ফিরে আসার পর: শহীদ গাজী আলমের গল্প

ফিরে আসার গল্প

 শহীদ গাজী আলম








আগুয়ান - গল্প - ছোটগল্প - সাহিত্য - বাংলা সাহিত্য - সাহিত্য ম্যাগাজিন - ওয়েবম্যাগাজিন - Agooan - golpo -story - web mag- web magazine- online magazine - online golpo-
ফিরে আসার পর: শহীদ গাজী আলমের গল্প






তখন সবে দুচারটে জীবনানন্দ শেষ করেছি মাঝরাতে কারো মিসকল, পার্কে বসে বাদাম চিবানো, হুমায়ুন আহমেদ এসবের প্রতি সবে ভালোলাগা তৈরি হচ্ছে

তরুণ বয়সসবকিছুর মধ্যে নতুনত্ব আসছে
হেমন্তের পরন্ত বিকেল, গোধূলীর রঙে রক্তিম আভায় পয়ারের ঝোঁকে নির্জন চারপাশ যেন বিস্ময় থমথমে

আমি বসে আছি পৌর পার্কের পেছনের দরজা থেকে একটু দূরে জারুল গাছের নিচে বিচ্ছিন্ন এক বেঞ্চে
আমার আঙুলের ফাকে গিটারের তার কাঁপছেতখনো ভালো করে বাজানো শেখা হয়নিসবে দুচারটে গানের টিউনিং শিখেছিটুকটাক রিদম প্লে করতে পারি

 মৃদু বাতাসে আমার আঙুলের ফাঁকে গিটারের সুর বেজে উঠছিলো পরম আবেশেসেই সাথে আমার কণ্ঠ জুড়ে দিয়ে গুনগুন করে গাইছিলাম, "আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি তোমাকে দিলাম"

গানটা শ্রীকান্তের আমার অনেক পছন্দেরগানটা শুনলেই কেমন মাদকতা আমাকে চেপে ধরেএর রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ

গান শেষ করে সামনে তাকালাম কেউ একজন তাকিয়ে আছে কেমন নেশাগ্রস্তের মতোআমার ঠিক বিপরীত পাশে সবুজ ঘাসের ওপরমুঠোভরা তার জীবনানন্দমুখটা পরিচিত খুব পরিচিতআমি সময়টা মনে করার চেষ্টা করছি স্টেশন রোড, কলেজ মাঠ, ফেব্রুয়ারীর সেই সকাল সব মনে পরে গেলো নিমিষে একবার আমার হাতঘড়ির দিকে তাকালাম রঙটা একটু জ্বলে গেছে আগের মতো আর সময় দেয় নাসময়ের সাথে সবই পরিবর্তন হয়, হতে বাধ্য

আমি আবার সামনে তাকালাম চোখাচোখি হলোতারপর চোখ ফিরিয়ে নিলোঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির ঝিলিক সে হাসি চঞ্চু উঁচিয়ে ধেয়ে আসতে চাইলো আমাকে লক্ষ্য করে

আমি তলিয়ে যেতে থাকলাম এই পার্ক, এই শহর, এই দেশ,সাগর, পাহাড়, নদী সবকিছু থেকে আমি ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকতাম কতদূর আমি জানি নাআমি কেবলি জানি আমি তলিয়ে যাচ্ছি তার ফর্সা কপালে চূর্ণ চুলের আঁকিবুকিতেচোখের ভরাট সায়র, বাঁকানো ভ্রু, লালচে চিবুক, গমরঙা লতানো বাহু আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূরে বহুদূরে কোথাও তার গোলাপি আঁচল ঘাসের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে, তার খোলা পা ঘাসের ওপর যেন মুক্তোর দানাআমি স্পষ্ট আমার পতনধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম

যেন ঘাসেদের শরীরে পংক্তি জেগেছে সিরসির করে বাতাস বইছেপাখিরা গাইছেতার গালে আছড়ে পরছে কতগুলো বেপরোয়া চুলকাঁঠালীচাপার মতো সে ছড়িয়ে যাচ্ছে গভীর থেকে আরো গভীরেআমি জানি না তখন আমি কোথায়কতো সময় গেল তার হিসেব নাই

যখন আমার ধ্যান ভাঙলো তখন আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম পার্কের বিচ্ছিন্ন বেঞ্চে।সে ষাটোর্ধ এক ভিক্ষুকের সাথে কঠিন স্বরে কথা বলছে কি ভয়ানক কি কর্কশ কণ্ঠস্বর  লোকটা কে প্রায়ই আমি পার্কে দেখি রোগা, অসুস্থ দেখলাম লোকটাকে বলছে, "রোজ ভিক্ষা করেন কেনো? কাজ করতে পারেন না? প্রত্যেকদিন কি আমরা পার্কে আপনার জন্য টাকা নিয়ে আসি?"
আমি দেখলাম লোকটা কোনো কথা বলছে নামাথা নিচু করে আছেলোকটার কাজ করার সামর্থ্য নাই

আমি আর ওখানে থাকলাম নাগিটারের ব্যাগটা ঘাড়ে নিয়ে হাঁটা দিলামমেয়েটা আমার তাড়াহুড়ো দেখে উদভ্রান্তের মতো হয়ে গেলোহাত উঁচিয়ে কি যেন বলছিলোআমি আর পেছন ফিরে তাকালাম নাকেবলি শুনলাম, "এইযে শুনছেন?"
কিন্তু আমি আর দাঁড়ালাম নাঘড়ি দেখলাম সন্ধ্যা হয়ে গেছে আমাকে ফিরতে হবেভিক্ষুক লোকটা তখনো ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলোআমি পার্কের পেছনের গেটে এসে একটা রিক্সা নিয়ে তাড়াতারি চলে এলামআমাকে ফিরতে হবে

No comments

Powered by Blogger.