সুকন্যা: মাহবুবা স্মৃতির গল্প


সুকন্যা

মাহবুবা স্মৃতি




মাহবুবা স্মৃতি - আগুয়ান - Mahbuba smrity - agooan
মাহবুবা স্মৃতির গল্প: সুকন্যা: আগুয়ান





"মা আমার আর কারো সামনে এভাবে সেজে যেতে ভালো লাগে নাতুমি বাবা আর ভাইয়াকে একটু বুঝাও..."
-"ভালো লাগে না কি? সারাজীবন ঘরে আয়বুড়ো হয়ে থাকবি নাকি?" মেয়ের কথা শুনে রেহেনা খাতুন ধমকে উঠেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে একগাদা বিষাদ কোথা থেকে জানি এসে জড়ো হয়। চাপা দীর্ঘশ্বাস কোনোভাবে আটকে রেখে মেয়ের সাজগোজ দেখেন

"দেখি চুলগুলো আঁচড়ে দেই।" রেহেনা মেয়ের হাত থেকে চিরুনি নিয়ে এবার নিজেই যত্ন সহকারে চুল আঁচড়ে দিতে থাকেন
"পাত্রপক্ষের সামনে যাবি না যাবি না বললেই কি হয় মা? যেতে তো হবেই। একদিন তোকেও সংসার করতে হবে। খুব ইচ্ছে, তুই টুকটুকে লাল রঙের শাড়ি পড়ে শ্বশুরবাড়ি যাবি।" রেহেনার কণ্ঠ নরম হয়ে আসে
-"মা তুমি আবার কাঁদছো!"
-"কই না তো!"
"দেখি..." সুকন্যা উঠে গিয়ে মায়ের দিকে তাকায়। "এই যে তোমার চোখে পানি। কতোদিন তোমাকে নিষেধ করেছি, কাঁদবে না। তবুও…"
-"আচ্ছা, আর কাঁদবো না। আরেকটু সেজে নে।"
-"হয়েছে, আর সাজা লাগবে না। বেশি সাজগোজ করতে গেলে বসার ঘরের লোকজন পালাবে। আগে পালাতো মেয়ে দেখে, এখন পালাবে সাজ দেখে।" কথাটা বলেই সুকন্যা হেসে দেয়। মেয়ের হাসি দেখে মন ভরে যায় রেহেনার। কিসব সূরা পড়ে মেয়ের মাথায় ফুঁ দেন
"কি হলো, তোমার সাজগোজ? নাকি আরো সময় লাগাবে? ওদিকে মেহমান তো চলে যাবে!" 

সুকন্যার ভাবী শিরিন এসে তাড়া দেয়। বিরক্তির ছাপ চোখেমুখেরেহেনা দ্রুত বলেন, "না না হয়েছে মা। তুমি নিয়ে যাও ওকে।" মেয়েকে নিয়ে চলে গেলে রেহেনা চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস এবার আর ধরে রাখতে পারেন না। একটা চেয়ারে বসে পড়েন। বড় ছেলে সজলের পর সুকন্যার জন্ম। যেদিন সুকন্যার জন্ম হয়, সেদিন ওর বাবার প্রমোশন হয়েছিল। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে প্রমোশন অনেক বড়কিছু। মেয়ে সংসারে আলো হয়ে আসে। তাই মিনহাজউদ্দিন মেয়ের নাম রাখেন সুকন্যা। এরপর স্বপ্না আর জুঁই এর জন্ম হয়। ছোট দুই মেয়েরই ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে সজলকেও বিয়ে করানো হয়। কিন্তু সুকন্যার বিয়ে দিতে তাঁরা কোনোভাবেই পারছেন না। এই নিয়ে মিনহাজউদ্দিন এবং রেহেনার মনে দুঃখের কমতি নেই! ‍কারণ মেয়ের বয়স ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। আশেপাশের মানুষ কথা শুনালে যতোটা না খারাপ লাগে, ঘরের মানুষ শুনালে অনেক বেশিই যন্ত্রণা দেয় সে কথা। মেয়ে তো বাবা-মার কাছে সবসময়ই রাজকন্যা, তা দেখতে যেমনই হোক!

