মাহবুবা স্মৃতির গল্প: খুন

খুন

মাহবুবা স্মৃতি







প্রায় পাঁচ বছর আগে আমি আমার ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হই। কিন্তু আজ অবধি তাঁর কাছ থেকে একটু ভালোবাসার স্পর্শ পাইনি, যা পেয়েছি তাতে মেশানো আছে অন্য কারো প্রতি আসক্ত হবার নেশা, ঘৃণা আর হিংসাত্মক অনুভূতি। তবুও কেন জানি মানুষটাকে আমি প্রচণ্ড রকম ভালোবাসি। আর সেই ভালোবাসাকে শুধুমাত্র আমার মধ্যে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আজ তাঁকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবাক হলেও এটাই সত্য। আর এই সিদ্ধান্ত এক দিনে নেইনি, বরং দিনের পর দিন জমানো সব তিক্ত অভিজ্ঞতার ফল এটা। যদিও প্রথমে দ্বিধা ছিল। আজ সেটাও নেই। আপনারা হয়তো ভাবছেন,  'এই মেয়ে নিশ্চয়ই পাগল! নয়তো নিজের স্বামীকে কেউ খুন করার কথা বলে!' হ্যাঁ, আমি পাগলই। অনেকদিনের কষ্টের সমাপ্তি ঘটাবো আজ।



তন্ময়কে আমি প্রথম আমাদের ভার্সিটির বাসে দেখি। মাথা ভর্তি ঘনচুল। সচরাচর ছেলেদের মাথায় এতো চুল দেখা যায় না। আমি আড়চোখে ছেলেটার মাথার চুলের দিকে তাকাচ্ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছিল। আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁর হাসি দেখছিলাম! মেয়েরা সুন্দরভাবে হাসতে জানে, এটা সবাই জানি। কিন্তু কোনো ছেলেও যে এতো সুন্দরভাবে হাসতে পারে, আমার জানা ছিল না। হঠাৎ তন্ময়ের চোখে চোখ পড়ে যায় আমার, ও ইশারায় জানতে চায়, কোনো সমস্যা কিনা! আমি না বোধক মাথা নেড়ে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিই অন্যদিকে। লজ্জায় আমার মরে যাবার মতো অবস্থা। নিজেকে নিজেই শাসন করি, "চৈতি তুই এসব কি করছিস! জাস্ট রিলাক্স!"

তারপর বেশ কয়েকদিন ভার্সিটির বাসে আসা যাওয়া করিনি! যেদিন ভার্সিটির বাসে আসতাম, বিশ্বাস করুন-ও যেন বাসে আমাকে চিনতে না পারে সেজন্য মুখ ঢেকেও এসেছি কয়েকদিন।



কিন্তু এভাবে পালিয়ে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি। তন্ময়ের সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয় লাইব্রেরির সামনে। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ'ই রাহাত বলে উঠে, "আরে তন্ময় ভাইয়া যে... কেমন আছেন!" তাকিয়ে দেখি বাসের ঐ ছেলেটা। সেদিনই প্রথম তন্ময় সম্পর্কে জানতে পারি অল্প। এমনকি নামটাও সেদিনই জানি। রাহাত আমাদের সবার সঙ্গে তন্ময়ের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সেদিন কোনোভাবে নিজের নাম বলতে পেরেছিলাম শুধু। তন্ময় কথা বলার ছলে বারবার আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আর আমি লজ্জা ও ভয়ে ঘামছিলাম।

তারপর প্রায়ই দেখা হতো আমাদের সঙ্গে। এরমধ্যে কয়েকবার তন্ময় আমার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু ভয়ে আমি পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম। আমার বন্ধু রাহাত মনে হয় বুঝতে পেরেছিল। রাহাত আমাকে ক্লাস শেষে ডেকে বলে, "বান্ধবি আর যাই কর... তন্ময় ভাইয়ার সঙ্গে রিলেশনে জড়াসনা প্লিজ।" আমি হতবাক। যেখানে কথা বলারই সাহস করতে পারছি না, সেখানে সম্পর্কের কথা আসে কিভাবে! কিছুটা বিরক্ত হই রাহাতের উপর।



কিন্তু এদিকে তন্ময়ের ভালোবাসার প্রস্তাব, অনুরোধ, আবেগ আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছিল দিন দিন। কিন্তু রাহাত কেন তন্ময়ের সঙ্গে রিলেশনে জড়াতে নিষেধ করলো, সেই খটকা মনের মধ্যে থেকে গেল। তারপরও তন্ময় কল দিলে কথা না বলে থাকতে পারছিলাম না। যদিও আমাকে কল দিতে অনেকবার নিষেধ করেছি ওকে। কিন্তু নিষেধ শুনে কে? বরং বেশি বেশি কল দেয়া, রাস্তায় আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা রোজ চলতে থাকে। তন্ময় আমাকে এমনভাবে ওরদিকে টানতে থাকে যে আমি কি করবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। রাহাতকে তাই নিজেই একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করি, "তুই তন্ময় ভাইয়ার সঙ্গে রিলেশনে জড়াতে নিষেধ করেছিস কেন?"

