মাহফুজ সজলের পদাবলি

মাহফুজ সজলের পদাবলি



আগুয়ান- মাহফুজ সজলের কবিতা - Agooan - Mahfuj Sajol
মাহফুজ সজলের পদাবলি - আগুয়ান



ডাস্টবিন উদগত বাস্তবতা


রাত্রি গভীর...
যখন রাজধানী ঘুমোয়
শকুন দৃষ্টি মেলে আমি খুঁজি
ডাস্টবিন অথবা 'আমাকে ব্যবহার করুন'
অথবা নগর ভবনের দুর্লভ কন্টেইনারে
আবর্জনার স্তুপ

ল্যাম্পপোস্টের ঝিমোনো আলোয়
অতঃপর খুঁজতে শুরু করি
আবছা অন্ধকার ঘুচাই মর্মব্যথার দীপ জ্বেলে

দেখি, উদ্বাস্তুর প্রতি এক পথচারীর দৃষ্টি অবহেলা



অভূক্ত সারি সারি ভোজ্য কিছুইতো নেই
তবুও তাঁরা শুকনো কড়াইয়ে ভেজে খায়
খুঁড়ে আনা সেই ডাস্টবিন উদগত বহুমাত্রিক ব্যঞ্জন

আমি '৭৪' দেখিনি
জয়নুলের চিত্রকর্ম দেখেছি
একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন আমার
কোন আধুনিক মন্বন্তর?  

আমি জয়নুল হতে পারিনি
হৃদয়ের ক্যানভাসে ধারণ করেছি ক্ষুধার জ্বালা,
খাদ্যের অভাবে হাড্ডিসার পুরুষ;
হাড় জিরজিরে লালচেচুলো নারী;
দুগ্ধশুষ্ক মায়ের বুক- শিশুর কাতর কাতরানি!

চরম আহতের মতো
কেবল ভাবনার কলমে লিখে গ্যাছি সব-
তাঁরাতো 'রফিক আজাদ' হতে পারেনি
খাদ্যমন্ত্রী মন্ত্রীর গাড়িকে সিরিয়াসলি নেবে;
'সুকান্ত'-তো নয় পূর্ণিমা চাঁদকে রুটি ভেবে নেবে

তাঁরা...
তবু তাঁরাই-কী নয় সে' বুভূক্ষের দল
রঙান্ধ তাচ্ছিল্যে আজো বর্ণনার জ্ঞাতি
অথচ আমরা ক্যামন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি!!



ঘামের অভিঘাত


কাঠফাটা রোদে গেলেই বুঝা যায়
সজ্জিত জীবনের আর কিছু মানে
কথার শুভেচ্ছা আর ধানকাটা পেশির বিভাষা
একই ভূগোলে তবু পাশাপাশি মন ধরে হেটে দেখে না। 

সূর্যের নাঙা মুখ
এখানে রোদের আশীর্বচন রেখে গেলে
আরো কিছু বলা যায়-
রোদের গর্ভ খসা সময়ের দহন প্রসব-
খলার ফসল ভরে রচে যাওয়া অদৃষ্ট নামের প্রহসন। 



ঘামের স্রোতমূলে চোখ ভরা স্বপ্নের নোনা মিশে
গেলে, কেউ পুড়ে পুড়ে মূল্যহীন অমূল্য হয় শুধু
মুখভরে গ্রাস পুরা হলে তুমিও কৈফিয়তহীন 
ঘামের শুচিতে ভুগে মূলের কর্জ ভুলে যাও। 

হে কুসুমবিলাসী স্রষ্টা
কতো রঙের সওয়ারী তুমি হও
ছায়ায় বসে যে খেল- তাপের সাপেক্ষে সব
আয়েসের ভোজবাজি খেলা?

শ্রমের জীবনতো ভুলে কোনকালে মাঙেনাই 
অবহেলনের অসীম দুরাচার। 


ক্রুর বলয়


এই-যে জ্বালা--
শত সবুজের মাঝে দেখি বিদগ্ধ জননী আমার
ফসলি জমির বুকে কৃষকের আর্ত হাহাকার-
যে প্রান্তরে কেঁদে উঠে প্রতিধ্বনিহীন,
মৃত কৃষকের হাড়গোড়- দুর্ভাগ্যের হাতছানি হয়ে

সতত প্রসবকারী দেবতার ঋণ
যেন আগুনের ভিতরে কেরোসিন খেলা
অল্পবিদ্যের মতোই ভয়ঙ্করী এমন
আমার অল্প বিত্তের জ্বালা!