"দাদিমা, মা তোমাকে বসার ঘরে যেতে বলেছে।" রেহেনা চমকে রায়ানের দিকে তাকায়
"হ্যাঁ যাচ্ছি দাদুভাই।" রেহেনা বসার ঘরে গিয়ে দেখেন, মেহমানরা চলে গেছেন। খাবার সব টেবিলের উপর ছড়ানো ছিটানো। শিরিন অনবরত কিসব বলেই যাচ্ছে। কিন্তু সুকন্যা কিংবা সজলের বাবা কাউকেই দেখতে পাচ্ছেন না
বাধ্য হয়ে শিরিনকেই জিজ্ঞেস করেন, "মা, মেহমানরা কি সবাই চলে গেছে?"
-"না, আপনার মেয়েকে দেখার পর তাঁরা এখনো থাকবে! আমার হয়েছে যতো জ্বালা। দু’দিন পরপর মেহমান আসবে, আর এতোগুলো টাকা খরচ..."
-"তুমি এমন কথা বলতে পারলে শিরিন!"
-"তো কি বলবো শুনি? আপনার মেয়ের দুর্বল দিকের কথা আপনাদের তো জানা। দুদিন পর পর পাত্রপক্ষ না নিয়ে আসলে কি হয়? আর আনেনও তো উঁচুদরের পাত্র! তাঁরা আপনাদের বয়স্কা, কালো মেয়েকে কেন ঘরে তুলবে শুনি? তাছাড়া আরেকটা বড় দোষও আছে।"
-"চুপ করো মা... এমন কথা শুনলে মেয়ে কষ্ট পাবে... মনে হয় পাশের রুমেই..."
"দাদিমা, ফুপু তো ছাদে।" পাশ থেকে রায়ান উত্তর দেয়। রেহেনা এবার ছাদের দিকে তাকায়। শিরিন এরপর কি সব বকে যাচ্ছে, কোনো কথাই তাঁর কানে ঢুকছে না
'
সুকন্যা ছাদের একটা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দু’তলার এই বাড়ির ছাদটা খুব বেশি বড় না হলেও সুকন্যার ভীষণ পছন্দের জায়গা এই ছাদ। সে ছাদে যত্নে অনেক ফুলের গাছও রোপন করেছে। কিন্তু আজ তাঁর দৃষ্টি অনেকদূর। চারপাশটা কেমন ধূসর লাগছে ওর কাছে। এই নিয়ে ঊনচল্লিশটা বিয়ে ভেঙেছে সুকন্যার। প্রথম প্রথম ওর খারাপ লাগলেও এখন আর তেমন খারাপ লাগে না। আবেগগুলো ফুরিয়ে গেছে। ওর এখন যেটা খারাপ লাগে, সেটা হলো ওর ভাবীর কটুকথা। সুকন্যা স্কুলে জব পাবার পর ওর সামনে এখন আর তেমন কিছু না বললেও ওর মাকে অনেক কথাই শুনতে হয় যখন তখন। সুকন্যা বিয়ের আশা ছেড়ে দিলেও ওর বাবা-মা এখনো আশা ছাড়েননি। মানুষজনের সামনে সুকন্যার এখন যেতে আর একদমই ইচ্ছে করে না। শুধুমাত্র ওর বাবামাকে খুশি করার জন্যই পাত্রপক্ষের সামনে যাওয়া। আড়ালে বিভিন্ন কথা শুনে মানুষের, সেসবও শুনতে ইচ্ছে করে না ওর

