে ফেরার পথে পান মুখে দেবেন ততক্ষণে বিদ্যুৎ চলে এলে তো কথাই নেই দেখেশুনে চমনবাহার দিয়ে পান সাজিয়ে নেয়া যাবে

ঢাকা শহের গাড়িঘোড়ার যে উৎপাত, ফুটপাতেও নিরাপদে পা ফেলার উপায় আছে! হরেক রকম যানবাহন আর মানুষে গিজগিজ করছে দিনরাত কে যে কখন কার গায়ের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়বে বলা মুশকিল অতি সাবধানে গা বাঁচিয়ে চলার পরও জলিল মাস্টার নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না চট্টগ্রাম অভিমুখী-গ্রিনলাইনের কাউন্টারের সামনে থেকে বদরাগী এক মোটরসাইকেল তেড়ে এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল রাস্তায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক আর পিছনে তাকায়নি, সঙ্গে সঙ্গে ফুল-স্পিডে কেটে পড়ে নিরুদ্দেশে স্থানীয় কেউ একজন জলিল মাস্টারকে পাঁজাকোলে তুলে নিরাপদে নিয়ে আসে এক ওষুধের দোকানের সামনে বড় কোনো অঘটন ঘটেনি বটে, তবে হাঁটু এবং কনুইয়ের কাছে থেঁতলে রক্তাক্ত হয়েছে জামা-পাজামা খানিকটা স্বাভাবিক হবার পর জলিল মাস্টার জানান-তিনি নিজেই বাসায় যেতে পারবেন, এই তো শুক্রাবাদে ছেলের বাসা জামার পকেট হাতড়ে রায়হানের বাসার ঠিকানা বের করে দেখান পরোপকারী লোকটি তবু বগলের তলে হাত লাগিয়ে টেনেটুনে বাসার কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলে কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজে আসে তাঁর

