অন্ধ হওয়ার গল্প: সাঈদ কামাল


অন্ধ হওয়ার গল্প

সাঈদ কামাল



তাকে অন্ধ করে ব্রিজের উপর ভিক্ষুকের সঙ্গে বসিয়ে রাখা হয়। সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের মতো দু'চোখে অন্ধকারের স্রোত বয়ে যায় তারবিগত দিনের কথা মনে করে যখন সে উপলব্ধি করে একটি ব্রিজের উপর বসে  'আল্লাহ মেহেরবান, অ্যাকটা ট্যাকা দিয়া যান'  বলে তখন বুকের অনেক গভীরে অসংখ্য সুঁচ বিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত হতে থাকে। তখন অনেকটা যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতে ভারসাম্যহীন মানুষের মতো বলে, আল্লাহ মেহেরবান, অ্যাকটা ট্যাকা দিয়া যান। চারপাশে ভাসে মৃত্যুর মতো অন্ধকার, সে ছটফটায়, যেন ঘুমের মধ্যে তীক্ষ্ণ ধারালো ছুরি নিয়ে ভয়ংকর কোন জন্তু তাকে দৌড়ায়, সে দৌড়ে, নদীর পাড়, কাঁটাভরা পথ, ধানক্ষেতের আলঝোঁপের মধ্য দিয়ে দৌড়ে খুব ক্লান্ত হয়। অথচ একদিন কতো বৃহৎ স্বপ্ন  ছিলো, মধ্য রাতের জ্যোৎস্না কিংবা বিকালের স্নিগ্ধ দ্যুতির দিকে তাকিয়ে কতো কথা ভাবতো যে; কিন্তু জীবন তাকে বড়ো অবহেলায় ফুটবলের মতো খেলতে খেলতে নিয়ে আসে এই ব্রিজে। তার কাছে মনে হয় যে জীবন গভীর চক্রান্তে  অবরুদ্ধ হয়ে আছে, যে জীবন এমন এক শক্তিমান অস্ত্র যা  তাকে ভয় দেখিয়ে আঘাত করে তার প্রাপ্য আদায় করে নিচ্ছে। যাকে ফেরানোর মতো অস্ত্র তার নেই, সে এতোটাই দুর্বল যে জীবন তাকে পদাঘাত করতে করতে নর্দমায় ফেলে দিলেও প্রতিবাদ করার ‘প্র’ উচ্চারণ করার ক্ষমতা নেই।

তাকে ঠিক কীভাবে অন্ধ করা হয় তা মনে পড়ে বহুদিন পর এক সন্ধ্যায়, তখন মাগরিবের নামাজের আজান হচ্ছিলসে মনে করতে পারে যে, তখন তার চোখে স্বচ্চ তারার মতো ভেসে উঠতো মানুষের ভেতরের প্রতিচ্ছবি। মানুষের মুখ দেখে অন্তরের সব কথা বা মানুষের হেঁটে যাওয়া দেখে বলে দিতো তার ইচ্ছে কিংবা চাওয়া। এমন কী গাছে বসে থাকা পাখি কিংবা খাম্বার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কুকুর দেখেও বলে দিতে পারতো, তাদের উদ্দেশ্য। একদিন ফুলের বাগানে এক ফর্সা তরুণকে হাঁটতে দেখে সে বলে যে, 'একটু পরই আকাশ অন্ধকার হয়ে ঝুম বৃষ্টি নামবে।'  লোকেরা এই কথা শুনে খুব হাসে; কেউ বললো যে,  'এমন উত্তপ্ত সূর্যের দিনে বৃষ্টি হবে, কী যে পাগল লোকটা, হাহাহা; কেউ আবার বলে, 'ফুলের বাগানে ফর্সা তরুণের হাঁটার সাথে বৃষ্টির কী সম্পর্ক?' ঠিক তার আধ ঘণ্টা পরই আকাশ অন্ধকার হয়ে ঝুম বৃষ্টি নামে। লোকেরা খুব অবাক হয় এবং তার সন্ধান করে তখন তাকে দেখা যায় না কিংবা সে তখন অন্য কোথাও চলে যায়। তারপর কোন এক বিকেলে ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহ কিংবা মধ্য ভাদ্রে উঠোনের নারিকেল গাছে ডাবগুলির দিকে তাকিয়ে থাকা এক মহিলাকে দেখে বলে যে, 'তিনি ঠিক তিনঘণ্টা পর পাগল হবেন; তিনি রঙ কে বলবেন রক্ত আর আগুন কে বলবেন ফুল,' ঠিক তাই হলো, মহিলা বদ্ধ পাগল হয়ে গেল। তার মনে পড়তে থাকে। একবার গড়গড় শব্দে একটা ফ্যান ঘুরতে দেখে বলে যে, 'শেষ রাত্রে অনেকগুলো ডাকাত মিলে এক যুবক কে এই ফ্যানে ঝুলিয়ে রাখবে এবং লোকেরা জানবে যে সে আত্মহত্যা করেছে। 