মাঝে মাঝে সুকন্যার কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। অথচ এমনটা হবার কথা ছিলো না। সুকন্যাও আর পাঁচটা মেয়ের মতো কারো বউ হবার স্বপ্ন দেখেছে একটা সময়। ওরও একটা সময় খুব ইচ্ছে করতো কাউকে খুব ভালোবাসতে, কারো কাঁধে মাথা রেখে সময় পার করতে, কারো বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে। এমন দিন এসেছিল একবার সুকন্যার জীবনে! কিন্তু ঝড়ের গতিতে তা ভেঙেও গেছে দ্রুত। বছর পাঁচ-ছয় আগের কথা। ছেলে সুদর্শন ছিল। জব করতো। ছেলের বাবা-মা একটু লোভী টাইপের হওয়ায় তিনলাখ টাকার বিনিময়ে কালো মেয়েকেই ঘরে বউ করে তুলে নিতে রাজী হয় এবং ঐদিনই কাবিন হয় সুকন্যার হুমায়ুন নামের ছেলেটার সঙ্গে। পরে অনুষ্ঠান করে বউ ঘরে তুলবেন এমন প্রতিশ্রুতিও দেন পাত্রপক্ষ। আজকাল প্রতিশ্রুতি দেয়ার মধ্যেও তা ভাঙনের একটা শপথনামা লেখা হয়ে থাকে। এখন আর কেউ প্রতিশ্রুতির মূল্য রাখে না। সুকন্যারও আর বরের বাড়ি যাওয়া হয় না। ওর স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। পাত্রপক্ষ দু’দিন পর সব লেনাদেনা চুকে বিদায় নেন

