শাহিন চাষীর একগুচ্ছ কবিতা

শাহিন চাষীর একগুচ্ছ কবিতা




আগুয়ান - কবিতা - শাহিন চাষী - Agooan - Kobita - poem - Shahin chashi
শাহিন চাষীর কবিতা



তৃষ্ণার ঢেউ 


একদিন খুব করে চেয়েছিলে--
আমার সব অবসরে জুড়ে গোপনে- প্রকাশে
শব্দের সাথেই যাবতীয় সখ্যতা হোক
যতবার শুনেছি কথা,
যতবার দেখেছি সরল মুখে তরল আকুলতা,
আমি হয়েছি শূন্যের অবুঝ শিশু
অথবা গহীন বনের ব্যাকুল কোন ফুল
একদিন পরাজিত চোখ
হঠাৎ দেখে- পথের ধুলোয় গোলাপের লাশ;
পাপড়ির কঙ্কালের চাপায় তুমি,
তোমার বুক ফুড়ে স্বপ্নের সবুজ চারা!
কবিতার সাথেই আড্ডা এখন,
তামাক সন্ধ্যায়- নিকোটিনের ধোঁয়ায় ওড়ে
কত বিচিত্র শব্দ- পঙক্তি- পদাবলী,
শুধু অনুভব ছুঁয়ে ছোঁয়ার ওপারে তুমি!
আমি তো রেখেছি কথা,
কবিতা বিহীন কিছুতেই চলে না আর;
তোমার জন্যে শব্দের মনে করুণ হাহাকার!



অসুখ


অতন্দ্র চোখ,
মাটিতে জীবনের ঘ্রাণ- স্বপ্নের আয়োজন,
তবুও শূন্যতায় আফিম নিমগ্ন মন!
পাশেই উপল নদী,
অদূরে সবুজ ঘেরা বিমূর্ত পাহাড়,
মাথার উপরে কারুময় নক্ষত্রের আকাশ;
আমার রক্তকণায় মাদকতা,
আমার লোমকূপে চঞ্চল শিহরণ,
আমার নিঃশ্বাস ঘণীভূত- ভারী দীর্ঘশ্বাস!
ঝিঁঝিঁদের কোরাস সুরহীন-
রাখাল বাতাস প্রাণহীন-
বনের বালিকা ফুল শ্রীহীন, গন্ধহীন...
মুমূর্ষু পৃথিবী- অচল সময়- উদভ্রান্ত হৃদয়,
বুকের গভীরে ব্যথা- অব্যয়, অক্ষয়!
ভাবনায় তুমুল বিভ্রাট-
সাজানো ঘরে মাকড়সার সুখের সংসার,
উঠোন ঘাস-- তাঁবু ফেলে গাঢ় অন্ধকার




চিত্রপট 


দীর্ঘশ্বাসের বাতাসে-
কিছু সকরুণ স্বর আর গোঙানির ধ্বনি
একটানা ভেসে যাচ্ছে সারাক্ষণ...
আমার উর্বর মাটি
ক্রমশ যেন এক অচেনা, ক্ষুধার্ত রাক্ষস
আঁধারের উদরে অসহায় আলো
সবুজ আঁচল জুড়ে হলুদের গাঢ় দাগ
সময়ের বুকে তবুও পতপত--
রক্তে লেখা বিচিত্র রঙিন পোস্টার..
চোখ মেললেই
পায়ের তলাতে কেবলই বেওয়ারিশ হাড়
স্বপ্নের কপালে শঙ্কার আলপনা
দস্যুতার মোকামে অধিকার নিলাম
আফিম নিমগ্ন দেবতা, ঈশ্বর
ব্যথার সাথে দৈন্য চাটে নাগরিক বিড়াল...
চারিদিক নীরবতা,
নীরবতা মানেই ক্ষ্যাপা গর্জনের পূর্বাভাস
আমি দেখছি সংক্ষুব্ধ গেরিলা মিছিল..