রাহাত যা বললো, তাতে আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমার মাথা ঘুরে উঠে। চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু অশ্রু জমা হয়। প্রথম ভালোলাগা এমন হবে, কে জানতো! তারপর থেকে তন্ময়কে আমি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি। কিন্তু তন্ময় আমার পিছু ছাড়ছিল না। বাধ্য হয়ে একদিন সত্যিটা বলে দেই, কেন ওঁর সঙ্গে রিলেশনে জড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ আর যাই হোক, একটা বাজে স্বভাবের ছেলের সঙ্গে নিশ্চয় কোনো মেয়ে রিলেশনে জড়াবে না! তন্ময় আমার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ে।

"হোয়াট! তোমার কি তাই মনে হয় আমি বাজে স্বভাবের ছেলে! কি বললে বিশ্বাস করবে, আমি ওরকম ছেলে নই। কি করলে বিশ্বাস করবে যে সত্যিই আমি তোমাকে ভালোবাসি!" ঐদিন তন্ময়ের চোখে কি দেখেছি আমি জানি না, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। রাজি হয়ে যাই।



কিছু ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, যার পরিণতি হয় খুবই ভয়ঙ্কর। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তন্ময়ের প্রেমে এতোটাই অন্ধ ছিলাম যে, ওর জন্য বন্ধু-বান্ধবি সবাইকে ছাড়ি। রাহাতের সঙ্গে পুরোপুরি কথা বলা বন্ধ করে দেই। তাছাড়া তন্ময়ও চাইতো না, আমার কোনো ছেলে ফ্রেন্ড থাকুক। ভালোই চলছিল আমাদের সময়টা। তবে তন্ময়ের একটা বিষয় আমার একদমই ভালো লাগতো না। কথায় কথায় সে গায়ে হাত দেবার চেষ্টা করতো। আমি নিষেধ করলে, সুন্দর করে স্যরি বলে হেসে দিতো। ওর হাসি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম আমি। বিভোর হয়ে থাকতাম ওর মধ্যে। তন্ময়ের কথায় এমনকিছু থাকতো, যা আমাকে সবকিছু ভুলিয়ে দিতো।

আমি যখন পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাই ওর প্রেমে, তখন চরম একটা সত্য আমার সামনে আসে।

হঠাৎ একদিন রিয়া নামের একটি মেয়ের সঙ্গে আমার দেখা। মেয়েটার সঙ্গে তন্ময়ের প্রায় দুই বছরের সম্পর্ক ছিল, সম্পর্ক অনেক গভীর পর্যায়েও চলে গেছে। হঠাৎ'ই তন্ময় বেঁকে বসে, "তোর সঙ্গে আমার কিছুই ছিলো না। যদি কিছু হয়েও থাকে, তাহলে ভুলে যা।"  তারপর রিয়া আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। মানসম্মানের ভয়ে কাউকে বলতেও পারেনি সে।

কিন্তু তন্ময় এমনকিছু করতে পারে বলে আমার মনে হয়নি। আবার মেয়েটার চোখে আমি যে কষ্ট দেখলাম, সেটাই বা মিথ্যে বলি কি করে? কারণ, চোখ কখনো মিথ্যা বলে না! আচ্ছা ধরলাম, মেয়েটি সত্য কথা বলছে। কিন্তু তন্ময়ের কি একা দোষ এখানে! তন্ময় যদি অপরাধী হয়েই থাকে, মেয়েটাও তাহলে সমান অপরাধী। রাগ হয় মেয়েটার উপর। কিন্তু মনের মধ্যে একটা সংশয়ের ছায়া থেকে যায়। রাহাতও আমাকে এরকম কিছুই ইঙ্গিত করেছিল। তাই একদিন তন্ময়ের কাছে রিয়া নামের কাউকে চেনে কিনা জানতে চাই। সে চেনে না বলে কথা ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে। বুঝতে পারি, এই বিষয়ে সে কথা বলতে চাচ্ছে না। আমিও আর জানতে চাইনি। কেননা, অতীত সবসময় ঘাঁটতে নেই। তাতে কেবল দুঃখ বাড়ে। বর্তমানকে মেনে নিয়েই আগামির জন্য চলা উচিৎ। যদি তন্ময় এমন কিছু করেও থাকে, করুক। ক্ষমা করে দেই ওকে।



