না ফেরা: ডলি মনিরের গল্প

না-ফেরা

ডলি মনির











যে হারে  গ্যাসের দাম বেড়ে  চলছে তাতে চুলার  পরিবর্তে পেটে আগুন ধরিয়ে বসে থাকতে হবে, এভাবে  দাম না বাড়িয়ে বরং ক্ষুধার আগুনে  পুড়িয়ে  দেওয়া হউক আমাদের মতো সাধারনদের, বিদ্যুৎ গ্যাস দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে আমাদের কী কিছুই করার নেই, আমরা কেনো তবে রাজনীতি করবো, সামান্য একটা প্রতিবাদ কর্মসূচি দিতে না পারলে  আমাদের রাজনীতি ছেড়ে আটটা পাঁচটার সরকারী চাকর হয়ে যাওয়া উচিত,  পার্টিমিটিঙে  রাহাতের জ্বালাময়ী বক্তৃতার পর টনক নড়ে সবার, তুমুল হট্রগোলের মাঝে  কর্মসুচী ঘোষনা করা হয় আগামী সোমবার অর্ধদিবস  অবরোধ কর্মসূচী পালন করা হবে। 

পুলিশের ধড়পাকড়  শুরু হয়ে যেতে পারে, কিছুদিন বাসায় যাওয়া যাবে না । পুরু দেশে  এই কর্মসূচীর কোনো প্রভাব পড়বে না হয়তো, দলের সে ক্ষমতা নেই, শহরের মেইন পয়েন্টে যাতে  কিছুটা হলেও কর্মসূচীর প্রভাব বিস্তার করা যায় তাই কর্মীদের সাথে  আলোচনা করে  উপায় বের করতে চায়। পার্টির কাজের পরে  এলোমেলো কিছুক্ষণ  ঘুরে সিদ্ধান্ত নেয় সুখির বাসায় যাবে, হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকে।
সুখি সুখি চেহারার মেয়েটি ভেতরে অবর্ণনীয়  দঃখ পুষে  রাখে, চরম দারিদ্রতার  ভেতর টিউশনি করে মাস্টার্স  পাশ করেছে তারপরে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য ধর্ণা দিতে দিতে যখন ক্লান্ত, যখন মনে হয়েছিলো আর কোনো সম্ভাবনাই নেই তখনি রাহাতের সাথে পরিচয়, রাহাতের  সহযোগীতায় ভালো একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরিও হয়ে যায়, স্কুল কেরানী বাবার কাছে সুখির চাকরি হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ছিলো, বড় দুই ভাই যে যার মতো জীবন গুছিয়ে নেয়, সুখি তার বাবা মাকে নিয়ে সংসার পেতেছে একতলার ভাড়াটিয়া বাসায়।
হেঁটে হেঁটে সুখির বাড়ি পর্যন্ত আসতে কাঁটায় কাঁটায় পয়তাল্লিশ মিনিট সময় লেগেছে, রাহাত ঘড়ি দেখে প্রায় এগারোটা, এতো রাতে  দরজায় নক না  করে সুখিকে ফোন দিয়ে দরজা খুলতে বলে, খুব সাবধানে আশেপাশে কেউ আছে কিনা দেখে নিশ্চিত হয়ে দরজা খোলে, রাহাত দ্রুত ঘরে ঢুকে যায়, ”তুমি ! এতো রাতে ! খাওয়া দাওয়া  করেছো নাকি না খেয়েই আছো  “কিছু খেতে পারলে ভালোই হতো, আগের খাবার হজম হয়ে গেছে, খাবার থেকে শুরু করে টাকা নিতেও  রাহাতের  কোনো রকম দ্বিধা  নেই, উড়নচণ্ডি জীবনে সুখি  আশির্বাদস্বরূপ, সমস্ত কথা কষ্টরা সুখির কাছে এসে মুক্তি পায়, সুখির কাছে কোনো কিছু শেয়ার না করলে নিজেকে হাল্কা করতে পারে না। 
ভাত আর ডিম ভাজি নিয়ে এসে, এইটুকুই খেতে হবে বলে হাসতে থাকে।
রাহাত বুঝতে পারে সুখি ভাত রেঁধে ডিম ভেঁজে নিয়ে  এসেছে , কোন কথা না বলে হাত ধুঁয়ে খেতে বসে, 
কি ব্যপার কিছুই বলছো না যে। 
একটু টেনশনে আছি পার্টির কর্মসূচী নিয়ে , পুলিশের ধড়পাকড় হতে পারে। 
ভালোইতো, জেলে যাবে, বড় নেতা হবে, এম পি হবে, ভবিষ্যৎ এমপি কী আর আমাকে গণায় রাখবে। 
ঠাট্রা করছো মনে হয়। 
ঠাট্রা না; ভয়, যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও সে ভয়টা ভেতরে দানা বেঁধে থাকে। 
আমাদের পার্টির  কথাতো জানোই, নির্বাচনে জামানত হারায়, এমন পার্টির নেতা হওয়া মানে ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানো। 
সুখির মুখে করুণ ভাব ফুটে উঠে। 
মন খারাপ হলো বুঝি,
ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে, স্বামী সন্তান সংসার এসবতো সব মেয়েরই স্বপ্ন। 
অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলো,  আমিতো এ কূলেরও না ওকূলেরও না, আমি কূলহীন নদী শুধু জল আর জল। এখানে পা পিচ্ছলে ডুবে যাবে।  

