নাসরিন সিমির পদাবলি

নাসরিন সিমির পদাবলি



আগুয়ান- নাসরিন সিমির পদাবলি
আগুয়ান- নাসরিন সিমির পদাবলি



জলঘুঙুরের শব্দ



তরঙ্গহীন নদীর বিস্তৃতি কতদূর গেলে
এক একটি জোয়ারের শব্দ শোনা যাবে
নদীর তীরে জ্যোৎস্নারাতে শোনা যায়
জলঘুঙুরের শব্দ
কে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে
আমি কী কাঁদি না আমার আত্মার আর্তনাদ
গত বছরে ভেসে এসেছিলো আব্রুহীন লাশ
তখনও তার জঙ্ঘা উরুতে দাঁতাল কামড়
জরায়ু ছেঁড়া রক্তের দাগ মানচিত্র এঁকেছিল
নদীতে ভাটির টান
সমুদ্রে জোয়ার এলে শুকিয়ে যায় প্রেমিকার চোখ
তখন তাকে আর কিছুই স্পর্শ করেনা
জ্যোতিষীর বিশ্বাস ভেঙে দিয়ে কেউ আসেনা
বালিকার কানে এখনো জলঘুঙুরের শব্দ
এখনো সে অপেক্ষা করে!


এলোমেলো কিন্তু সে ক্ষুদ্র নয়



প্রেসার কুকারের সিটিটা এক নাগাড়ে বেজেই চলছে
কোন থামাথামি নেই যেন ভেতরে
তার অনবরত গরম পানির ঢেউ খেলছে তো খেলছেই
আজকাল আমার বুকের মধ্যেও সিটি বাজে
ঘুমে অথবা আধোঘুমে কতো দুঃস্বপ্ন দেখি
কতোটা কি রূপক কতোটা একদম মুখোমুখি
এমনি হাজার দুঃস্বপ্নের ভেতরে আমরা খুঁজি
ফেরিওয়ালার মতো জীবন খুঁজে ফিরি এপাড়া ওপাড়া
নর্দমা থেকে নদী, বস্তি থেকে বহুতল ভবন
ইতিউতি আনাচেকানাচে ছুতো নাতায় কেবল আজকাল আমরা সবাই বেঁচে থাকার ইচ্ছে খুঁজি।
এতোটুকু প্রাণ তবু কী অদম্য শক্তি ও সাহস তাঁর
হেরে যেতে যেতে তার কাছেই হই নতজানু মনে মনে
তারপর একসময় বুঝি বেঁচে থাকার নামই জীবন
জীবনের গতি এলোমেলো কিন্তু সে ক্ষুদ্র নয়।


জলস্ফীতির যন্ত্রণায় শামুক


তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত হৃদয়ে ধরে দেখি
উনুনে চায়ের জলে চুল ভাসছে
চিনামাটির কাঁপে বাসা বেঁধেছে আরশোলা
তবুও আমার এক কাপ চা চাই নেশা কাটাতে
ভেতরে দারুন খরা, দারুন জলোচ্ছ্বাস
অন্ধকারে পাহারা দেয় স্মৃতিভ্রষ্ট প্রেমিক
পৃথিবীর দ্বিতীয় পৌরুষে আমি জড়পাথর
জানেনা সমুদ্র কতটা কাঁদে ও কাঁদায়,,
জলস্ফীতির যন্ত্রণায় ছটফট করে শামুক
খোলস বদলের সময়ে যেতে যেতে মনে পড়ে
হাঁসের ছানারা অপেক্ষায় আছে
চোখ ভিজে আসে গর্ভপাতের কষ্টে
শিশুটা বেঁচে থাকলে জানান দিতো জীবনের
শিশুটা বেঁচে থাকলে হাঁসের ছানাগুলো
নরম সোনালি ডানায় উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে
সমুদ্র সাঁতার কেটে পাড়ি দিতো পৃথিবী।


ওরা সুখে আছে


ক্রমশ বেলপাতা রাশি শুকিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
পড়ে গেছে মন্দিরের উঠোনে
কয়েকটি ইঁদুর এদিক ওদিক তেলাপোকা আর
পিঁপড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে
নৈবেদ্যের শেষ ছিটেফোঁটা ভোগ টুকুর জন্য
একটা নেংটি পরা কালাঝুলি মাখা আড়াই ফুট
দৈর্ঘ্যের শিশু তাকায় ওদের দিকে
মানুষের গর্ভে জন্ম না নিয়ে যদি একটা ইঁদুর
কিংবা কুকুর হলেও দুই একটা নাড়ু মোয়া
হয়তো খেতে পারতাম
কারণ আমার ক্ষিদে আছে, ওরা বলছে ধর্ম আছে
কিন্তু ইঁদুর তেলাপোকার ক্ষিদে থাকলেও ধর্ম নেই।
আমার চেয়ে ওরা অনেক সুখে আছে।




ধনু হাতে খুঁজে প্রেমিক অষ্টমীর কুমারী


প্রেমিকেরা সব ধনু হাতে চলে গেছে
সমরক্ষেত্রে শর নিক্ষেপণের আসরে
তাদের এক একটি শর বিদ্ধ হতে খুঁজে
নগরীর অষ্টমীর অপাপবিদ্ধ কুমারীদের ,
অবাক দৃষ্টিতে দেখি প্রতিমার চোখে জল
বিসর্জনের দিন বুক পাঁজরে হু হু কান্না পায়
মনে হয় যেন আমাকেই বিসর্জন দেয়া হলো।
ঈশ্বর শুধু বিসর্জনের প্রতিমা করেই গড়েছেন
তাঁর সাথে কী ছিল পূর্ব জনমের বাদানুবাদ ?
বিসর্জন হতে চায়না চেয়েছিলো একটা মন
একমুঠো সুখ আর কপালে একমুঠো সিঁদুর।
সিঁথিতে নয়, সে বুকের ভেতর লেপ্টে দিয়ে
আজন্ম কালের জন্য দখল নিয়ে তলপেটে
বুনে দিতো দেবশিশুর বীজ, ছোট্ট ছোট্ট হাসি
দেবপণ ছাড়া আজ সে বুকে লুকানো দলিল ।

No comments

Powered by Blogger.