'তারপর আরোও অনেকদিন অনেকবার এমন হলো; একবার কংস নদের পাড়ে এক সাপুড়ে কে কবচ বেচতে দেখে বলে যে, 'একটু পরই এক মাতাল এসে সাপুড়ের কাছে পেট ব্যথার ওষুধ চাইবে, সাপুড়ে তাবিজ দেওয়ার পর যখন পেট ব্যথা কমবে না  তখন সে মাতাল সাপুড়ে কে সেন্ডেল খুলে মারবে। তার গালে পিঠে জুতুর ধুলো লেগে থাকবে।' সেদিন তাই হলো, তার কথা শুনে যাদের অবিশ্বাস হচ্ছিল তারাও খুব আশ্চর্য হলো। কেউ কেউ অবশ্য জানতেও চাইলো, 'আমার বাড়ির পথে কী হবে?' কেউবা জিজ্ঞেস করলো, 'আমার দোকানে যে কর্মচারী থাকে সে কী চুরি করে?' কেউ বললো, 'আমার চোখগুলো দ্যাখে বলুন তো, তারা কী বলতে চায়?' সে ভালো ভালো উত্তর দিলো এবং লোকেরা এই জীবনে এর চেয়ে বেশি আর আশ্চর্য হয়নি। তাতে এক শ্রেণির মানুষের বড্ডো উপকার যেমন হয় অন্য শ্রেণির ক্ষতি হয়। কিন্তু তার যে শুধু ক্ষতি হচ্ছিল তা বুঝতে ঢের দেরি করে সে। জনসভায় কোন এক নেতা বক্তৃতা দিচ্ছেন বা কোন ডাক্তার চিকিৎসা পরামর্শ দিচ্ছেন অথবা কোন নেতা মিটিং করছেন এসব দেখে দেখে সে বলে যে, 'ওর মুখে হাসি হাসি থাকলেও ভিতরটা খুব কুৎসিত, সে ডাক্তার নয় যেন ডাকাত তারপর নেতার উদ্দেশ্য সে বিড়বিড় করে বলে, বড় ধোঁকাবাজ লোকটা।' তখন বহু ডাকাত কিংবা মন্দ লোক অথবা লোভী মানুষদের বিপদ বাড়তে থাকে, তাদের পথে কাঁটার মতো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সে। যে কাঁটা আগুনের মতো ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে চোখের সম্মুখে ঝুলে থাকে, নিমিষে যা অশরীরী ঝড়ের মতো উদ্মাদ হয়ে বহুকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে

তখন তারা যুক্তি করে যে  যেকোন ভাবে তাকে সরাতে হবে, নইলে আর উপায় নেই, সব শ্যাষ হয়ে যাবে। তখন তারা ভাবতে বসে, কেউ বলে যে হত্যা করতে হবে, কেউ পরামর্শ দেয় দ্যাশছাড়া করার, কেউ আবার জেলে দেওয়ার কেউবা অন্ধ করে দেওয়ার কথা বলে। অনেক আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন তারা চিন্তা-ভাবনা করে, কী ভাবে কী করা যায়তারপর একদিন খুব ভোরে তাকে ডেকে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেউ একজন তাকে ডেকে নিয়ে আসে। সে কোন প্রশ্ন না করে অঙ্কিত মানুষের মতো লোকটির সাথে নীরবে চলে আসে। এসে দেখে যে, একটা উঠোনে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ জন মানুষ বসে আছে, যাদের সবার দৃষ্টি এক দিকে, একজন  তার দিকে তাকিয়েই বললো, দাঁড়িয়ে থাকতে বলো। অন্যজন হাতের সিগ্রেট ফেলে দিয়ে সিগ্রেটের শ্যাষ অংশ মাটির সাথে পিষতে পিষতে বলে যে বিচার শুরু করো। এতোগুলো মানুষের মধ্যে শুধু সে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে তখন ঘৃণার বস্তু, ড্রেনের খুব দুর্গন্ধময় কীট মনে হয়, লজ্জায় মাথা হেঁট করে রাখে। দুঃখের মতো নিঃশব্দে ভাবে যে অনেকগুলো মানুষের সামনে দুর্গন্ধময় পোকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। একজন তার নাম জিজ্ঞেস করে 'তোর নাম কীরে? ' কিছু হয়নি এমনিভাবে সে উত্তর দেয়, 'মনসুর উদ্দীন।' তারপর কালো বেঁটে মোটা একজন প্রশ্ন করে ,'তুই আলতামির বোনকে কী ওষুধ দিয়ে কেনো পাগল করলি ?' মনসুর উদ্দীনের মনে হয় সে অভিনয় করছে এবং অভিনয়ে সেই হিরো তাই সে মিনমিনে গলায় বলে,
'আমি কোন ওষুধ দিইনি, পাগল করার প্রশ্নই উঠে না, তাছাড়া আলতামির বোন টাকার জন্য---'
কথা শেষ করার আগে অন্যজন কদর্য গলায় বলে
'চুপ বেয়াদপ, মিথ্যে বলবি না। তারপর একটু থেমে সে বলে,
'তুই এক যুবক কে ফ্যানে ঝুলিয়ে মেরেছিস ক্যানো?'
মনসুর উদ্দীন খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
'আমি কেউরে ফ্যানে ঝুলিয়ে মারিনি।'
অন্যজন গালি দিয়ে বলে
'শালা তুই ডাকাতি করিয়েছিস, তর শাস্তি কঠিন হবে।'