আমিতো ডুবতেই চাই কিন্তু নদীতো আমাকে ভাসিয়ে রাখে। 

ওদের  কথারা  এগিয়ে যায় গদ্য পদ্য ছন্দাতীত  প্রেমে। 
আজকের রাতটা এখানেই কাটিয়ে দেই, কী বলো। 
যদি ইচ্ছে হয় থাকো, কিন্তু খুব ভোরে কেউ দেখার আগে বের হতে হবে, না হয় বদনাম হবে এখানে আর থাকতে পারবো না। 

হুম , রাহাতের দীর্ঘতর নিঃশ্বাস,

এতবড়ো দীর্ঘশ্বাস !এতোখানি দুঃখ আড়াল করে  রাখো! ঘুমাও , সকালেতো  দৌড়ের উপর থাকবে ,এ কথা বলে সুখি যখন বের হতে নিলো রাহাত হাতটা ধরে নিজের ঠোঁটে  ঘষতে থাকে, সুখির চোখে পানি এসে যায়, আবেগের আহ্লাদে, তোমাকে অনেক কিছু বলতে চাই, তোমার মন খারাপ হবে সে ভয়ে বলি না। 
বলো, আজ আমি সবকিছু শুনবো, কেনো জানি তোমাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করছে এতো বেশি কাছে  যে .......এ কথা বলে সুখিকে বুকের উপর শক্ত করে  চেপে ধরে ,চুলের  ভেতর নাক ডুবিয়ে রাখে। 

রাহাত 

বলো

আমরাতো বিয়ে করতে পারি,

হুম ,করবো। 

কবে করবে। 

যখন সময় হবে। 

কখন সময় হবে,

যেকোন সময়, কালও হতে পারে। 

কাল কীভাবে হবে , তুমি মিছিল করবে নাকি বর সেজে বসে থাকবে। 

কর্মসূচীর পর। 

সুখি খুশি হয়ে যায়, সত্যি। 

সত্যি , রাহাত সুখির সুখি চেহারাটার  দিকে তাকিয়ে থাকে। 

এখন ঘুমাও , না হয় কালকে অবরোধ করার এনার্জি পাবে না। 

ভোরের আলো ফোটতে না ফোটতেই  রাহাত  বের হয়ে যায়, মনে  নানা রকম চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, কত মানুষ গুম খুন হয়ে যাচ্ছে যদি আজ আমার কিছু হয়ে যায় তবেতো আর মাকে দেখতে পারবো না, হঠাৎ ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠে, আহা ! আমার মাকে কেনো শান্তি দিতে পারলাম না! চোখ ভিজে উঠে । দ্রুত বাসায় চলে আসে, রাহাতের মা কান্না জড়ানো কন্ঠে বলতে থাকে, 
বাবা রাতে বাসায় ফিরস না কেনো ? আজ আবার মিটিং মিছিল নিয়ে পড়ে থাকবি, দুঃশ্চিন্তায় ঘুম হয় না, কবে জানি তোর জন্য স্ট্রোক করি। 
রাহাত কিছু না বলে মায়ের কাছ ঘেঁষে বসে থাকে,
আজ না গেলে হয় না, রাস্তায় গন্ডগোল লাগতে পারে, তুই বাসায় থাক বাবা, তুই যা খেতে চাইবি তাই রান্না করে খাওয়াবে, মায়ের করুণ আকুতি,
রাহাত এসব কথা এড়িয়ে বাবার কথা জিজ্ঞেস করে , আব্বা কোথায়,
তোর বাবার শরীরটা ভালো নেই , ঘুমের ঔষুধ খেয় ঘুমাচ্ছে। 
রাহাত  বাবার রুমের দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, হাড়-জিরজিরে  মুখটা দেখে মায়া হয়,ছোট বেলার মতো বাবার কোলে উঠে বসে থাকতে ইচ্ছে করে ,ছুঁতে ইচ্ছে করলেও না ছুঁয়ে বের হয়ে যায়। 
কর্মসূচী  পালনের জন্য  তোড়জোড় শুরু হয়, ফোনের উপর ফোন আসতে থাকে, রাহাত কিছু কর্মী নিয়ে শহরের মেইন পয়েন্টে অবরোধের চেষ্টা করে , যতটুকু ভাবে নি তার চেয়ে বেশি রেসপন্স পাচ্ছে, পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাচ্ছে ভেবে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে, কর্মীরাও ইট পাটকেল ঢিল ছুঁড়ে, ধড়পাকড়  গোলাগুলির ভেতর রাহাত হারিয়ে যায়। কেউ বলে গুলি  লেগেছিলো লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে, কেউ বলছে পুলিশ রাহাতকে তুলে নিয়ে গেছে। 

দিন যায় মাস যায় বছর পেরিয়ে বছরে  সুখি ও রাহাতের মায়ের অপেক্ষার প্রহর ফুরায় না।

No comments

Powered by Blogger.