এই বাংলায় হে স্বপ্নবৎ মাটির কবিতা
তোমার কোন হেমন্তেই আমার শূন্য গোলা ভরেনি
যবে ফসলে বাণ এসেছে জমিনে আমার

আমিই স্রষ্টা মজদুর - আমি হাসতে পারি না!

-কোন উপহাস-
জন্মের সাথে জীবনের তীব্র ভ্রুকুটি হেলার
অদৃশ্য নিস্পৃহতায় সস্তা জীবন জীবন যাতনা!

হে বিগত বঞ্চনার মৃৎভাণ্ড কবি
তোমার বেদনাও ছিল অবিকল
যেমন আমায় ধ্বংস করে পুঁজির কবল?

এখন দুচক্ষে দুই...
না-কী পতনের মরিচিকা অভিশপ্ত একইরকম-

দেখি দেনায় দেনায় গড়া ফাঁসির মঞ্চে ক্রুর দেবতা
আর চেয়ে চেয়ে দেখবার আমজনতা!


সত্য উদ্ভাস


জমাটবাঁধা রক্ত
কোথাও রক্ত ছোপ ছোপ
যেন ছন্দোবদ্ধ মিছিল লিখেছে কেউ
যেন সবটুকু উগড়ানো গরল বয়ে গেল কারো
আফসোস অচিন্ত্য দ্রোহের কবিতা

যারা ভাবেনি
কখনো তাঁরা বিদ্রোহী হতে পারে
হতে পারে রক্তোৎপল জ্বলন্ত শব্দোপমা
তাঁরাই হঠাৎ লিখে গেল প্রতিদিন লিখে যায়
বিকচ বিদ্রোহ জাগা স্বর

মরে গিয়ে আনমনে; উধাও হয়ে আচানক
বহুতল পাপ ধসে পিষ্ট হারার পূণ্যমতি
কখনো বিদগ্ধ হয়ে রূঢ় দাহনে

যেমন বোঁটাখসা ফুল নিভৃতে ভেসে যায়
পৃথিবী অনার্দ্র কোন গোপন আর্তির জলে

কোন খোঁজ নেই
লাশের ভাগাড়ে লাশ হয়ে মরি রুটি রোজ নেই

আমাদের উপহার ছিল ছুঁড়ে মারা স্যাডিস্ট আগুন
আমাদের উপহার ছিল তুরাগের জলে
চক্ষুহীন ভেসে আসা কৈশোর আমার
আমাদের পাওনা ছিল-
বাড়ন্ত মেঘ এর থেকে ছায়ার গর্ভ কেড়ে নেয়া!

পাওনা ছিল ভাইয়ের ধ্বংসে ভাই
বিনিময় টেনে যাবে- 'অর্থদন্ডে জীবন'
কথিত কথকতায়ঃ প্রলম্বিত নগ্ন মানবিকতার;
প্রলম্বিত কৃষ্ণ বিবরে অদৃশ্য 'ক্ষমতা'

তাই জমাট রক্তে আজ
অসংখ্য জীবন এসে জমে
ছোপ ছোপ মৃত্যু গড়ে তোলে
জীবন-প্রশান্ত বীজতলা
আর তিলেতিলে রচে যায় দ্রোহের পঙক্তিমালা


ভাঙার প্রণতি


কান্নায় যদি ক্ষত না মুছিলো
কেন শুধুশুধু ঝরবে আঁখিজল বলো!
তার'চে কী ' ভাল নয়
এতো সহজে মেনে নেব না পরাজয়
প্রত্যয়ে এসো দ্রোহ জাগি বারবার


