জলচোরা তিথি: আল-আমীন আপেলের গল্প

জলচোরা তিথি 

 আল-আমীন আপেল






জলচোরা তিথি: আল-আমীন আপেলের গল্প -  আগুয়ান - Agooan
জলচোরা তিথি: আল-আমীন আপেলের গল্প - আগুয়ান







এক.
রফিক জোয়ার্দারের থিওরি হচ্ছে: ছেলেমেয়েকে পূর্ণ যত্ন-আদর দিয়ে, ভূতের গল্প না বলে, অন্ধকারকে ভয়ের বিষয় না বুঝিয়ে; মুক্তিযুদ্ধের গল্প, রাজারাণীর গল্প শুনিয়ে বড় করা উচিৎ; এতে অন্তত ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে ভীতু হয় না, দেশদ্রোহী হয় না, ভূতে বিশ্বাস করে না
জন্মের পর থেকে লোপাকে নিজ সন্তানের মত করে বড় করেছেন রেজার বাবা, রফিক জোয়ার্দার
যিনি সম্পর্কে লোপার খালু জন্মের সময় লোপার মা মারা গেল মা মরা ছোট্ট মেয়ে কিভাবে মানুষ হবে পাটোয়ারী বাড়িতে! একে তো অজপাড়া গাঁ, তার ওপর বিদ্যুৎ বাতির ব্যবস্থা নেই কৈয়াপাড়ায়
ছেলেপুলেরা অন্ধকার বুকে নিয়ে বড় হলে, আসলে বড় হয় না

আর লাবু পাটোয়ারী তো সব সময় ব্যবসায় আর ব্যবসায় নিয়ে মহাব্যস্ত! কৈয়াপাড়া থেকে দমদমা, দমদমা থেকে কৈয়াপাড়া; কৈয়াপাড়া থেকেডব্লিউআকৃতির আধাপাকা সড়ক ধরে রঘুবাজারে, পানসুপারির দোকানে বউ, বাচ্চার খেয়াল রাখে না মোটেও আর যতসব কুসংস্কারের ছড়াছড়ি ওইখানে!

অনেক ভেবে লোপাকে নিয়ে আসা হলো রেজাদের বাসায়, মীরগঞ্জে রেজার জন্ম, লোপার জন্মের
সাত দিন আগে বোনের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতিটুকুকে সব কিছু দিয়ে আগলে রাখতে শুরু করলেন মিসেস জোয়ার্দার একটা স্তনে যদি রেজা মুখ দেয়, অন্যটায় লোপা লোপা আর রেজা দুজনে বড় হলো, স্কুল যেতে শুরু করল; নগর মীরগঞ্জ স্কুলে এভাবে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো মাসেরা যেতে পারত; কিন্তু, গেল না সূর্যজ্বলা সকালে যেন রাত্রির আঁধার নেমে এল

লোপার বয়স যখন বারোতে পড়ল, তখন লোপাকে তার বাবা লাবু পাটোয়ারী নিয়ে আসলেন তার
বাসায় কতখানি কষ্ট পেল রেজার বাবা, মা! তা শুধু জানল তারাই রেজা তো রীতিমতন
কান্নাকাটি শুরু করেছিল

এত বড় ছেলে-মেয়ে দুজনে, তবুও বিকেল গড়ালেই সমরদীঘির পাড়ে, লালবিবির মাজারের পাশের উঁচু টিলার উপরে গিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো; বর্ষীয়ান বটের ছায়ায় কাচ্চা-বাচ্চার দল নিয়ে ছোটাছুটি, জোছনাবিলাস শেষে ঘুমোতে যাওয়া: ওদের নিত্যকর্মের একটা খসড়া আরো কত স্মৃতি !
লোপার মা মারা যাবার পর, আরেকটা বিয়ে করেন লাবু পাটোয়ারী বাবার প্রতি কেমন জানি ঘেন্না আসে, এই বিষয়টার জন্য হায় রে পুরুষ! স্ত্রীবিহীন দুটো মাসও কাটাতে পারেনি সৎ মার সহ্যের মধ্যে পড়ত না লোপা বার কয়েক মেরে ফেলতে চেয়েছিল উপরওয়ালার কৃপায় বেঁচে গিয়েছে প্রত্যেকবার নানা রকম কষ্টের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে হয়েছে ওকে সৎ মাকে আপন করতে চেয়েছিল, পারেনি

মাহিগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে আর গ্রামে থাকতে ইচ্ছে করেনি, ঢাকা শহরে চলে
আসে লোপা; পড়ার খরচ, অন্যান্য খরচের টাকাও ঠিক মতন দিত না লোপার বাবা টাকা দিবে
কি! খোঁজ- তো নিতে পারেনি লোপার কাউকে তো ঠিকানাও বলে আসেনি লোপা
সময়ের পালা বদলে, কেমন জানি বদলে গিয়েছিল লোপার বাবা লোপাও কি কোনো অংশে কম?
সেও তো বেমালুম ভুলে গিয়েছে সবাইকে খেলার সাথী রেজাকে
বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হওয়ায় বেশ কিছু বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হত লোপাকে লোপা নিজেও তিনটা টিউশনি করিয়েছে সেই টাকা দিয়ে নিজে চলেছে, নিজের প্রাইভেটের স্যারকে টাকা দিয়েছে সব মিলিয়ে যে কি করুণ সংগ্রামের গল্প!

রতন নামের এক স্যার ছিল লোপার দেখতে বেশ স্মার্ট, বার্তায়-কথায় বেশ শৈল্পিক মাস্টার্সে
পড়তেন লোপাকে পদার্থ পড়াতেন স্যার, ‘চিলাক্ষিবলে ডাকতেন লোপাকে চোখগুলো নাকি চিলের চোখের মতন ওর প্রত্যেকটা ব্যাপারে খুব নিখুঁতভাবে ভাবত লোপা, সেজন্যই আজব নাম! প্রথম প্রথম ক্ষ্যাপাত সবাই

আপেল কেন নিউটনের মাথায় পড়ল? রতনের মাথায় পড়লে কি হত!’– এসব বলে ঢাকাই
ছেলেগুলো রাস্তাপথে রতন স্যারকে রোজ ক্ষ্যাপাত; বোকার মতন সেকথা আবার ডায়েরিতে লিখত স্যার, লোপা দেখেছে একদিন

লোপা, তোমাকে ভালোবাসিলেখা একটা চিরকুট পায় লোপা, পদার্থ বইয়ের ভিতরে বুঝতে বাকি থাকল না, রতন স্যারই দিয়েছেন কারণ, লোপাদের কলেজে মেয়েরাই পড়ে আর রতন স্যারের কাছেও মেয়েদের ব্যাচে পড়ে; এটা আলবত স্যারের কাজ ভীষণ জ্বালায় পড়ল, না পারে বান্ধবীদের বলতে, না পারে স্যারকে উত্তর দিতে লোপা কি করবে ভাবতে পাচ্ছিল না; ‘হ্যাঁবলবে নাকিনাবলে দিবে! জীবনে পাওয়া প্রথম প্রোপোজ; এত বছর, এত বসন্ত, এত পহেলা বোশেখ গ্যাছে, কেউতো বলেনি লোপার মুখ তো কোনো টিচারের দেখার কপাল হয়নি, দেখেছেন শুধু রতন স্যারই
লোপা, রতন স্যারের কাছে পড়তে যেত একটা কোচিং সেন্টারে, সকাল নয়টায় ওই সেন্টারে
প্রতিদিনের স্টার্টিং ব্যাচ ছিল লোপাদের ব্যাচটা, সব মেয়ে সবাই পৌনে নয়টার মধ্যে এসে হাজির
হত স্যার আসতেন পাঁচ মিনিট কম নয়টায় এই সময়ের আগ পর্যন্ত তিশা, সুইটি, আনিকারা
হালকা-পাতলা মেকাপ করে নিবে চুল ঠিক করা, হিজাব ঠিক করা, লিপিস্টিক দেয়া- এসব ছিল
মেয়েগুলির রূপচর্চার একাংশ

লোপার অদ্ভুত লাগত এসব রুম থেকে মেকাপ করে আসার পরও এত কারবার! হিজাবপড়া
মেয়েদের মধ্যে একজন ছিল লোপা সেদিন লোপার হিজাবের দুটো ক্লিপ কেমন জানি খচখচিয়ে
যাচ্ছিল, তাই হিজাবটা খুলেছে, ঠিক করবে বলে; তখনই আক্কেলহীনের মতন ঘরে ঢুকলেন রতন
স্যার সবাই তো অবাক! এটা কি হলো!
মেয়েরা তাড়াহুড়ো করে ওড়না ঠিক করেছিল মনে মনে কত শতবার চরিত্রহীন বলেছে মেয়েগুলি
স্যারকে কে জানে! বোকার মতন, বনে চলে গিয়েছিল লোপা হাতে হিজাব নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল,
সেদিন থেকে লোপার মোহনীয় রূপে মাতাল; রতন স্যার

