সায়ন্থ সাখাওয়াৎ-এর পদাবলি


সায়ন্থ সাখাওয়াৎ-এর পদাবলি



Untitled-সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ - আগুয়ান- Sakhawat hossain sayantha - agooan
সায়ন্থ সাখাওয়াৎ-এর পদাবলি - আগুয়ান




ব্র্যাকেটবন্দি জীবন



১.
আমি কি কোন দিন ছিলাম কারো
না কি কেউ কোন দিন হয়েছে আমারো!
যে হাতে হাত রেখে জীবনের মানে খোঁজা যায়
যে হাত না পেলে শূন্য সাহারায় বেঁচে থাকা দায়
সে হাত কি বাড়িয়েছে কেউ, ডেকেছে কখনো কাছে
বলেছে কি কখনো, এই জীবনেরও মানে আছে!

ব্র্যাকেটবন্দি জীবন কেটে যায়
গল্পে আড্ডায় সুপেয় জলসায়
বুকে ঢেকে বেদনার কালো ছায়া
ঘরে-বাইরে দেখি কতো পরিচিত মুখ
মুখোশের আড়ালে তার অকথ্য অসুখ
মরীচিকা হয়ে রয় সংসারী মায়া

যে নিয়ম বেঁধেছে আমায় গভীর যাতনায়
সেই ভার ছিন্ন করি কী স্পর্ধায়
তাই কোমরে বাঁধি ইচ্ছে-কর্তার সুবিধের দড়ি
এই বন্দী জীবন অসহ্য দহন বুকে পুষে
হাসি কাঁদি খাই-দাই কষ্ট পোড়াই নিমেষে
অন্ধকারেও খুঁজে ফিরি পথ চলার সাদা ছড়ি

২.
কে ছিল আমার কী আছে হারাবার
সে কথা ভেবে জীবন-নাটাইয়ের পিছে বৃথাই সময় পার
যেতে হবে যাব চলে হয়ে রব কেবলই স্মৃতি
এই সব পাওয়া না পাওয়ার অনুতাপ
হিসেবের গরমিল খুঁজে বৃথাই প্রলাপ
মহাশূন্যেই হব বিলীন একদিন, এটাই নিয়তি

কোন এক প্রাগৈতিহাসিক কালে
আমাদের বস্ত্রহীন পূর্বপুরুষেরাও গেছে চলে
কে রেখেছে কার খবর কে পেয়েছে কবে অমরত্বের অহি
কোটি সৌরবর্ষ পরে আজো সেই আসা যাওয়া
মাঝে ক্ষণিকের যাত্রা বিরতি তবু কতো চাওয়া
বোধের আকালের ঘোরে যাই ভুলে, যাওয়াটাই সহি


তোমার সাথে দেখা হবে বলে


তোমার সাথে দেখা হবে বলে
কেটেছে নির্ঘুম সারারাত
চোখের দু'পাতা এক করলেই
এলোমেলো স্বপ্নের যাতায়াত

তোমার সাথে দেখা হবে বলে
প্রজাপতি মন ওড়াউড়ি
তারায় তারায় সাজানো আকাশ
আমাদের বাসর-বাড়ি

তোমার সাথে দেখা হবে বলে
যতো গানের আনাগোনা
মনে মনে আঁকি অপূর্ব সে মুখ
কতো কবিতার আলপনা

তোমার সাথে দেখা হবে বলে
কতো স্মৃতি খেলা করে
প্রথম দেখার সেই শুভ ক্ষণ
ফিরে আসে বারেবারে

তোমার সাথে দেখা হবে বলে
রাতটা এতো দীর্ঘ
ভোরের আশায় নির্ঘুম রাত
তোমাকে ভেবেই স্বর্গ


ঘুনপোকা


কুটকুট করে শুধু
দিন-রাত কেটে যায়
বাহিরটা ছিমছাম
ভেতরটা খেয়ে যায়
কেউ জানেনা কী যাতনা
একাকী সে বয়ে যায়
বুঝে শুধু সেই জন
ভেতরে যে ক্ষয়ে যায়

হাঁটছি খাঁটছি কারণে-অকারণে
গালভরে হাসছি
খাচ্ছি-দাচ্ছি সময়ে-অসময়ে
সঙ্গমে ভাসছি
ব্র্যান্ডের শার্টে কলারটা ঝাঁকিয়ে
কী যে ভাব মারছি
অভিমান লুকিয়ে হাসিটা ছড়িয়ে 
পাকা অভিনয় করছি!