ভালোবাসা, খুনসুটি, ঝগড়ার মধ্যে দিয়ে আমাদের সম্পর্ক চলতে থাকে। তন্ময় কেন জানি হঠাৎ'ই খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। নেশাও করে সম্ভবত মাঝেমধ্যে। আমার পাশে বসে অন্য মেয়েদের সঙ্গে চ্যাটও করেছে কয়েকদিন। খারাপ লাগতো। আমার মধ্যে কিসে কমতি আছে যে, সে অন্য মেয়েদের সঙ্গে চ্যাট করবে! দেখতেও খারাপ নই। সুন্দরিই বলা চলে। প্রচণ্ড রাগ হতো তন্ময়ের উপর। আমি রাগ করলে নানারকম বিষয় নিয়ে আসতো, রাগ ভাঙাতো। আমি চুপচাপ শুনে যেতাম। ভাবলাম, হয়তো একদিন সে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যার রক্ত পুরোটা একবার দূষিত হয়ে যায়, সেই রক্ত সহজে শুদ্ধ করা সম্ভব হয় না, সেটা ভুলে গিয়েছিলাম। তবুও রাগ করে বেশিদিন থাকতে পারিনি। ইতোমধ্যে ওর পড়াশোনা শেষ হলে একটি কোম্পানিতে যোগ দেয়। আমার পীড়াপীড়িতে বাসায় বিয়ের প্রস্তাবও পাঠায়। কিন্তু আমার বাবা ওর সঙ্গে বিয়ে দিবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। অবশ্য এটার জন্য দায়ী ছিল রাহাত। রাহাতকে কল দিয়ে সেদিন প্রচুর অপমান করেছিলাম। এমনকি তন্ময় কিছু লোককে দিয়ে রাহাতকে মেরেও ছিল। বিশ্বাস করুন, আমার একটুও খারাপ লাগেনি বন্ধুর জন্য। বরং খুশি হয়েছিলাম। বাসায় কিছুদিন প্রচুর কান্না করি তন্ময়ের সঙ্গে বাবা বিয়ে দিতে রাজি হোননি বলে। বাবা-মাকে আমার শত্রু মনে হয়েছিল তখন। কেননা তাঁরা আমার ভালোবাসার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। একদিন তাই বাসা থেকে পালিয়ে যাই আমি।



আচ্ছা, একটা মেয়ে বাসর রাত নিয়ে কি স্বপ্ন দেখে বলুন তো! তার ভালোবাসার মানুষটার কাছে নিশ্চয়ই খুব মধুর একটা রাত আশা করে। অথচ আমার বিয়ের রাতের কথা মনে হলে এখনো আঁতকে উঠি। তন্ময় সেদিন আমার সঙ্গে যা আচরণ করেছিল, আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না এমনটার জন্য। সেদিন আমার উপর হিংস্র জানোয়ারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ও। বারবার একটা কথাই বলছিল, "বিয়ের আগে তোকে অনেক সহ্য করেছি। কিছু চেয়েও পাইনি। বলতিস বিয়ের পর সব হবে। এবার দেখ... তোর কি অবস্থা করি আমি!" ওর প্রতিটি স্পর্শ যেন ছিল বিষাক্ত ছোবল। আমার কষ্ট একটুও বুঝার চেষ্টা করলো না তন্ময়। এমনকি আমি সেন্সলেস হয়ে যাই। আমার উপর কিরকম শারীরিক অত্যাচার চলে, সেদিন সেটা পুরোপুরি অনুধাবন করতে না পারলেও দুইদিন পর নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করি। আমার যখন সেন্স ফেরে, আমার সমস্ত শরীর অবশ ছিল, হাত-পা কিছুই নাড়াতে পারছিলাম না। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যান্ডেজ লাগানো ছিল। তাকিয়ে দেখি আমার বাবা-মা আর ফ্রেন্ডরা দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় আমি সেদিকে তাকাতে পারছিলাম না। অন্যদিকে তাকিয়ে শুধু চোখের পানি ফেলছিলাম। রাহাতই আমাকে হাসপাতাল এনে ভর্তি করিয়ে সবাইকে খবর দিয়েছিল। কিন্তু রাহাতকে দেখতে পাইনি আমি। সেন্স ফেরার কিছুক্ষণ পূর্বে ও চলে যায়। কেননা সেদিন জার্মান যাবার ফ্লাইট ছিল রাহাতের। আমি কিছুই জানতাম না এসবের! বন্ধুদের কাছ থেকে এ-ও জানতে পারি, আমার উপর পৈশাচিক নির্যাতনের পর যখন সেন্সলেস হয়ে পড়ে থাকি এবং কোনোভাবেই আমার সেন্স ফিরছিল না, তখন তন্ময় নাকি রাহাতকে কল দিয়ে পালিয়ে যায়। তবে পুলিশ ওকে ধরে ফেলে। এখন সে কারাগারে। পুলিশের ধারনা ও মানসিক ভাবে অসুস্থ!



