মাহবুবা স্মৃতির পদাবলি


মাহবুবা স্মৃতির পদাবলি

   
agooan -mahbuba smrity - আগুয়ান - মাহবুবা স্মৃতি

                          

অকথ্য কিছু শব্দ


এই যে তুমি
হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি!
গহীনে কান পাতো,
কিছু শব্দ শুনতে পাচ্ছো কি?
যদি ভেবে থাকো সামান্য
- ভুল
এই শব্দে রয়েছে গাঢ় নীল, লাল লাল রক্তকরবী,
কিছু অভিশপ্ত গানে মূর্ছা যাওয়ার মতোই করুণ সুর,
আছে অতৃপ্ত আত্মায় জমে থাকা ভালোবাসার খোরাক,
আছে দীর্ঘ কিছু চাপা নিঃশ্বাস
আরো আছে সমুদ্রের মতোন বিশাল স্রোত...
শুনো শুনো, আরো আছে নোনাজলের হুংকার,
অলব্ধ কিছু ব্যর্থ ছবি
আরও আছে সাজানো কিছু স্বপ্নের ভাঙন,
ক্ষুধার্ত পেটের হাহাকার
অশ্রুহীন কাব্যের প্রলাপ, ঘৃণিত অভিসম্পাত!
শুকনো বালুচর, আবার-
রাধার মতোই স্রোতস্বিনীর ছুটে চলা,
আছে রোমিও- জুলিয়েট এর মতোই কিছু প্রেমের গীত,
আছে মূর্ছনা- তীব্র চিৎকার
শৃঙ্গায় ফুঁ দেয়ার মতোন কাঁপন অনবরত ঝরে পড়ে;
আরো... আরো... অনেককিছু

এখানে গহীনে শুধু শব্দ আর শব্দ...
ভাষাহীন, অকথ্য
কিছু মৃত্যুর জেগে থাকা চিৎকার,
যা গভীরে ডুবলেই বুঝা যায়!



শারদ বেলার কল্পকথা


কোনো এক শারদ সন্ধ্যা;
যখন আঁধারের বুকে অরুণ রোদের
এক পশলা হাসি এক কোণে খেলা করে,
আমি সেই- পশ্চিমাকাশের আলো ছায়ার
কিংবা- গোধূলি রাঙানো ছাদের কথা বলছি

ছাদের ছায়ানীড় - অনেক প্রাণের অস্তিত্ব,
আমি সেই সায়াহ্নের অতলে ভেসে আসা
এক ফালি জোছনা ভরা যৌবনের
টানে হচ্ছি মাতাল,
সবকিছু এখানে শোভন

ভালো কি মন্দ! এই নিদ্রায় ভর করে না
এখানে সারাক্ষণ' আলো-ছায়ার খেলা,
কখনো রোদ, কখনো বা বৃষ্টি
কিংবা- সাদা মেঘের ভিড়ে
ঝলমল করা রাঙা আলোর প্রবেশ
আমি সেই সময়ের কথা বলছি,
যখন হিমছড়ি আর দূর পাহাড়ের কালো ধোঁয়ার
অন্ধকারের ছায়ায় কারো পা পড়ে;
আমি সেই সংকটের রেশ ধরে
ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকানো তিমির আর
শূণ্যলোকে উড়ে বেড়ানো সাদা পালকের
এক সজীব কোমল আর স্নেহের খেয়ালে
পদধূলি গায়ে মাখিয়ে
নীলাচলের স্বপ্ন দেখে চলছি

সেই- শারদ কোনো বেলা,
যখন কাশফুলেরা নিজেকে মেলে ধরে
কোনো প্রিয় বা প্রিয়ার কিংবা-
কপোত কপোতীর মহামিলনের ক্ষণে,
আর উড়ে বেড়ানো সাদা মেঘেরা
আঁচল বিছিয়ে সংকট থেকে জড়িয়ে রাখে
এমন এক সময়,
যখন পাখিরা যায় নীড়ে ফিরে,
নিশাচরেরা ডেকে যায় করুণ সুরে,
এমনই এক রাত্রির গভীর;
যখন কোনো শরীরের ঘ্রাণ মাদকতায়
আচ্ছন্ন করে কঠিন অপেক্ষার প্রহর গোনে
যখন মেঘলা-রোদেরা মিশে গিয়ে
ভরা জোছনার কামুক দৃষ্টি মেলে ধরে,
এমনই শারদ যৌবন,
যখন প্রেম লীলায় চুম্বনে চুম্বনে
পেটের খিদে মেটায় একজোড়া
সবুজ দম্পতি
আর সৃষ্টি করে নব অঙ্কুরের,
এই রজনী শেষে যার আগমন এর
অপেক্ষায় ধীরে ধীরে বেড়ে চলে
এমনই শারদ বেলা,                                  
তুমি -আমি, কিংবা নীল জোছনা
একসাথে পাশাপাশি হাঁটি;
আর মুঠো তলে ভবিষ্যতের অনাগত সময়কে
পুঁজি করে সবুজ কোনো পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে
শারদ বেলার ছবি আঁকি