পরদিন থেকে কেউ আর পড়তে আসেনি; বাবা মা আসতে দেয়নি কেউ শোনেনি, কেন
তাড়াহুড়ো করে রতন স্যার পড়ানোর ঘরে ঢুকেছিলেন স্যার বিরোধীদলের রাজনীতি করতেন
সেদিন একা পেয়ে তাড়া করেছিল ক্ষমতাসীনদের চ্যালারা, কোনো মতে পালিয়ে কোচিং সেন্টারে
এসেছিলেন রতন স্যার কথা, পরে রতন স্যারের কাছে শুনেছে লোপা; অন্যরা ওসব বিশ্বাস করেনি
বলতে দ্বিধা কি, লোপা মনে-তনে উদগ্রীব হয়েছিল, কেউ একজন তার হাতটা ধরে বলুক,
ভালোবাসি সারাজীবনের জন্য পাশে থাকতে চাইলোপার জন্য অফিস থেকে ফেরার পথে একটা বকুলের মালা কিনে নিয়ে এসে, বলুক, ‘যাও জলদি নীল শাড়ি পড়ে, খোঁপায় বকুল গুঁজে এসো; আমি দেখব
পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কেউ আদর করুক চুমু এঁকে দিক কপোলে, ললাটে ভেজা চুলে মাঝে
মাঝে যার ঘুম ভাঙাবে লোপা! স্নিগ্ধ ভোরের ফুল ফোঁটাবে

না, শেষ অবধি কি যেন ভেবে রাজি হয়নি লোপা আসলে মানুষ যা করতে চায়, তা ঠিক করে
উঠতে পারে না এই যেমন, বাবার কাছে কতবার চলে যেতে ইচ্ছে হলেও যায় না লোপা, থেকে
যায় শহরে রতন স্যারের কাছে আর যাওয়া হয়নি লোপারও
দেখতে দেখতে পেরিয়েছে ছয়টা বছর ডাক্তারি পড়ার সুযোগ হয় না, পদার্থে অনার্স শেষ করেছে
লোপা মাস্টার্স না পড়ে চাকুরির পেছনে ছুটছে এদিকে লোপাকে হন্নে হয়ে খুঁজে-ফিরছেন লোপার
বাবা অনেক খুঁজে লোপাকে পেয়ে যান লাবু পাটোয়ারী মেয়েকে পেয়ে সে কি কান্না !
এতদিন কিভাবে ছিলি মা? কত খুঁজেছি তোকে! তুই অভিমান করে চলে এসেছিলি হয়ত তুই
ভালোই ছিলি আমি খুব কষ্টে ছিলাম মাএমনি নানা কথায়, লোপার মনটাকে গলিয়ে ফেলেন লাবু সাহেব

লোপার অবাক লাগে, ঘেন্না হয় মনে কয়, বাবাকে ফিরিয়ে দেয়া উচিত খুব কান্না পাচ্ছে লোপার, কাঁদছে না যাবে কি যাবে না! মাস্টার্সটা পড়ার ইচ্ছে ছিল ঢাকায় কিন্তু, ইট-পাথরের শহরে দম বন্ধ হয়ে আসে মাঝে মাঝে না, রতন স্যারের জন্য কোনো পিছুটান নেই কোথায় যেন চলে গেছেন স্যার, হয়ত ভুলে গেছেন ভাবতে ভাবতে লোপা সব ভুলে গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য
মনঃস্থির করে

