রহমান হেনরীর একগুচ্ছ কবিতা


রহমান হেনরীর একগুচ্ছ কবিতা 



রহমান হেনরীর পদাবলি - আগুয়ান - Agooan - Rahman Henry
রহমান হেনরীর পদাবলি - আগুয়ান



সকালবেলার রূপকথা


হাঁস-মুরগিগুলোকে ছেড়ে দিতাম, ভোরবেলায়; সারাদিন টইটইসন্ধ্যায় ফিরে আসতো যে যার খুপরিতে রোজ সকালবেলায়, মা:
‘‘বাচ্চারা, নাস্তায় আজ কী খাবে তোমরা?’’
অনেকগুলো ভাইবোন। নিজ নিজ পছন্দমতে, কারও বায়নার আর অন্ত থাকতো না; কিন্তু প্রতিটি সকালেই খেতে হতো রুটি। সঙ্গে থাকতো আলু বা পেঁপে ভাজি। কখনই ডিম খেতে দেখিনি কাউকে। অথচ হাঁস-মুরগিগুলোর কোনওটা না কোনওটা প্রতিদিনই ডিম পাড়তো। বাচ্চা ফুটতো অনেক কোনও এক অচেনা সাপ কিছু ডিম খেয়েও যেতো। বাজ বা চিলওরকমই কোনও পাখি ছোঁ মেরে নিয়ে যেতো হাঁস বা মুরগির দুচারটে ফুটফুটে ছানা ; কিন্তু আমাদের খাদ্যতালিকায় ওদের মাংস থাকতো না। তবু, প্রতিদিনই মা জিজ্ঞেস করতেন:
‘‘নাস্তায়, আজ কী খাবে তোমরা?’’
এবং যথারীতি রুটির সাথে আলু বা পেঁপে ভাজি, যত্ন করে তুলে দিতেন, প্লেটে প্লেটেহাঁস-মুরগিগুলো, আমাদের ভাইবোন ছিলো



পোস্টকার্ডে, লিখিত উদ্বেগ

.
ভেবে তো ছিলাম: তোমাকেই পাবো পাশে;
রাত্রির কাঁধে আলুথালু মাথা ঠুকে,
আদরের টিয়াপাখিটি কাঁদবে না
ভেবে তো ছিলাম: পরমাণু ফেলে, সবুজের উল্লাসে,
গাছেদের দিকে গাছেরাও যাবে ঝুঁকে;
মেঘকুন্তল জ্যোৎস্নাকে বাঁধবে না
পরমাণুবোমা হাতে নিয়ে ঢোকা অঝোর পুষ্পবনে
ভেবে তো ছিলাম: খুনিটাই বদলাবে;
ভেবে তো ছিলাম: ঝাঁকবাঁধা শত নেকড়ের অঙ্গনে,
গোপন-সভা, এবার থেমে যাবে
শলা ষড়যন্ত্রের মুখে, পৃথিবী কাঁপছে ওই
রোরুদ্যমান মানুষের মুখ, বেদনায় অবনত;
রাজনীতি আর ক্ষমতাই সব! আমরা কি কেউ নই?
বলো তো দেবী, কত শতাব্দএভাবেই হবে গত?
.
.
জীর্ণ, বিদীর্ণ অন্ধকার: অতিশয় দরিদ্র রাত্রির।
যেন কোনও শাদাকালো প্রাথমিক চলচ্চিত্র, গত শতাব্দীর;
উদ্ভাসিত হচ্ছে ক্রমেপ্রেক্ষাগৃহে: বিস্তীর্ণ পর্দায়
শোচনা-সন্দিগ্ধ এক মুখচ্ছবি ভাসেদেখা যায়:
সে মুখ তোমার। সুপ্রাচীন। পুরনো দিনের আশু ধানক্ষেতে
পেকে ওঠা সোনা, পরিত্যাগ করে রেখে, চলে যেতে যেতে
কারা যেন পেছনে তাকাচ্ছে আজ, আর্ত-বেদনায়;
নির্জন মাঠের মধ্যে, ঝরে পড়ছেঅনন্ত কষের কৃষ্ণক্ষীর
বয়সের বলিরেখা জেগে ওঠা, প্রিয় সেই মুখের আদলে
আমার আগ্রহ-স্বপ্ন-অস্তিত্ব: লেপ্টে, মিশে, গলে,
আলো হচ্ছে: জোনাকির। সীমিত উজ্জ্বল
আহ নিস্ফল! গগণপিপাসু শাল-গামারির মতন নিস্ফল,
স্তব্ধ, নির্জন ছায়া: স্থায়ী ঋতু নয়। পালাবদলের হাওয়া জানে:
আবার ছিটাবো ফুলপাখিডাকা ভোর ফুটবে তোমার উঠানে
 




রাত তিনটের অন্ধকারে

*
ঝাঁকরা আমগাছের আয়নায়
অনেকগুলো কলাপাতা
চুল আঁচড়াচ্ছে
**
নিজেকে কালো ভাবতে ভাবতে
একটা শাদা খরগোশ
ভোর হতে যাচ্ছে
***
মোহনার তিন কিলোমিটার আগেই
অকস্মাৎ, সমুদ্র হয়ে উঠছে
কর্ণফুলি
****
আসমানি কেতাবগুলোর স্বার্থে
সম্পূর্ণ পৃথক একটা অভিধান
রচিত হচ্ছে
*****
তোমার শহুরে জানালায়
নম্র, লাজুক বিকেল
উঁকি মারছে
******
মানুষের কর্মক্ষেত্রে, বাসস্থানে, ছাদে,
রাজপথের পুলিশী দৌরাত্ম্য জুড়ে
নেমে আসছে অন্ধকার
*******
সরস্বতী নদীর মতো মৃত্যুসাপ
নিঃশব্দে পেঁচিয়ে ধরছে
এক ক্লিওপেট্রাকে