বিষবাষ্প 


অবাক হবেন না,
যা কিছু বলছি- একদম সত্যি বলছি,
পাগল হতে বাকি নেই খুব বেশি!
মুমূর্ষু মানবতা
ধর্ম ক্রমশ রেসের উন্মাদ ঘোড়া,
আকাশে- মাটিতে সারাক্ষণ
রক্ত খুনের ঘুমহীন উগ্র উলুধ্বনি
গোপনে- গোপনে
সুরভির অধিক সৌন্দর্য মূল্যবান,
মাঠে- জলাশয়ে দিন-রাত
আফিম আর মদের শিল্প উৎপাদন
সভ্যতার সুনগ্ন বেশ
বস্ত্র ব্যবসায় লোকসানের ছায়া,
বাণিজ্যিক হাটে হাসি- খুশি
জন্মনিরোধক পিল, ডটেড কনডম
গৌণ বাণী- সুর
স্তন নিতম্বেই কারুময় সংগীত,
মাথা কেটেই অবিশ্রাম
কবিগণ পড়েন কূটচালের ব্যাকরণ
সত্যি বলছি, সত্যি,
এখানে এখন একেবারেই মূল্যহীন-
বিবেক, বোধ, মেধা, মনন...




জ্যোৎস্না স্নান 


কাল রাতে,
আশ্চর্য অবলীলায় হঠাৎ বৃক্ষ হলাম--
শূন্যতার ছায়া ঘেরা নিঃসঙ্গ গড়ের মাঠে
ঝিঁঝিঁর অপূর্ব মীড়,
নিশাচর শৃগালের ভীতিহীন চলাচল,
সুনসান ঝোঁপের ভেতর সতর্ক হুতুম পেঁচা,
আর পোয়াতি জোছনার নিঃশব্দ স্রোত:
চোখের প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র--
আমার সমাজ- সভ্যতা- স্বদেশ- পৃথিবী!
ইরাবতী চাঁদে পরিচিত মুখ,
ঝরা শিশিরে পুরাতন স্পর্শের লিরিক,
অভিমানের পাতনে মনমরা অশ্রু,
আর ব্যথার গলনে দীর্ঘশ্বাসের প্রবাহ:
হৃদয়ের পটে শুদ্ধতার উজ্জ্বল আলপনা
প্রতিদিন জ্যোৎস্না নামুক
নৈসর্গিক পৃথিবীর কারুক পলল পাখায়,
মানুষেরা কেবল বৃক্ষের মতো হোক





পৌষের রাত 


জর্জেট শাড়ির মতো লিকলিকে কুয়াশা,
আকাশে জাগ্রত গর্ভবতী চাঁদ--
চারিদিক অপরূপ মায়ার কারুকাজ
বাতাসের ডানায় বখাটে শীতের পালক,
হৃদয়ে- অনুভবে জমাট শূন্যতা!
গলিত ব্যথার জলে
চোখের ভূমিতে নিশুতি রাতের নদী
শব্দ বাণী নীরব জলপোকা,
বিচিত্র সুরের ঢেউ শিরা আর উপশিরায়;
বুকের গহনে তবু এক বিমূর্ত পাহাড়,
মনের সমতলে কর্কট অগ্নির সাইক্লোন
দিগন্তে অগনিত ঘুমহীন তারা,
সব যেন তোমার তৃষ্ণা কাতর সেই চোখ;
আবেগে- আবেশে বালুর মহাসেন,
লোমকূপে তীব্র হাহাকারের তীক্ষ্ণ স্রোত-
মায়াবতী দীঘল রাত,
আকাশের গাঁয় পোয়াতি চাঁদের উচ্ছ্বাস;
আমার চোখে অচেনা ছায়ায় চেনা মুখ...









1 comment:

  1. অসাধারণ আপনার লেখাগুলি। শুভকামনা

    ReplyDelete

Powered by Blogger.