ট্রেনের জন্য অপেক্ষা ইস্টিশনের ঘড়িটায় সন্ধ্যা সাতটা লোপার খারাপ লাগছে, পাশের ফ্ল্যাটে থাকা সুজানার জন্য তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটার চোখ জুড়ে কি মায়া! নানাবাড়ি বেড়াতে গেছে, সেজন্য নির্ভয়ে বাবার সাথে যেতে পাচ্ছে; তা না হলে আর যাওয়া! নিশ্চিত কান্না জুড়ে দিত মেয়েটা
অপেক্ষার পালা শেষে ট্রেন ছুটে চলছে বারো ঘন্টা পর পৌঁছে যাবে ট্রেনটা শান্তাহার পেরিয়ে
নলডাঙ্গা, বামনডাঙ্গা; তারপর কাউনিয়া রেলওয়ে জংশন ওখানে নামবে, অটোরিকশা নিয়ে সাতমাথা হয়ে, মাহিগঞ্জ দিয়ে আসবে; বড় রংপুর পেরিয়ে সোজা দক্ষিণে এক কিলোমিটার গেলে রেজাদের গ্রাম, সেই মীরগঞ্জ; যেখানে কেটেছে লোপার শৈশব তারপর, মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণে এগুলেই চলে আসবে সমরদীঘি, পাশে কৈয়াপাড়া; মায়ের কবর, লোপাদের বাড়ি সৎমা যেখানে রাণী! আচ্ছা, এখনও সেই সৎমা কি আগের মতন আছেন! যদি উল্টা-পাল্টা কিছু করে
আবারও! কি করবে তখন? কি আর করবে, সোজা ব্যাগ গুছিয়ে আবার ঢাকায় আসবে না হয়!
এসব ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে আসছে যেন! ট্রেনে সেভাবে ঘুমানোও যায় না
সকাল সাড়ে আটটা

অটোরিকশাটা মীরগঞ্জ পেরিয়ে এল, সমরদীঘির কাছাকাছি; সেই গ্রাম নানা স্মৃতি ছড়িয়ে আছে
এখানে আজ কতটা সময় পেরিয়ে গেছে পেরিয়ে গেছে কত পহেলা বোশেখ ! কত পহেলা বোশেখে
রেজার সাথে তাজহাটের মেলায় যেত লোপা গাঁয়ের সেই পরিচিত পথটা ধরেই বাড়ি ফিরছে ওরা
আজ এতদিন বাদে রেজার কথা মনে পড়ছে লোপার
দুএক কথায় বাবার মুখেই শুনল, রেজা ডাক্তারি পড়ছে রংপুর মেডিকেলে, বছরেই ডাক্তার হয়ে
বের হবে শুনে ভালোই লাগল লোপার কি কপাল রেজার, ডাক্তার হয়েই গেল! লোপার ইচ্ছা ছিল
গ্রামের মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিবে লোপা সেটা না পারলেও রেজা ঠিক পারল
বাড়িটা আগের মতই আছে কিছুই পাল্টেনি দেয়ালের সবুজ রঙটা ঘোলাটে হয়ে গেছে শুধু পাল্টেনি বললে ভুল হবে, বিদ্যুৎ এসেছেএলআকৃতির পাঁচ ঘরবিশিষ্ট বাড়িতে নেমেই সুপারি বাগানের দিকে গেল লোপা, মায়ের কবরের কাছে
বাবা, এটা আবার কার কবর, বামপাশে?’ ভয়ার্ত, উৎকণ্ঠার চোখে চেয়ে আছে লোপা, বাবার
দিকে চুপ মেরে আছেন লোপার বাবা কেমন জানি সংশয়, কেমন জানি নীরবতা!

তোর সৎ মার কবর মরেছে তিন মাস আগে’ -মুখ খুললেন লাবু পাটোয়ারী
কি শোনালেন বাবা এটা! এক মা তো জন্ম দিতে গিয়ে মরে গেল, আর যে শত অত্যাচার করেও,
দুএকদিন ভাত বেড়ে দিত; সে- পৃথিবীতে নেই! লোপার বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে যেন! চোখে
কান্না চলে আসছে এত অত্যাচার সহ্য করার পরও একটা বিষয় ভেবে, নিজেকে সান্ত্বনা দিত
লোপা হোক সৎ মা, তবুও তো মা: এটা ভেবে এসেছে এতদিন; অথচ আজ তো সত্যি মা হারা
লোপা!