 বিবর্তন              


ধরো, আমার মৃত্যুকাল খুব বেশি দেরি নেই;
এই ধরো... একটু পরেই মারা যাচ্ছি,
খুব কি বেশি ক্ষতি হবে?
আমার মৃত্যুকে আঁকড়ে ধরে খুব কি বেশি পরিবর্তন হবে?
নাকি ভালোবাসার চাদরে মোড়া স্মৃতিটাকেই আঁকড়ে ধরে দিনাতিপাত করবে!
কিংবা তোমার তুমিকে বারবার আমাতেই বিসর্জন দিবে!
ধরো, আমার ইচ্ছের মৃত্যুপথে সহস্র বাঁধা এসে পথ আটকালো,
তুমি কি তখন সকল বাধাকে সরিয়ে আমাকে যেতে দিবে?
নাকি নিজেই বড় বাধা হয়ে জড়িয়ে ধরে পথ আগলে দাঁড়াবে!
ঠিক যেমন মাকড়শার জালে মৌমাছি উড়তে গিয়েও আটকে থাকে-
ভীষণ শক্ত করে!
মনে কর, আমার মৃত্যুকে ঘিরে অনেকগুলো পরিবর্তন আসলো,
এই ধরো...  রোদের স্পর্শ পুরোপুরি হারিয়ে গেল,
রাতের বুকে জোনাকিরা আর তাদের আলো ছড়ালো না,
নীড়ের পাখি নীড়ে যেতেও ভুলে গেল,
বর্ষায় কোনো কদম ফুটলো না,
কৃষ্ণচূড়া তার লাল আভা মেলে ধরলো না
ধরার সমস্ত ভালোবাসা শুকনো খড়ের মতো
অনুভূতিহীন মরূদ্যানে পরিণত হলো,
তখন কি তুমি সবকিছু ঠিক করে দিবে?
ধরার বুকে জোছনার সমস্ত কলঙ্ক ধুয়ে ফুল ফুটাবে?
কিংবা- সূর্যটাকে জোর করে ধরে এনে পৃথিবীকে আবার রাঙাবে!
ভালোবাসাকে রোপন করবে?
নাকি কিছুই করবে না!
শুধু হতবাক তুমি নিঃসঙ্গতায় আমাকেই খুঁজে ফিরবে!
আবার মনে কর, আমার মৃত্যুবাণে-
ধরার বুকে ভয়ঙ্কর বজ্রপাত শুরু হয়ে গেল;
অজস্র শ্রাবণী আমাকে আঘাত করতে লাগলো,
আমি তখন ভয় পেয়ে হঠাৎ তোমার নাম ধরে ডাকলাম!
তুমি কি ছুটে এসে আমাকে আগলে রাখবে?
নাকি মৃত্যুর তোরণে একলা রেখে মুখ ফিরিয়ে নিবে!
রাম যেমন সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে অগ্নিচোখে মুহ্যমান ছিল!
ধরো, আমার মৃত্যুর কথা শুনে সবাই হতবাক...
বিমর্ষকাতর... মনভোলা...
এই ধরো আমার মৃত্যুতে সত্যিই অনেককিছু হয়ে গেল;
আমাকে নিয়ে প্রতিদিনই স্মরণসভা বসানো হলো,
আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগাতে সবাই এসে ভাগ বসালো...
তুমি কি চুপ করে থাকবে?
নাকি সবাইকে সরিয়ে শুধু তোমার স্মৃতিতে আমাকেই ধরে রাখবে!
মনে কর, আমার মৃত্যুর পর-
রোজ কেউ না কেউ তোমাকে এসে সান্ত্বনার বাণী শোনালো!
মন খারাপ না করার জন্য পরামর্শ দিলো,
তুমি কি তাঁদের ফিরিয়ে দিবে!
নাকি বারবার আমাকে মনে করে আরো ভেঙে পড়বে!
ধরো, আমার মৃত্যুর পর গগনবিদারী চিৎকার পথ থেকে পথে শোনা যাচ্ছে,
রক্তাভ পৃথিবীতে শোকের ছায়া নেমে আসলো,
কিংবা- আমার মৃত্যুতে রোদের চোখে ঝলমলে হাসিটুকু একটু হলেও বেঁচে থাকবে!
তখন কি তুমি হাসবে?
নাকি মন খারাপ করে চেনা পথে তখনো দাঁড়িয়ে থাকবে এই আশায়-
তোমার আমি ফিরে আসবো আবার!
আচ্ছা ধরো, আমার মৃত্যুকে ঘিরে কিছুই হলো না...
এই ধরো ধরার সমস্ত নিয়ম আগের মতোই বহমান;
প্রতিদিন সূর্য তার লাল আবির নিয়ে হাজির হয়,
তমসাবৃত চোখে জোছনার নীলাভ আভা রোজ ঝরে পড়ে,
জোনাকির ঠোঁটে শতশত তারার মিছিল মিটমিট করে জ্বলে
পাখির ডানায় সহস্রদল অভিমান রোজ উড়ে চলে!
তখন কি তুমি খুব কাঁদবে?
নাকি নতুন পৃথিবীতে গা ভাসিয়ে আমাকেই ভুলে যাবে!
ঠিক যেমন সময়ের বিবর্তনে ভালোবাসায় অনেকগুলো পরিবর্তন আসে!