তখন সে দেখতে পায় যে এইসব লোকেরা কেউ চায় না সে দেখুক, কেউ চায় না কথা বলুক, এরা সবাই তার অন্ধতা কিংবা মূক হয়ে থাকা চায়। সে আরোও দেখে অন্ধ হবে না ঠিক তবে আর চোখে দেখতে পাবে না এবং অল্পক্ষণ পর তার হাত কেটে দেওয়া হবে। তখন সে বলে যে, ’আমি এমন কিছু করিনি, শুধু যা দেখেছি তা বলেছি, যা দেখা তা বলা যদি অন্যায় হয় তবে যারা তা করেছে তাদের অনেক বেশি অন্যায়। আমার শাস্তির অনেক আগে তাদের শাস্তি বেশি জরুরী।'
লোকদের মধ্যে একজন লাফ মেরে দাঁড়িয়ে বলে,
'তোর পরামর্শ শুনতে আসিনি কেউ, তুই খুব চুপ থাকবি, কথা কলি জিভ কেটে দিমু।'
সে আর কথা কয় না, বুকের ভিতর দ্রিমিদ্রিমি ধ্বনি হয়, কথা আটকে আসে। তখন চোখ বন্ধ করে অল্পক্ষণ পরই মিটমিট করে তাকায়, সহসা দেখে যে একজন চকচকে ছুরি হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে; তার মনে হয় যে কোন এক কালো জগৎ থেকে হিংস্র কোন প্রাণী আগুনের দুটো জিভ বের করে আসছেশুনতে পায় যে, সবার সিদ্ধান্তক্রমে তার শাস্তি হাত কেটে নেওয়া। যেন সমুদ্রের গর্জনের মতো সেই কণ্ঠস্বর কিংবা অসংখ্য ক্ষুধিত রাক্ষসের কণ্ঠস্বর
হাত কীভাবে কাটা হয়, তা সে ভুলে যায় কিংবা ভুলে যেতে চেষ্টা করে। হয়তো একজন তার বুকের উপর চাপ দিয়ে ধরে অন্যজন ডান হাত টান দিয়ে এবং তৃতীয়জন ছাগল বলি দেওয়ার মতো গ্যাচাং করে কেটে ফেলে
তবে তার মনে পড়ে, হাত কেটে নেওয়ার পর শুনতে পায় যে কেউ বলছিল, যদি আর কোনদিন কথা বলিস কিংবা এইসব দেখিস তবে আর তোর গলা থাকবে না। আরোও শুনতে পেয়েছিল যে,
'কোনদিন চোখ খুলবি না, হাতে লাঠি নিয়ে অন্ধের মতো হাঁটবি।'
তখন থেকেই সে চোখ বন্ধ করে রাখে এবং দীর্ঘদিন পর বুঝতে পারে একটা ব্রিজের উপর বসে আছে এবং ইচ্ছে করলেও আর চোখ খুলতে পারে না। বহুবার চেষ্টা করে চোখ খুলতে, ব্যর্থ হয়। তখন একদিন পাশে বসে থাকা বুড়ো ভিক্ষুক পান খেতে খেতে কিংবা থালা হতে পকেটে টাকা রাখতে রাখতে বলে যে,
'তুমি তো অন্ধ নও তবুও কী চোখে দ্যাখো না, সত্যি দেখো না?'
মনসুর উদ্দীন বলে যে,
'মনে হয় যে চোখের ভ্রুতে সুতো দিয়ে বেঁধে রেখেছে,চোখ মেলতে ভয় হয়, যেন ছিঁড়ে যাবে।'
তারপর হয়তো সে আরোও প্রশ্ন করে,
'বিয়ে করেছো নাকি কীংবা আর কে আছে তোমার?'
মনসুর উদ্দীন বলে যে,
'আমি এখনো পড়তে ছিলাম, অনেক সাধ ছিল যে ডাক্তার হবো, কিন্তু হলাম যে ভিক্ষুক!'
তখন হয়তো কষ্ট হয় ভিক্ষুকের, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আহ কী ভয়ংকর মানুষ; বিষ হজম করতে পারলেও সত্যকে পারে না, সত্য যেন বিষের চেয়েও বিষাক্ত, তাই নিষ্পাপকেও দণ্ড দিতে পারে, সূর্যের মতো দীপ্তিময় চোখকে অমবস্যা রাত্রির চেয়েও অন্ধকার করতে পারে। হয়তো তার চোখে জল আসে, গভীর মমতা নিয়ে সে হয়তো বিস্কুট বা পান খাওয়ার কথা বলে। তখন আরোও বলে যে, এই দ্যাখো আমি অন্ধের অভিনয় করে ভিক্ষে করি আর তুমি বেঁচে থাকার সাধে অন্ধ সেজে ভিক্ষে করো, তারপর হয়তো তারা বিস্কুট কিংবা পান চিবোতে থাকে। এর পর হয়তো অনেক দিন কেটে যায়, সে হয়তো ভুলে যেতে থাকে বা ভুলে যেতে চেষ্টা করে। একদিন কত কী দ্যাখতো, কত কিছু ঝলমলে বা কালো হয়ে ভেসে ওঠতো, বহুদিন সেসব দ্যাখে না এই ভেবে এক আধটু  চেষ্টা করে চোখ মেলতে, বড়ো ব্যর্থ হয় সে; নিজেকে তখন কুৎসিত পরাজিত ভেবে হয়তো কাঁদে, চোখের পাতা ভিজে জল নামে। তবুও চোখ মেলতে চেষ্টা করে, হয়তো অন্যকিছু দ্যাখার জন্য নয় চোখের জল দেখতেবিফল হয়। যেন কোন কষ চোখের পাতায় আটকে আছে, যেমনটি দেয়ালে পোস্টার সাঁটা থাকলে তা না ছিঁড়ে কিংবা দেয়ালের রঙ না উঠিয়ে তুলা যায় না, একটু টান পড়লে ছিঁড়ে যায়। সে ভয় পায়, খুব মায়াও হয় চোখের জন্য, হয়তো ভাবে চোখে আলো নেই তো কী, চোখ তো আছে, এই ভেবে সামান্যটুকু সান্ত্বনা বোধ করে। কিন্তু যখনই মনে হয় চোখগুলো চিরদিনের জন্য অন্ধ হয়ে গেছে, পৃথিবীর আলো দেখার সৌভাগ্য আর হবে না, আবারো চেষ্টা করে, ব্যর্থ হয়

*সাঈদ কামালগল্পকার ঔপন্যাসিক জন্ম   জুন ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলার এক নিভৃত গ্রামে প্রকাশিত বই: 'বৃষ্টি ছিল আমাদের ভালোবাসায়' (যৌথ কাব্যগ্রন্থ) এবং 'তৃতীয় জীবন' (গল্পগ্রন্থ)


No comments

Powered by Blogger.