পোকাগুলো দলেবলে
কিলবিল করে শুধু খাচ্ছে
নড়বড়ে দেহখানি নীল মুখে
বিষপানে সব সয়ে যাচ্ছে
কষ্টের তরবারি সৌখিন শিকারি
সুখ পাখি মারছে
বাঁচার বাসনাটা তড়িঘড়ি
খাঁচাটারে ছাড়ছে

এভাবেই দিন যায়
অভিনয়ে পাকা হই
অন্দরে পোকা পুষে
বন্দরে হৈচৈ
সুখে আছি ভালো আছি
কতো গালগল্প
ঘুনপোকা খেতে থাকে
জীবনের গল্প!


অমরাবতী


কীর্তিনাশার বুকে বলক ওঠা ভাতের মতো
ফুঁটতে থাকা বৃষ্টির ফোঁটার ছন্দে
রঙিন মাছ রাঙাদের রতি-আনন্দে
ঝাঁকে ঝাঁকে মাছেদের জলকেলির
ঢেউয়ের ভাঁজে দেখি জীবনের বৈচিত্র্য যতো

কিশোরী বধূর মতো অবনত লজ্জাবতী
মেঘেদের গলে পড়া শীতল ধারায়
মোচড় খাওয়া ছোট্ট নাওয়ের মাচায়
ঝড়ো-মেঘে দিশেহারা চড়ুয়ের মতো
দোল খাওয়া জীবনের মানে খুঁজে মায়াবতী

সপ্ত স্বর্গ পাড়ি দিয়ে এসে কীর্তিনাশার বুকে
দোল খায় স্বপ্নের সেরা অমরাবতী
আমি মায়াবতী, দোঁহে মাতামাতি
নদীর জলে তানপুরার সুর তোলা সন্ধ্যা মুখে
বৃষ্টির গীত-নৃত্যে একাকার হই প্রেমের অসুখে

অবশেষে কীর্তিনাশায় রাত নেমে আসে
চাঁদের আলোর চাদর সরিয়ে আসে ভোর
মায়াবতী মুখে সুবেহ সাদেকের আভা যায় খেলে
অলক্ষে সে যায় চলে একাকী কোন কথা না বলে
শেষ হলে নৌকা বাসর রাখে কে আর কার খবর!

শূণ্য নৌকা বুকে নিয়ে অপেক্ষায় এক নদী
বৃষ্টি শেষে কোন এক পূর্ণিমায় আসে যদি
আবার কোন এক মর্তের মায়াবতী
যদি নামে আবার স্বর্গের অমরাবতী !



এই মৃত নগরে


এই মৃত নগরে কবরের নীরবতা
প্রাণহীন মানুষের হাঁটাচলা
প্রেতাত্মার নিঃশব্দ আনাগোনা
অর্থহীন ইশারায় কথা বলা
ইট-পাথরের ভাঁজে ভাঁজে বোনা
সহস্র পুরুষের পাপের খতিয়ান

এই মৃত নগরে প্রেম নেই কাম নেই
বিরহ ব্যথা নেই স্পর্শে শিহরণ নেই
এমন কি রোগ শোক ঘৃণাও নেই
কি এক পাপের প্রায়শ্চিত্ত মেনে
জড় ক্লিব যাপনে ব্যস্ত সকলে
পর জন্মে জাতিস্মর হবে বলে

এই মৃত নগরে ফুল ফোটে না
মধুর নেশায় মাধুকরী ছোটে না
বাতাস বহে না শন শন সুর তুলে
পাখিরা কহে না কথা প্রাণ খুলে
প্রজাপতি উড়ে না পাখা মেলে
শিশুরা খেলে না আপন-ভুলে

এই মৃত নগরে আমিও পোষাকী ফসিল
সময়ের জলছবি এঁকে যত্নে তুলে রাখি
ভালোবেসে দাও যদি এক অলৌকিক চুম্বন
প্রাণে প্রাণ ঘষে জ্বেলে দেব সৃষ্টির আগুন
জীবনের পদ্য সঁপে দেব চরণে তোমার
আবার শুরু হোক তবে এই জীবন নগর!


No comments

Powered by Blogger.