বাপ্পা আজিজুলের অণুগল্প: ফরিয়াদ

ফরিয়াদ

বাপ্পা আজিজুল





 
Agooan - Webmag - আগুয়ান
বাপ্পা আজিজুলের গল্প- আগুয়ান




আমার শোবার ঘর আরও নির্দিষ্ট করে বললে আমার বিছানা ছারপোকার আস্তানা। অগণিত ছারপোকা আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে বংশ পরম্পরায় বাস করছে সেখানে। ডিম পাড়ছে, তা দিচ্ছে, ডিম ফুটছে, বেরিয়ে আসছে কুনি কুনি ছারপোকা। সেগুলো শৈশব-কৈশোরে হেসে খেলে বড় হচ্ছে, যৌবনে পদার্পণ করছে, বিয়েথা করছে, পোয়াতি হচ্ছে বা অন্যকে করছে, ডিম পাড়ছে... এভাবে অনন্ত জীবনচক্র চলছে তো চলছেই। রাতে আঁধার নামলে আনাগোনা বাড়তে থাকে। আমি শুইতে গেলে আমার উদাম দেহে চলে তাদের উদ্দাম নৃত্য, ছলা-কলা, রক্তপানের মহোৎসব। রাত অবধি ষোলকলা পূর্ণ করে সকালে থেমে যায় লীলাখেলা। আমার আবার সহ্যক্ষমতা একটু বেশিই। তাই সারারাত কুটকুট কামড়ে ঘুম অটুট না হলেও খুব একটা উপদ্রব মনে করি না। 

অফিসে যাওয়ার পর দু’চারটি ছারপোকাকে শার্টের ওপর দিয়ে পার্ট নিয়ে ঘুরে বেড়াতেও দেখা যায়। সহকর্মীদের সাথে ছারপোকা নিয়ে মাঝেমধ্যে গপসপও জমে। একবার এক মহিলা সহকর্মী বলল সে নাকি ছারপোকা কোনদিন দেখেনি। অগত্যা বাক্সবন্দি করে তাকে কয়েকটি উপহার দিয়েছিলাম। যদিও সে দেখে আর নিতে রাজি হয়নি। ভালোই চলছিল পোষক-পরজীবী সম্পর্ক। এর মধ্যে দেশজুড়ে হামলে পড়ল ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ। এডিস মশা থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে কীটপতঙ্গের অনিষ্ট থেকে রক্ষার দোয়া পড়ে ঘুমাতে লাগলাম। ছোট্ট দোয়া তিনবার পড়ে গায়ে ফুঁ। ফুঁ এর মেয়াদ ২৪ ঘন্টা। প্রতিদিন রাতে টা ট্যাবলেট খাওয়ার মত টা ফুঁ। 

মিরাকল টের পাওয়া গেলে কয়েকদিন বাদে। রাতে আর ছারপোকা কামড়াচ্ছে না। হাউ ফানি! ছারপোকা শরীরের আঁকেবাঁকে ফুরফুর করে ঘুরঘুর করছে কিন্তু কামড়াচ্ছে না। এমনকি এদের মেরে পিষে ফেললে আর রক্তও বের হচ্ছে না। তাহলে রক্ত খাচ্ছে না উপপাদ্যটি প্রমাণিত হল। কিন্তু প্রশ্ন হল রক্ত না খেলে ছারপোকা বেঁচে থাকছে কিভাবে? এজ উই অল নো বাগ লিভস অন ব্লাড। এভাবে চলল কয়েকমাস। কেটে গেল মহামারি ডেঙ্গু। তবু দোয়া পড়ে যাচ্ছি। এদিকে ছারপোকা সমাজে চলছে দুর্ভিক্ষ। রক্তের অভাবে তারা বিছানার সুতা, তুলা প্রভৃতি খেয়ে দিনাতিপাত করছে। অর্ধাহারে অনাহারে শিশুগুলো ইয়েমেন, সোমালিয়ার শিশুদের মত হাড্ডিসার হয়ে গেছে। অপুষ্টিতে প্রজনন কমে গেছে। প্রতিদিন শতশত ছারপোকা মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে মিডিয়াগুলো পুরো বিষয় ধামাচাপা দিয়ে যাচ্ছে। ছারপোকাদের হাতে স্মার্টফোন নাই তাই ফেসবুকের মাধ্যমেও কাউকে জানানো যাচ্ছে না। জাতিসংঘ, ইউনিসেফ,  এফএও কে জানালে কি কিছু হবে?  অবশ্য নিয়ে ছারপোকারা বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে অনেকে মাইগ্রেট করে অন্য ঘরে যাওয়ার চিন্তা করেছে। অনেকে নাকি চলেও গেছে। ছারপোকাদের বয়োবৃদ্ধরা দফায় দফায় বসে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে ভাবছে। অনেকে ঐক্যের ডাক দিচ্ছে  

ইতোমধ্যে হেফাজতে ছারপোকা নামে একটি নব্য দলেরও উদ্ভব হয়েছে শোনা যাচ্ছে। তারা আগামি ৫ই নভেম্বর আখেরে ভুখা মাহফিল এর ডাক দিয়েছে। তাদের প্রধান ছারপোকা  জানিয়েছে, "আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা ছারপোকা ভাইবোনেরা, বর্তমান দুর্ভিক্ষপীড়িত সময়ের কথা কারও অজানা নয়। তবে একষ্ট অবশ্যই শীঘ্রই কেটে যাবে। আল্লাহ পাক কোরানে বলেছেন- নিশ্চয় কষ্টের পরে স্বস্তি রয়েছে আমরা সবাই মজলুম।  মজলুমের দোয়া কবুল হয়। রক্ত খাওয়া আমাদের অধিকার। রিযিকের মালিক রাজ্জাক। তিনি এই শিশু-নারী-বৃদ্ধদের মুখের দিকে চেয়ে আমাদের ফরিয়াদ ফিরিয়ে দেবেন না। নিশ্চয় আবার আমরা পেটপুরে রক্ত খেতে পারব। আবার শক্তিশালী হব। স্বজাতির সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখব। আগামি তারিখ দলে দলে সবান্ধবে আখেরে ভুখা মাহফিলে যোগদান করুন। ঐক্যবদ্ধ থাকুন। মজলুমের পাশে থাকুন"

No comments

Powered by Blogger.