মা, আমাকে মাফ করে দে, মা আমি এতদিন তোর কোন খোঁজ নিতে পারিনি এতদিন
অন্ধকারে ছিলাম মা’ -গলা ভারি হয়ে আসছে লোপার বাবার
মা পৃথিবীতে নেই, আমি জানলাম না কেন? সৎ মা হউক, তবুও তো মা
ইত্যাদি আবেগ জড়ানো কথায় আর কান্নায় ভারি হয়ে যায় বাতাস এরই মধ্যে দারোয়ান চাচা
হাজির হয়েছে, সাথে আনুমানিক ছয় বছর বয়সের একটা ছোট মেয়ে; একটা মাঝবয়সী মহিলা,
দারোয়ান চাচার বউ লোপাকে দেখেআপুবলে ডেকে উঠল মেয়েটা, কাছে এসে জড়িয়ে ধরল
তাকে; ভারি মিষ্টি চেহারা!
খুব জ্বর হয়েছিল অনেক চিকিৎসা করিয়েছি মৃত্যু তাকে মুক্তি দেয়নি হ্যাঁ, উনি তোর সৎ মা
ঠিকই কিন্তু, মারা যাবার কিছুদিন আগে থেকে তোর জন্য ছটফট করতেন
বলতেন, ‘ তো আমার মেয়ে আমি এতদিন ভুল করেছি যদি কখন ওকে পাওয়া যায় তাহলে
ওকে বোলো, যেন আমাকে মাফ করে দেয়’ -চোখ মুছতে মুছতে বললেন লোপার বাবা

আর এই মেয়েটা হচ্ছে রিতা, তোর ছোট বোন আমি তোর একটা ছবি আমার ঘরের দেয়ালে,
ফ্রেমে করে রেখেছি ওইটা দেখে হয়ত আন্দাজ করছে যে, তুই সে লোপা আপু ওর ধারণা ভুল
নয়
কিছুদিন কেটে যায়
সকালে মানুষের চিৎকারে ঘুম ভাঙল লোপার অনেক মানুষের ভিড় ভিড় সরিয়ে কাছে গেল
লোপা যাকে নিয়ে জটলাটা পেকেছে সে তো রতন ভাই, মানে রতন স্যার বাবার কাছ থেকে
জানল: ছেলেটা নাকি ভোর রাত থেকে বাড়িতে উঁকি দিচ্ছিল দারোয়ান ধরে ফেলেছে
লোপা বাবার কানের কাছে মুখ নিল, মুখে-কানে কথা হলো মাথা নাড়ালেন বাবা, উপর-নিচ
তোমরা সব্বায় বাড়িত যাও মুই দেখতোচো কায় এটা
মানুষজন চলে গেলে স্তব্ধ চারপাশ লোপা, রতন স্যার, রিতা আর লাবু পাটোয়ারী দাঁড়িয়ে আছে
উঠানে লোপা রতন স্যারকে দেখিয়ে বাবাকে বলল: ‘বাবা, এই মানুষটা কে জানো? ইনি রতন
ভাই আমাকে প্রাইভেট পড়াতেন শহরে কখনো-সখনো বাসা ভাড়াটাও দিয়ে দিয়েছিলেন শুধু তাই নয় বাবা, আমার অন্যান্য প্রাইভেট টিচারদের মাসের বেতনটাও অনেক সময়, চুপ করে দিয়ে
দিতেন
এবার দয়া করে চুপ যাওলজ্জাভরা কণ্ঠে বলল রতন স্যার
অনেক খুঁজেছি তোমাকে অনেক কষ্টে তোমার বাসার ঠিকানা পেয়েছি তোমার সাথে আমি অনেক অন্যায় করে ফেলছি তাই ক্ষমা চাইতে এসেছি
এতক্ষণে ওখান থেকে রিতাকে নিয়ে সরে গেছেন লাবু পাটোয়ারী

না, ক্ষমা তো করব না আপনাকে আমি তো ওই শহরেই ছিলাম ক্যামনে খুঁজলেন যে আমাকে
পেলেন না? আর কি অন্যায় করেছেন বুঝলাম না, আজব!’
সেটা তোমার এখন না বুঝলেও চলবেলোপার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন রতন স্যার
সকালের সূর্যটা ফর্সা হয়ে ওঠে মিষ্টি রোদ পড়েছে উঠোনটায় বাবা তাঁর ঘর থেকে ডাকছেন, ‘কি রে ! বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলবি? ছেলেটাকে নিয়ে ভিতরে আয়
লোপা বাবার ঘরে নিয়ে গেল, রতন স্যারকে দুএক কথায় জানা গেল: তার মা বেঁচে নেই কথাটা
শুনে আফসোস করলেন লাবু পাটোয়ারী, লোপাও দুঃখ পেল পড়াশুনা শেষ করে, চাকুরি পেয়েছেন একটা বেসরকারি ব্যাংকে বিয়ে করেননি এসব কথা হলো
পাটোয়ারী বাড়িটা অনেক দিন পর আবার সরগম হয়ে উঠেছে লোপা আসার পর বাড়িতে লোক ছিল পাঁচ জন লোপা, রিতা, লোপার বাবা, দারোয়ান চাচা আর তার বৌ দারোয়ান চাচার বৌ- রান্না-বান্না করেন রিতার দেখাশুনা করেন হ্যাঁ, সেই অপূর্ণ সুখের নীড়ে অতিথি হয়ে এসেছেন রতন স্যার