আমি পুরোপুরি সুস্থ না হলেও সপ্তাহখানেক পর থানায় চুপিচুপি ওকে দেখতে যাই। ওকে দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। তন্ময় কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায়। বলে, "আমি একটা ঘোরের মধ্যে থেকে এমনটা করে ফেলেছি তোমার সঙ্গে। আর এমন ভুল হবে না। ভালোবাসি লক্ষ্মীটি।" আমার আবার কি হলো আমি জানি না, পুলিশ, পরিবার সবার কথা উপেক্ষা করে ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে যাই। নতুন বাসায় গিয়ে সবকিছু গুছাই। তন্ময় ঐখানে তার এক স্কুল বন্ধুর কল্যাণে একটা জবও জুটিয়ে নেয়। ততোদিনে আমি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠি। ও কয়েকদিন ঠিকঠাক আচরণ করলেও দিন পাঁচেক পর আবার অন্যরকম আচরণ শুরু করে আমার সঙ্গে। কারণে অকারণে মারধোরও করতো। সব সহ্য করে নিতাম আমি। কারণ আমার একমাত্র দুর্বল জায়গায়ই হলো ওর প্রতি আমার প্রচন্ড রকম ভালোবাসা! ওকে আমি এতোটাই ভালোবাসি যে, মেয়েদের সঙ্গে আমার সামনে ফোনালাপ করলেও আমি কিছু বলতাম না ওকে। ভাবতাম, "কথাই তো বলছে শুধু, বলুক।ও আমার থাকলেই হয়।"



প্রায়ই নেশা করে বাড়ি ফিরে ও। কিছু বললে খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করতো। সেটাও সহ্য করে নিই। বাসায় তো ফিরে! তবে একসময় বাসায় আসাও অনিয়মিত হয়ে যায় ওর। ভাবলাম, সন্তান আসলে হয়তো পরিবর্তন আসবে। অনেকেই তো পরিবর্তন হয়। ওকে যেদিন জানাই আমি কনসিভ করতে চাই, সেদিন ও আমার সঙ্গে যা করেছিল, ভাবতেই শিহরে উঠি।

"কি বললি তুই! খবরদার মাগি... কোনো বাচ্চাকাচ্চা নিবি না। নইলে তোকে আর তোর ঐ পেটের বাচ্চাকে খুন করে ফেলবো আমি!" সেদিন সত্যিই আমি খুব অসহায় ছিলাম। কারণ, অলরেডি আমি প্রেগন্যান্ট। ভয়ে আর বলতে পারিনি ওকে আসল কথা। সারাক্ষণ ভয়ে থাকতাম, যদি ও কোনোভাবে টের পেয়ে যায়। কিন্তু যাঁর সঙ্গে এক বিছানায় থাকি, তাঁর অবশ্যই বুঝে যাবার কথা। তন্ময়ও বুঝে গিয়েছিল। যদিও সে কিছু বলেনি ঐদিন। ভাবলাম, হয়তো একটু পরিবর্তন এসেছে। পরের দিন সন্ধ্যায় সে আমাকে হাসপাতাল নিয়ে যায়। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে বলে, "বাচ্চা ঠিক আছে কিনা জানার জন্য এসেছে।" ওর কেয়ারিং দেখে আমার চোখে পানি এসে যায়। কিন্তু ঐদিন রাতে আমি যন্ত্রণায় যে ছটফট করি, সেটা সে পাশে থেকে দেখেও কিছু করেনি। এমনকি হাতটাও ধরেনি! হ্যাঁ জোরপূর্বক আমার অ্যাবোর্শন করানো হয়। সেদিন যন্ত্রণায় যতোটা না কেঁদেছিলাম, ওর অবহেলা, গর্ভস্থ সন্তানকে পৃথিবীর আলো বাতাস দেখার পূর্বেই অংকুরে মেরে ফেলার দৃশ্য দেখেও কিছু করতে না পারার তীব্র যন্ত্রণা আর অপরাধ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল।