মগজে মেজাজ হানে হৃদি তলোয়ার
চাওয়া যদি না' পাবো সুললিতে
কেন তবে মিছেমিছি ফুলকলিতে
সাজাবো শ্রদ্ধার্ঘ কথিত মুনিবের তরে
কেন ভক্তি করবো তা'কে মাথার পরে
তার'চে কী ' ভালো নয়
অবাধ্য বিকারে মুছে হৃদয়ের ভয়-
কিছু টগবগে রক্ত- বয়স আঠারো বছর
কিছু হার না মানা ধী- প্রলয়ঙ্করী ঝড়
কিছু পিছুটানহীন- ভুলেই সত্য অভুল
কিছু জিয়নকাঠি- বরমান্য হারার দু'কুল
কিছু মৃত্যুর ধুনসত্য পরোয়াবিহীন
কিছু প্রেমের শ্বসন লাল অমলিন 
কিছু সমস্বর- আদিগন্ত সূর্য কোরাস
কিছু সত্য হৃদয় নিরত নির্ভীক- ত্রাস!
কিছু উদ্ভেদী ক্রোধ কিছু অপমান
কিছু মুষ্টিবদ্ধ হাত- খোলা আসমান
কিছু উদ্ধত কবিতা- শব্দ মেশিন
কিছু ঝলমলে আলো পক্ষের দিন
তারপর শুধু সময় ব্যাপার
ফুল টাইমিং, হ্যাচকা টান;
মটকানো শোষকের ঘাড়!


বিস্তারিত অন্ধতাটুকু

 

টেনেটুনে বয়ে নেয়াই যায়
তা'কে নিতে নিতে এই পথে গাঁথা হয় সজীব
উপহাস- উদ্ধত দ্রষ্টার লুকনো সত্যকারণ-
প্রজাপতির সাথে জুড়ে দেয়া ফাঁকিহীন খাঁচার প্রণতি। 

চলতে চলতে না বলেও শ্রোতাহীন
কতো গল্প কল্প বলে ফেলা যায়
তা'কে বলতে বলতে দেখি শব্দের পৃথিবীতে
আমারই ঝাপটানো সমগ্র প্রতিধ্বনিহীন-
নিজেকে ঠেলে দিয়ে ঠিকানাবিহীন হাসিপথ
তবু হাসতে গিয়েই দেখি ভাবের মৃদঙ্গ নামে
কর্কশ বেজে উঠে মানুষের ঈর্ষা মোকাম-

সুরের খোঁজ এর পাশে উদ্দিষ্ট দেখা মেলে
ধারাটি রুদ্ধ হওয়া নদীর কষ্ট আমরণ

দেখতে দেখতে কতো মূলতই অদেখাকে সাধি
কিছুই দেখিনি বলে যতোটুকু গল্প ফেঁদেছি-
আমারই খন্ডিত পান্ডুরতার জার্নাল- মানুষের
মাঝে প্রেমের উন্মিলিতি বুকে নিয়ে দেখি
আলগা হাওয়ায় ভাসে সত্যের প্রতিনামে
সক্রেটিসের কী বিচার-

না দেখেই সর্বোচ্চ প্রত্যক্ষে তুমি;
সব দেখেশুনে কবে আমিই চক্ষুষ্মান হলাম!

গাইতে গাইতে কতো মনেদের সুসমীকরণ
ভালবাসার মাটির মূলে সস্তার সঙ সেজে আছি
পাশ ফিরে দেখে গিয়ে- কেমন লীন হয়েছে
আলো- হৃদয় দলিত করে বেদনা উড়িয়ে যাওয়া
স্বার্থপুরের কালোনীল। 

উদার বৃষ্টি পরে আপন বিলিয়ে তবু প্রতিবার নতুন


পেয়েছি- সকল আয়নাখানি মাতালের মেকি ধরে
আছে- কোনদিন বুঝেনাই নিজেকে বিচারের ঋণ

এক বেহালার কাছে কী করে সমাহিত কাঁদে
আকাশ সমুদ্র কতো পার্থক্যহীন

নিজেকেই ভুলে ভেবে দেখি-
মরুর সাইমুমে আত্মহারার কতো বিপন্ন অনাসৃষ্টি
ভাল বেসে বেসে বাসতে না-পারার কী ধুলাফুল-
তোমার অনল ভরে তাপের প্রস্ফুটনে আসি
পথের দাঁড়ার মাঝে খড়কুটোর অগৌরব!

রঙচটা নিধি সম-আচারে সময়ের প্রতিবিম্ব
যদি- দেখাদেখি ভুল আছে- কেবল জিতে যাওয়া
আছে; ছাড় নেই কেন-যে কোথাও স্বেচ্ছায় পরাজিত হবো- এমন আনন্দভাতি নেই

এই গ্রস্ত ঘোর সব দেখার নামান্তে অস্থির-
নিজেকে দেখে না বলে, লোকে যারে সুস্থির
আয়না বলেছি; সব'চে জানার অলোক বলেছে-
এমন এক অন্ধতা- মানুষ জীবন!




No comments

Powered by Blogger.