তদন্ত

কণ্ঠনালে সঘন চুম্বন দিচ্ছি,
দেখে নিচ্ছি:
চিহ্ন আছে কি-না;
প্রতি জন্মে-পুনর্জন্মে, সে কি বেঁচে থেকেছিলো
বলিদান বিনা?
না-কি কোনও যূপকাষ্ঠে রেখেছিলো
গলা!
আর তার বিপরীতে
কেন প্রসারিত হচ্ছেসংকীর্ণ ফিতে?
অবনত-বক্ষা নদী, আজও যদি এত রজঃস্বলা
আমি তার বিবাহবহির্ভুত সর্ব রতিকলা
বুঝে দেখতে চাই
আমার চরিত্র তুলে, কারা অযথাই
মাঠে মাঠে বুনে দিচ্ছোঘৃণা?

তিনি লিখতেন

বোবা রিক্ত আঁশু সিক্ত লোকে ভাবে
কথা কই কই, কথা কই কই, কথা কই কই
মনে সন্দ ভালো-মন্দ কে শেখাবে
কথা কই কই, কথা কই কই, কথা কই কই
বুকে কান্না বোবা আন্না কাঁপে স্বর যে
জ্বলে রক্ত বাঁচা শক্ত ঐশ্বর্যে
ধ্বনি ফুল তো যেন দুলতো শত অব্দে
কথা কই কই, কথা কই কই, কথা কই কই
কী যে কষ্ট, কী যে কষ্ট, কী যে কষ্ট,
ঘরে-বাইরে, কোথা নাই রে: মূক নষ্ট
দ্বিধাদ্বন্দ্বে রণছন্দে তারা-শব্দে
কথা কই কই, কথা কই কই, কথা কই কই.



যিশু খ্রিষ্টের গল্প 

হতে পারেযিশুর চেহারার সাথে মিল রয়েছে
আমারওকিন্তু
আমি তো সেই কাঠুরে নই, যে কিনা, নিজেরই
দেহবন থেকে কাঠ কেটে, একটা হ্যাঙ্গার বানিয়ে
কাঁধে করে বয়ে বেড়াবেএবং কোনও একদিন
জীর্ণ মলিন একটা কোটের মতো সেটাতেই ঝুলে পড়বে;
বরং টেলিফোনের খুঁটিতে পেরেক সদৃশ
লোহায় লটকে যাওয়া একটা পাখিকে
দেখেছিলাম; রোদে চুনখুটি মারা সেই দেহে
লেপ্টে ছিলো কালো হয়ে ওঠা রক্তের দলা
অবশেষে, তুমুল বৃষ্টিদিনে, জমাট বিগত সেই যন্ত্রণা
যখন টাটকা রক্তের রং নিয়ে গলে পড়লো, তখনও
টেলিফোন খুঁটির তলদেশে, উলঙ্গপ্রায় কিশোর আমি;
সমগ্র শৈশবজুড়ে লালবৃষ্টিতে ভিজলামআর
আমার মনে হলো:
যিশু খ্রিষ্টের গল্পটাকিছুতেই মিথ্যা হতে পারে না।
.

বিসর্জন

বিসর্জন দিয়ে এসে, মনে হয়:
গৃহখানি এইবার পূর্ণতা পেলো
নিঃসঙ্গ শয়নকক্ষে প্রতি কণা ভরে গেছে
দেবীর সুঘ্রাণে;
টের পাইপাঠকক্ষে, স্নানঘরে, রন্ধনশালায়,
দুয়ারে উঠানে-বাগানে,
সমগ্র শূন্যতা জুড়েদেবী, দেবী, দেবী...
বিসর্জন শেষ হলে, দশদিগন্তের গানে
জেনে যাই:
আমি তার সমস্ত পেয়েছি।
 


বালুযান

.স্মার্ট অন্ধকার। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই
হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেহ্যান্ডশেকের সে এক জটিল ভঙ্গিমা
: ‘‘হেই ড্যুড, গ্ল্যাড টু মিট ইয়্যু!’’
সুইডিশ শীতঋতুর চোখের মতো স্থির অস্বস্তিপ্রদেশে,
এইসব বিপুল বালুস্রোত ভেঙে, যে নৌকা আমাকে নিয়ে এলো;
খুব মিস করছি ওই যানটিকে
অথচ
বর্ণিত যানবাহনের কথা, জনতাও স্বীকার যাচ্ছে না;
বলছে, তা- আবার হয় নাকি!
একটা ঘুলঘুলিতে, দুপুর-আলোর সম্মোহনে, এই যে বাবুইটা
আটকে গেলো! আমরাও তো আটকে গেলাম
অসমাধান-বৃত্তের কেন্দ্রীয় মোহাচ্ছন্নতায়;
ভাঙতে হবে। ফিরতেই হবে যাত্রা-শুরুর-বিন্দুতে;
কিন্তু সেই যে আশ্চর্য বালুযান? তার অস্তিত্ব
কারা কারা স্বীকার করছো, বলো!



No comments

Powered by Blogger.