বিকেল হয়ে আসছে রঘুবাজারে গেছেন লাবু পাটোয়ারী রিতাকে নিয়ে দারোয়ান চাচা পায়রাবন্দের মেলায় গেছেন, বেগম রোকেয়ার জন্ম-মৃত্যু দিবস উপলক্ষে মেলা বসে, প্রতি বছর; ডিসেম্বরের নয় তারিখ থেকে শুরু হয়ে চলে সপ্তাহ দুয়েরও বেশি কিন্তু, তাজহাটে এখন আর মেলা বসে না, সরকার ওটাকেরংপুর জাদুঘরবানিয়েছে খালুর সাথে দুই-তিনবার গিয়েছিল লোপা
রতন স্যার, লোপা আর দারোয়ান চাচার বউ: তিনটা মানুষ যায়নি, মেলায় দারোয়ান চাচার
বউ মাসুমাদের বাড়ি গেছে একটু রতন স্যার শুয়েছেন, ঘুমিয়েছেন কিনা দেখার জন্য, মেহমানদের জন্য বানানো রুমটায় উঁকি দিল লোপা ঘুমোননি, জেগে আছেন; ইচ্ছে করছে, সোজাসুজি বলতে:
Love you, Sir. Never leave me please. I am too much alone!
যেই চিন্তা, সেই মত কাজ করার ইচ্ছে আর সুযোগ থাকলেও বলল না আজ থাক, কাল বলবে:
এমনটা সান্ত্বনার বাণী দিল লোপা, নিজের মনকে

দুএক দিন ভালোই কাটল খালা বাসায় বেড়িয়ে আসল সবাই, মীরগঞ্জে লোপাকে তো আসতেই দেন না, রেজার মা কত্তদিন পর কাছে পেলেন লোপাকে!
সন্ধ্যার আড্ডায় বসেছে লোপা, লোপার বাবা, রতন স্যার আর ছোট্ট রিতা সেখানে অনেক কথা
হচ্ছে, গল্প হচ্ছে পরিবেশটা বেশ
রতন স্যার লোপার বাবাকে বললেন, ‘আংকেল, আমি কাল সকালে চলে যাচ্ছি
না! না! আমি ভাইয়াকে যেতে দেবো নাবলে কান্না শুরু করে রিতা লোপা ওকে নিয়ে অন্য ঘরে
চলে যায় মনটা খারাপ হয়ে গেল লোপার
লোপার বাবা রতনকে বলল:
বাবা, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল ! ”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রতন বলল, “আংকেল, আপনি যা বলতে চাচ্ছে তা আমি জানি এটা সম্ভব
হলেও বর্তমানে অসম্ভব আমার তো চাকুরি আছে লোপাকে যদি বিয়ে করি, তবে ওকে তো আমার সাথে নিয়ে যেতে হবে তখন রিতা আর আপনাকে দেখবে কে? আমি পারব না লোপাকে বিয়ে করতে

না, আমি ঠিক তা বলতে চাইনি বলছিলাম আর টা দিন থেকে যেতে! লোপার বিয়ের কথা
চলছে, আমার তো ছেলে নেই, কে সামলাবে ওসব রেজাটাও গ্রামে নেই
লজ্জা পায় রতন আজকাল একটু বেশি ভাবছে সে তবে বাড়তি ভাব নিতে গিয়ে বোকামি করে
ফেলল! বুকের ভিতরটা কেমন চিনচিনিয়ে উঠল যেন! কাছে পেয়েও হারাতে হবে লোপাকে? খারাপ লাগছে রতনের