দিন কয়েক পর আমি কিছুটা স্বাভাবিক হই। এই কয়েকদিন তন্ময়ের কাছ থেকে আমি কোনো মানসিক সাপোর্ট পাইনি। বাবা-মার কথা খুব মনে পড়ছিল। তন্ময় আমাকে শর্ত দিয়েছিল, যদি আমি আমার পরিবারের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি, তাহলে ও আমাকে তালাক দিয়ে দেবে। তাই আর যোগাযোগ করিনি। অবশ্য মা আর বাবা একদিন বাসার ঠিকানা যোগার করে এসেছিলেন। যতোটা সম্ভব তাঁদের সামনে অভিনয় করেছি,  চেষ্টা করেছি তাঁদের বুঝানোর জন্য যে, আমি খুব ভালো আছি। কিন্তু ওনাদের বুঝতে বাকি রইলো না যে, তাঁদের মেয়ে ভালো নেই। তার কিছুদিন পর তন্ময় আবারও বাসা পরিবর্তন করে নির্জন একটি জায়গায় বাসা নেয়। একটা চাকরিও জুটিয়ে নেয়। কি চাকরি তা-ও জানি না। কিছুই বলে না সে। সকালে যায়, অনেকরাত পর বাসায় ফেরে। যাবার আগে দরজায় তালা দিয়ে যায়। ওর ভাষ্যমতে, ও বাসায় থাকে না সারাদিন। এলাকার ছেলেগুলো ভালো নয়। বাইরে থেকে যেন কেউ জানতে না পারে, বাসায় একটা মেয়ে একা আছে… তার জন্য এই ব্যবস্থা! বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে আমি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন বলতে পারেন। তবুও সব হাসিমুখে মেনে নিই। কিন্তু হঠাৎ একদিন একটা মেয়ে নিয়ে বাসায় হাজির হয় সে। আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। মেয়েটা নাকি ওর গার্লফ্রেন্ড! নাম জেরিন। তিনবছর যাবৎ সম্পর্ক ওদের! মেয়েটা ঐদিন রাতে বাসাতেই ছিল আমার স্বামীর সঙ্গে এক খাটে। আর আমি দরজার ঐ পাশে সারারাত অশ্রু বিসর্জন দিয়েছি। নিজের স্বামীর ভালোবাসার ভাগ অন্য কাউকে দেয়া যে কতোটা কষ্ট, তা কেবল একজন নারীই বোঝে।

সকালে একা মেয়েটার সঙ্গে একটু কথা বলার সুযোগ পাই, "তন্ময় বিবাহিত। আমি ওর স্ত্রী। তা জানা সত্ত্বেও কেন তুমি আমাদের মাঝখানে এসেছো। আমার স্বামীর জীবন থেকে সরে যাও প্লিজ... তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো বোন।"

মেয়েটা আমাকে কিছুই বলেনি। তবে ঐদিন সন্ধ্যায় তন্ময় আমাকে খুব মারধোর করে, বুঝলাম কেন করেছে এমনটা। তবে জেরিন নামের মেয়েটি আর কখনো বাসায় আসেনি। ভাবলাম, হয়তো মেয়েটি আমার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেনি। চলে গেছে তন্ময়ের জীবন থেকে।



কিছুদিন পর আমি আবার প্রেগন্যান্ট হই। তবে এবার সিদ্ধান্ত নিই, আর যাই হোক, গর্ভপাত ঘটাতে দেবো না আমি। হয়তো আমার সন্তানই হবে আমার বেঁচে থাকার সম্বল। কিন্তু না, এবারও ডাক্তারকে টাকা খাইয়ে জোর করে আমার সন্তান নষ্ট করে। আমি অনেকবেশিই ভেঙে পড়ি। পালিয়েও কোথাও যেতে পারছিলাম না। অদৃশ্য একটা শিকল যেন আমার সমস্ত শরীর বেঁধে রেখেছিল। চাপা একটা ক্ষোভও ততোদিনে মনের মধ্যে জন্মায়।