শুকপাখি


ধূলোর আস্তরণে লেপ্টে থাকা নিঃশ্বাস
ধূসর... বড় মলিন এই দীর্ঘশ্বাস!
ঝাপসা চোখে ভেসে আসা নষ্ট ঘামের গন্ধে-
ভারী হয়ে আসে অধরের কান্না;
ময়লা ললাটে গড়িয়ে পড়তে চায় কিছু স্মৃতি,
বাঁধসাধে বর্তমান আর অতীতের দ্বন্দ্ব!

সুখ সুখ করেও দুঃখের পরিহাস!
মৃত্যুর মতোই কামনাহীন জীবনের প্রলাপ,
অচল আর নিরুত্তাপ চোখের কোণে
দুর্বোধ্য কষ্টের জল এসে থামে!
নিঃশ্বাসেরা দীর্ঘ থেকে আরও... আরও... দীর্ঘ হয়;
আসে না সুখ, মরে না স্মৃতি!

অবচেতনে শোনা যায় দুঃখের কান্দোন!
বেখাপ্পা ইচ্ছের কাল ফুরিয়ে আসে,
মর্মর পাতার ধ্বনি বুক চেপে হাসে!
ললাট জুড়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্তেরা ভাসে!
আর আমার টইটুম্বুর জলরাশি গাল বেয়ে পড়ে!
রাস্তার দু'ধারে কষ্টের গাছ,
ফুল ফুটে জল ধরে সারা বছর!
আমি ফুল কুড়াই, আঁজলা ভরে তৃষ্ণা মেটাই...
শুকপাখিটা ডালে এসে বাসা বাঁধে,
আমি বাঁধা দেই না,
শুকপাখিকে নিয়েই আমার নষ্ট জীবন!


ঘাসফড়িঙ


আমারো কিছু কথা ছিল
অব্যক্ত শব্দের এক পাহাড়ও গড়েছিলাম;
কিন্তু কি হলো দেখো,
আজ পরকীয়ার মতোই নষ্ট হয়েছে বাক
গোংরানোর মতো
পড়িয়ে দিয়েছে কেউ- অবরুদ্ধ মালা!

রূপকথার মতোই
আমারো কিছু স্বপ্ন হেসেছিল,
শুভ্র আঁচলে আমারো কিছু ইচ্ছে খেলেছিল,
এখন-
শ্যাওলায় মুড়িয়ে ঠুকরে কাঁদে!

কিছু কবিতা আজ বড়ই বেমানান
লাঞ্ছনার মতোই মগজে চিড়া কুটে!
আমার নিদ্রাহীন যাতনারাও শকুনের থাবা দিয়েছে-
বিভৎস!
সাঁই সাঁই উড়ে চলে কাকতাড়ুয়া-
নোনতা কিছু চোখের জলে!
এখানে বি-রং
অসভ্যতার ছড়াছড়ি,
চোখের কালো দাগ আজও স্পষ্ট!
কি ঘৃণ্য!
আমাকে দগ্ধ করো মাটি!
সাদা বকের মতো স্নিগ্ধ করে- জল শুকাতে দাও প্রিয় আঙিনায়...
হে নষ্টবীজ, তুমি ধ্বংস হও...
কারণ-
আমারও যে মাতৃত্বের স্বাদ আছে,
মোনালিসার দুটি চোখ হাসে,
মাদার তেরেসার মতোই স্নেহ জমা বুকে,
ভালোবাসার মতো আমারো কিছু অনুভূতি হৃদয় জুড়ে...
দুগ্ধমুখ আর কত পঁচাবে?
আমারো যে প্রাণ আছে
রক্তকরবীর মতোই রোজ যেখানে
রুধির ধারা ফোটে,
কখনো লালার মতো আমারও -জল বেয়ে পড়ে!

বাল্যরচিত কবিতারা আজ -
পুরোনো ডায়রিতে জ্বলছে
ছেঁড়াপাতায় কবরের নিস্তব্ধতা!
আমারও যে কিছু চাওয়া ছিল...
অভিলাষী কিছু গান ছিল
অনবরত কিছু বলার ছিল
আত্মকথনে হৃদয় পোড়ে,
বেঈমান সময়!
মুক্তি দাও তবে...
আমি উড়বো, বাতাসে বাতাসে মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়াবো;
বন্যলতারা সবুজে ঢেকে যাবে
শাখায় শাখায় ফুটবে নতুন কুঁড়ি,
আর
শিকলহীন নগ্নপায়ে বাজবে- অভিলাষী নূপুর...
কারণ-
আমারও কিছু স্বাধীনতা আছে...
অনেক কিছুই দেওয়ার আছে,
প্রেমের আস্বাদনে চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ে,
আমারো মুক্তির কিছু কালজয়ী গান আছে,
বেঁচে থাকার মতো ঘ্রাণ আছে,
ঠিক ঘাসফড়িঙ এর মতোই উদার!



No comments

Powered by Blogger.