রতন যে লাবু পাটোয়ারীর মনের কথা বুঝতে পেরেছে, তা ভেবে ভিতরে ভিতরে খুশি তিনি তবে
রতনকে সেটা বুঝতে দিলেন না মুখে বললেন, ‘কাল না পরশু যেও
আচ্ছা, আংকেল
আজ তাহলে ঘুমোতে যাও নাকি জোছনা দেখবে? দ্যাখো জোছনা নামছে আকাশ বেয়ে! ‘
না, আংকেল আমার ঘুম পাচ্ছে আজ দেখব না জোছনা
আচ্ছা, তুমি ঘুমাও শুভ রাত্রি
শুভ রাত্রি, আংকেল
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে লোপা জেগে ওঠে দারোয়ান চাচার বউ চা করেছে সেখান
থেকে এক কাপ চা নেয় লোপা, রতন স্যারের জন্য
স্যার যেই ঘরে ঘুমিয়েছিলেন, সেই ঘরের দিকে গেল সে কি! দরজা খোলা অবাক হলো লোপা
দ্রুত ঘরে ঢুকল
নাহ! কেউ নাই ঘরে কই গেল মানুষটা! চলে গেল?
মোটেও অবাক হচ্ছে না লোপা, চলে গেলে কি আর করতে পারবে! জোর করে তো আর কাউকে
আটকানো যায় না জীবনের সাথে বাঁধা যায় না
চায়ের কাপটায় চুমুক দেয় লোপা চা-টা দারুণ বানাতে পারে দারোয়ান চাচার বউ ছোট মা-
যেন এমন করে চা বানাতেন গত কয়েকদিন এই কাপটায় ঠোঁট লাগিয়ে চা খেয়েছেন রতন স্যার
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে
গাঙহীন গাঙচিল, রতন স্যারকে নিজের গাঙে, ঠাঁই দেয়া হলো না লোপার কাপুরুষটা এভাবে চলে গেল! আজ সতিই একটা ছেলে দেখতে আসবে লোপাকে নাহ! পরিচিত কেউ নয়, সম্পূর্ণ অচেনা একটা মানুষ


দুই.
লোপার বারো বছরের মেয়ে লুবাবার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, অবিরাম মা ডায়েরি লেখে, সেটা
দেখেও মাঝে মাঝে; হিজিবিজি সব কিন্তু, ডায়েরি কবে লিখলে! মায়ের গোপন ডায়েরি কি
তার বাবা দেখেছিল? তার জন্য কি আজ দশ বছর, লুবাবা বাবা ছাড়া? বাবার সাথে নাকি
কথায়-কাজে মেলেনি মায়ের; তাই ছেড়ে গেছে

নানাভাইরা কেউ বেঁচে নেই, রেজা আংকেল নানিকে নিয়ে লন্ডনে রংপুরে মা লুবাবাকে নিয়ে কতটা কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে বড় করছে, সেটা বোঝে লুবাবা; কিন্তু, মায়ের রতন স্যার... সে কি জানে?
লুবাবার জন্মদাতা পিতা! সে কি একটা বারও বোঝার চেষ্টা করেনি; দিব্যি তো আরেকটা বিয়ে
করেছে আর তার চিলাক্ষি মা, কলুর বলদের মতন প্রাইমারি স্কুলে খাটে মোটা মাইনের বদলে
পায়, দুই কানজ্বলা, বুকজ্বলা: চরিত্রহীন, অপয়া-নামক সম্মানসূচক শব্দ!

মা স্কুল গেছে, ফেরার সময় হয়ে আসছে; পুরোনো ডায়েরিটাতে যে হারে তেলাপোকা চলাফেরা
করেছে; তাতে মনে কয়- গত পাঁচ-ছয় বছরে খোঁজেনি মা, বইয়ের গাদা সরাতে গিয়ে পেল এটা;
নাহ! এটাকে পুড়ে ফেলতে হবে, উন্মাদের মত দিয়াশলাই খোঁজে লুবাবা, পেয়েও গেল; পুড়তে যাবে- সময় দরজার কড়া নড়ে উঠল; বুঝতে বাকি নেই, তার চিলাক্ষি মা এসেছে; দ্রুত ডায়েরিটা যথাস্থানে রাখে, মা কড়া নাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে

1 comment:

  1. খুবই তথ্য বহুল লিখা । সবার কাজে আসবে ।

    দুনিয়া জুড়ে সব খবর এক সাথে পেতে ঘুরে আসুন all bangla Newspaper

    ReplyDelete

Powered by Blogger.