আমি স্বাভাবিক হতে না হতেই তন্ময় একদিন জানায়, জেরিন নামের মেয়েটাকে বিয়ে করবে সে। আমি চাইলে চলেও যেতে পারি। আবার থাকতেও পারি, তবে বেশিদিন নয়। আমার পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যায়। যাঁর জন্য এতো কষ্ট করলাম, যে মানুষটার ভালোবাসার জন্য এতো অপমান সইলাম, সে অন্য কারো হলে আমার কি হবে তাহলে! আমি তো তার জন্যই বেঁচে আছি! সব অন্যায় চোখ বুঁজে সহ্য করেছি। আমার পেটের সন্তানকে খুন করেছি। সে চাইলেই নিশ্চয়ই যা খুশি করতে পারে না!



নিজেকে শক্ত করি। বুঝতে পারি, আমার ভালোবাসার ভাগ অন্য কাউকে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। হ্যাঁ এটা সত্য, এতোদিন সে বিভিন্ন মেয়েদের সঙ্গে মিশেছে, রুমেও নিয়ে এসেছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেতো আমারই ছিল, আমার কাছেই ফিরে আসতো। বুকে মাথা রেখে ঘুমাতো। হোক সেটা যন্ত্রণার। কিন্তু এখন সে যদি বিয়ে করে, আমি কি নিয়ে বাঁচবো! মানুষটাকে আমি ভালোবাসি। তাকে এতো বড় অন্যায় আমি করতে দিতে পারি না। তাছাড়া আমার ভেতরকার যন্ত্রণার অবসানও হওয়া চাই। প্রতিদিন যে যন্ত্রণা পেয়েছি আমি, সেটার থেকে মুক্তি দরকার। তন্ময়ের পাশে অন্য কোনো মেয়েকেও সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আজ সেদিন এসেছে। এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা কোনোভাবেই ঠিক হবেনা। আমি আগেই সব গুছিয়ে নিয়েছি কিভাবে কি করবো।



গভীর রাতে তন্ময় বাসায় ফিরে চৈতিকে দেখে অবাক হয়। কেননা চৈতি বউ সেজে বসে আছে। বিরক্ত অভিব্যক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করে, "মাঝরাতে এসব কি ন্যাকামি হচ্ছে শুনি?"

-"রাগ করলে বুঝি। বউ সাজতে ইচ্ছে করছিল খুব, তাই সাজলাম। দুদিন পর তো চলেই যাবো। একটু পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে বরের সাজে সাজো না... আর তো তোমাকে দেখতে পাবো না কখনো!"



চৈতি এমনভাবে অনুরোধ করে যে তন্ময়কে পায়জামা পাঞ্জাবি পড়তেই হলো। মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে চৈতি। তারপর ধীরে ধীরে তন্ময়ের দিকে এগিয়ে যায়।

"আজ আমাকে সেই ভালোবাসা দিতে পারবে? যা আগে কখনো দাওনি! সেই আদরটুকু তোমার কাছে শেষবারের মতো চাইছি, যা কখনো অনেকবার বলেও পাইনি। আজ দেবে তো?" চৈতির কথায় মিনতি ঝরে পড়ে। কিন্তু কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে সে। তন্ময়ের চোখের দিকে আর তাকায় না। নিচের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলে। তন্ময়ের কি হলো জানে না, জড়িয়ে ধরে সে চৈতিকে।



দূরে আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বিছানায় তন্ময়ের নিথর দেহখানা পড়ে আছে। চৈতি মুগ্ধ হয়ে তন্ময়ের মুখখানার দিকে তাকিয়ে আছে। কি নিষ্পাপ সে মুখখানা! এরকমটাই তো চাইছিল চৈতি। অনেকক্ষণ চলে যায় এভাবে। এক পর্যায়ে চৈতি তন্ময়ের চোখে, মুখে, কপালে শেষবাবের মতো চুমো খায়। তন্ময়ের চোখের কোণে পানি জমে ছিল, সেটা সে মুছে দেয়। তন্ময়ের মুখটা নীল হয়ে আছে, সম্ভবত যন্ত্রণার কারণে এমন হয়েছে।

চৈতি তন্ময়কে ধরে কিছুক্ষণ কাঁদে। তারপর চোখের পানি মুছে থানার দিকে এগুতে থাকে।

তারও একদিন পর পত্রপত্রিকায় বড় করে নিউজ আসে, "স্ত্রীর হাতে স্বামী খুন!"


No comments

Powered by Blogger.