সারা দেহের সমস্ত শক্তি পায়ের পাতায় এনে জড়ো করে জলিল মাস্টার সিঁড়িতে পা রাখেন ভাগ্যিস রায়হানের বাসা দোতলায়, আরও উপরে হলে কী যে হতো! দোতলা পর্যন্ত উঠতে সিঁড়ির প্রথম প্যাঁচ ঘুরতেই তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন, এখানে রক্তের ধারা এলো কোত্থেকে! আতংকে উৎকণ্ঠায় গলা শুকিয়ে কাঠ উদ্বিগ্ন চোখে উপরের দিকে তাকাতেই আর্তনাদ করে ওঠেন সিঁড়িতে পড়ে আছে বঙ্গবন্ধুর বুলেট-ঝাঁঝরা-নিথর দেহ রক্তের আল্পনা এঁকেবেঁকে নেমে গেছে নিচে, দক্ষিণে একেবারে বঙ্গোপসাগরে জলিল মাস্টার এখন এই রক্তপ্রবাহ এই প্রাণহীন দেহ অতিক্রম করে কীভবে উপরে উঠবেন! বউমাকে সঙ্গে নিয়ে রায়হান কি এতক্ষণে ফিরে এসেছে! এই রক্তাপ্লুত সিঁড়ি মাড়িয়ে ওরা বাসায় ঢুকলো কী করে! ভেবে পান না- কী করে সম্ভব? বঙ্গবন্ধুর মরদেহ এখানে এলো কেমন করে?
হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন জলিল মাস্টার রক্তাক্ত সিঁড়ির উপরে পাছা লেপ্টে বসে বঙ্গবন্ধুর ঝুলে পড়া মাথাটা দুহাতে কোলের উপরে তুলে নেন নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন অপলক হঠাৎ চমকে ওঠেন, বঙ্গবন্ধুর ঠোঁট জোড়া কি একটু নড়ে উঠল? কী যেন বলতে চান মনে হয় কী বলবেন নেতা? আবারও কি বলবেন-আর যদি একটা গুলি চলে... যদি চলেই গুলি তাহলে কী করতে হবে সে নির্দেশ আর শোনা হয় না পিতৃহারা পুত্রের মতো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন জলিল মাস্টার বঙ্গবন্ধুর স্পন্দনহীন বুকের উপরে আকুল হয়ে লুটিয়ে পড়েন এবং বিরামহীন কাঁদতেই থাকেন
কখন যেন রায়হান এসে বাবার গায়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, তার কণ্ঠে মৃদু ভর্ৎসনা ফুটে বেরোয়-বিছানায় গিয়ে ঘুমুলেই তো পারতে বাবা সোফাতে বসে ঘুম হয়!
আমি ঘুমুচ্ছিলাম! জলিল মাস্টারের চোখে বিস্ময় উদ্বেগ আর আতঙ্কের মাখামাখি
ঘুমের মধ্যে খুব কষ্ট পাচ্ছিলে বাবা তুমি কি কাঁদছিলে?
ধসমস করে উঠে বসেন জলিল মাস্টার হাতের তেলোয় চোখ রগড়ে বলেন,
কই না তো! মুখে অস্বীকার করলেও তিনি সোফা ছেড়ে উঠে পড়েন চোখ মুখ থেকে দুঃস্বপ্নের ছায়া মুছে ফেলতে দ্রুতপায়ে চলে যান বেসিনের কাছে ট্যাপ ছেড়ে পানির ছিটা দেন মুখমণ্ডলে আর ঠিক তখনই বেসিনের উপরে দেয়ালে সাঁটা আয়নায় বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে আর্তনাদ করে ওঠেন-ক্ষমা করো পিতা, আমরা প্রতিবাদ করতে পারিনি
রায়হান ছুটে আসে ঘরে বাবার পিছনে দাঁড়িয়ে জানতে চায়;
কী বলছ বাবা! তোমার কি শরীর খারাপ করছে?
আতঙ্কে বিস্ফারিত চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকান জালিল মাস্টার ছেলের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন,
ওই যে আয়নার ভেতর থেকে বঙ্গবন্ধু কী যেন বলছেন
সংকটটা ধরতে পারে রায়হান বাবার হাত ধরে সে বুঝাতে চেষ্টা করে,
আয়নার ভেতরে বঙ্গবন্ধু কোথায় বঙ্গবন্ধু আছেন তোমার পিছনে এই-যে বাবা, তুমি তাকাও পিছনে
পিছনের দেয়ালে সত্যি সত্যিই বঙ্গবন্ধুর ছবি টানানো আছে জলিল মাস্টার পিছনে ঘুরে অবিশ্বাসের চোখে তাকান সেই ছবির দিকে রায়হান বুঝিয়ে বলে-দেয়ালের এই ছবিটার প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে আয়নায়
জলিল মাস্টার অবাক হন, আজ দুদিনে কই নজরে পড়েনি তো এই অবিস্মরণীয় ছবিটি ছবি কি এখানেই ছিল!
না বাবা, আজই এটা টানিয়েছি এখানে ছবির দিক থেকে চোখ নামিয়ে রায়হান বাবাকে আশ্বস্ত করে-ঘরে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকলে সাহস বাড়ে বুকে

পুত্রের কথা শোনেন দেয়ালে টানানো ছবির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকান আবার আয়নার প্রতিবিম্বের সঙ্গে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মিলিয়ে দেখেন জলিল মাস্টারের চোখ থেকে তবু বিভ্রমের ঘোর কাটে না আয়না থেকে চোখ নামাতেই প্রচণ্ড চম্কে ওঠেন-সাদা বেসিনভর্তি টকটকে লাল রক্তের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কতির্ত মুণ্ডু হা হা করে হাসছে জলিল মাস্টার আর কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারেন না কোনোদিকে দৃষ্টি তার পেরেকবিদ্ধ হয়ে আটকে থাকে সেই কতির্ত মুণ্ডুতে এবং স্বপ্নভুক দুই চোখের মণিতে
 








No comments

Powered by Blogger.