সুকন্যা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। পাশের ছাদে ওর দৃষ্টি নিক্ষেপ হয়। ও চেষ্টা করে ওখান থেকে চোখ সরাবার, কিন্তু পারে না। যা কারো জন্য নিষিদ্ধ দেখা, সেখান থেকে হাজার চেষ্টা করেও দৃষ্টি ঘুরানো সম্ভব নয়। বরং দূর থেকে হলেও সেখানে দৃষ্টি পড়বেই। সুকন্যার ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়। পাশের বাসার শারমিন ভাবী ছাদে কাপড় নিতে আসেন। হঠাৎ ওনার বর এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে শারমিনকে। সুকন্যা একটু আড়ালে চলে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে তা দেখতে থাকে। সে দৃষ্টিতে খারাপ কিছু নেই; বরং মুগ্ধতা থাকে। গোধূলির রং ছেয়ে মিশে গেছে সেই মুগ্ধতাকিন্তু বেশিক্ষণ থাকে না এই মুগ্ধতা। হঠাৎ করেই পাশের ছাঁদটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। সুকন্যার মনের ভেতরটাও তেমন। ওর ভিতরকার আস্তরণ খসে পড়ছে কেবল
"কিরে মা? সন্ধ্যা হয়ে গেলো... এখনো ছাদে দাঁড়িয়ে আছিস!" রেহেনা মেয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলেন
-"সন্ধ্যার আকাশটা আমার ভীষণ প্রিয়, তুমি সেটা জানো মা।"
"সন্ধ্যার সময় এভাবে চুল আলগা করে দাঁড়াতে নেই মা। অমঙ্গল হয়। আর তুই তো এখনো পোশাক চেঞ্জ করিসনি! যা, রুমে যা।"
-"রুমে যাবার সময় শেষ হয়ে যায়নি মা। অনেক সময় পড়ে আছে। আগে আমার পাশে এসে দাঁড়াও তো। তোমাকে দেখি।"
-"কিসব কথা বলে মেয়ে। আমাকে দেখার কি হলো শুনি?" রেহেনা অবাক হলেও মেয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়
-"মাকেই দেখতে হবে প্রথম। মেয়ের আরেকটা বিয়ে ভাঙলো, আদরের বউমার কথা শুনে চেহারা কেমন হয়েছে, দেখা দরকার না!" সুকন্যার কথা শুনে রেহেনার ভিতরটা ফুঁপিয়ে উঠে। কিন্তু নিজেকে সামলিয়ে দ্রুতই বলেন, "আরে নাহ! কি যে বলিস! তোর ভাবী আজ কিছু বলেনি।"
-হ্যাঁ সেটা তোমার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আচ্ছা মা, জানোই তো... আমি দেখতে তেমন ভালো না। একটা দোষও আছে। তারপরও কেন বাবা বিয়ে নিয়ে আসে! তোমাদেরকে ভাবী কটু কথা শুনায়, এটা শুনতে আমার একদমই ভালো লাগে না।" অভিমান ঝরে পড়ে সুকন্যার কথায়
-"মা হলে বুঝতিস, মায়ের কি যন্ত্রণা! আর মেয়ের জন্য বাবার কষ্টও বেশি থাকে।"
-হাঁ, বুঝলাম... এখন বলো তো, গতকাল ভাবী তোমার আর বাবার কাছে কি বলেছেন?" সুকন্যার চোখে মুখে কৌতুহল। মুখটাও হাসি হাসি। মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন রেহেনা, তারপর বলেন,
"কই, কিছু বলেনিতো তোর ভাবী!"
-"মা মিথ্যা বলবা না, রায়ান বলেছে, কোন এক পাগলের সঙ্গে নাকি আমার বিয়ে দেবার পাঁয়তারা করছে ভাবী!" সুকন্যা হেসে দেয় কথাটা বলেই
-"তুই এটা নিয়ে ভাবিস না মা
আমরা বেঁচে থাকতে কোনো পাগল, মদখোরের সঙ্গে তোর বিয়ে দিবো না।"
-"পাগলের সঙ্গেই বিয়ে দিয়ে দাও মা। অন্তত তোমাদের আর কথা শুনতে হবে না।" সুকন্যা আবার হাসতে থাকে। রেহেনা খাতুন সহজ সরল মানুষ। জটিল কথা বুঝেন না তেমন। তিনি এটাও বুঝতে পারেন না, মেয়ে সব কথায় এরকম ইয়ার্কি কেন করে! তাই ধমক না দিয়ে পারলেন না
"সুকন্যা! কথা তুই বলতে পারলি!"
-"কি বলবো মা? আমার আর কিছুই ভালো লাগে না। তোমাদের ঘরের মানুষ, পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজন সবাই এসে কথা শুনায়... আমার এসব কিছুই ভালো লাগে না। রাগ হয় উপরে যিনি আছেন, তাঁর উপর। এতো বৈষম্য দিয়ে তৈরি না- করতে পারতেন!" সুকন্যার গলা ধরে আসে এবার
-"এমন কথা বলতে নেই মা, আল্লাহ নারাজ হবেন। সময় সব ঠিক করে দিবে।"
-"সে সময়টা আমার জন্য নয় মা। আমার সত্যিই আর মানুষের সামনে যেতে ভালো লাগে না মা।" সুকন্যা মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। রেহেনা খাতুনের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে যেতে থাকে। সুকন্যা কখনো কাঁদে না। সবকিছুকে সহজে মেনে নিতে পারে এমন মেয়ে হিসেবেই জানেন ওনি। কিন্তু আজ নতুন এক মেয়েকে আবিষ্কার করেন। যে মেয়ের মন আছে, কষ্ট আছে, আবেগ আছে। মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন
"কাঁদিস না মা... তুই ভেঙে পড়লে আমাদের কি হবে!" তবুও সুকন্যা কেঁদে যায়। মিনহাজউদ্দিন মা-মেয়ের খোঁজে ছাদে এসে দেখেন দু’জনই কাঁদছে। এমন দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। তবুও এগিয়ে গেলেন মা-মেয়ের দিকে। কারণ মেয়ের কষ্ট বাবা-মার মনে ভীষণ পীড়া দেয়
সন্ধ্যার আকাশে আযান পড়েছে। কিছু পাখি নীড়ে ফেরার পাঁয়তারা করে উড়ে যাচ্ছে। দূর থেকে পেঁচার ডাক শোনা যায়, এদিকে ছাদে দু’জন মানুষের অশ্রুর বিনিময় হচ্ছে... আর মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন পরমপিতা! সুকন্যা অশ্রুসিক্ত নয়নে বাবার দিকে তাকায়








No comments

Powered by Blogger.