ছায়া পুরুষ: মাহবুবা স্মৃতির গল্প

ছায়া পুরুষ

মাহবুবা স্মৃতি





agooan - mahbuba smrity - golpo - story - আগুয়ান - মাহবুবা স্মৃতি - গল্প - ছায়া পুরুষ - বাংলা ওয়েবম্যাগ
ছায়া পুরুষ: মাহবুবা স্মৃতি: আগুয়ান










নীলিমা স্পষ্ট বুঝতে পারছে, তাকে কেউ একজন ফলো করছেঠিক ফলো করাও বলা যায় নাকারণ যাঁরা ফলো করে তাঁরা অন্তত নিরাপদ একটা দূরত্ব রেখে তারপরই ফলো করে, যাতে ধরা না পড়ে যায়কিন্তু এখানে ঘটনা ঘটছে উল্টোনীলিমাকে যে ফলো করছে, সে নীলিমার ঠিক পিছনেই রয়েছে, বলা যায় সঙ্গেই রয়েছে এবং সবসময়ই থাকে মনে হয় ওরযেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবেনীলিমা কি করবে, বুঝতে পারছে নাএর আগেও এমন অনুভব হয়েছে, কয়েকবার নয়, অসংখ্যবারছোটসময় যখনি বাড়িতে সে একা থাকতো, তখন তার দিকে কেউ তাকিয়ে থাকতো বলে নীলিমার মনে হতোভয়ে সে জড়সড় হয়ে থাকতওর মা কতো ডাক্তার-কবিরাজ যে ডেকেছে, হিসাব নেইএক কবিরাজ তো বলেই ফেললো, "আপনার মেয়ের উপর একটা জ্বীনের ছায়া পড়েছেতবে খারাপ না" তারপর কতো তাবিজ-কবচ, আরবি লেখা অক্ষর, নিয়মকানুন... ওর মা সব করে কবিরাজের উছিলাতেই নাকি এমনিই জানে না নীলিমা, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে

দীর্ঘদিন পর সে এটা আবার বুঝতে পারে। একা রাতে সে যখন বাড়ি ফেরে, তখন মনে হয় যে কেউ তাকে ফলো করে পিছনে আসছে। কতোবার ডেকেছে সে, কিন্তু কারো কোনো সাড়া শব্দ পায়নি। সাকিবকে কয়েকবার কথাটা বলেছে , কিন্তু সাকিব হেসে উড়িয়ে দিয়েছে প্রতিবারই

আজও সে এমনটাই অনুভব করছে। এই শীতের মধ্যেও সে ঘেমে উঠেছে। চারপাশটা অনেক বেশিই নির্জন। রাস্তার দু’পাশের সারিবদ্ধ লম্বা গাছগুলো যেন নিরবতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে হালকা বাতাসে গাছের একটি পাতা নড়লেও নীলিমা চমকে উঠছে! তারমধ্যে আবার এই বিপত্তি। মনে মনে নীলিমা নিজেকে গালি দিচ্ছে। "কোন পাপ যে করছিলাম! আমাকে এই রাস্তা দিয়েই আজ আসতে হলো! তুমি কে বাপু? আমাকে মুক্তি দেন প্লিজ..."

আসলে দোষটা ঠিক নীলিমাকেও দেয়া যাবে না। রোজই পার্টটাইম জব শেষে ঘরে ফিরতে ফিরতে তাঁর সন্ধ্যা কখনো কখনো রাতও হয়, যদিও সেটাকে খুব রাত বলা যাবে না। কিন্তু আজ ওর টিউশনের এক ছাত্রীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে কিছুটা রাত হয়ে যায়। শীত কাল, বিকেল শেষ হবার আগেই যেখানে রাতের কালো ছায়া নেমে আসে, সেখানে রাত নয়টা তো দীর্ঘরাতই বলা যায়। তারমধ্যে হঠাৎ করে আবার বৃষ্টিছাত্রীর বাবা-মা ওকে থেকে যেতে বলেছিল। কিন্তু জরুরি কাজ আছে বলে বাসার পথে রওনা দেয়। বাইরে এসে দেখে রিক্সা-গাড়ি কিচ্ছু নেই। সামনে এগিয়ে গিয়েও যখন সে কিছু পেলো না, ভাবলো শর্টকাট রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করলে আধঘণ্টার মধ্যেই বাসায় পৌঁছাতে পারবে। হাঁটতে গিয়ে হালকা ভয় কাজ করছে নীলিমার। কারণ এই রাস্তা দিয়ে লোকজন তেমন একটা চলাফেরা করে না। বৃষ্টির কারণে রাস্তাটা আজ আরও নীরব। নীরবতার মধ্যেও যেন তিনচারগুণ বেশি নীরবতা নেমে এসেছে। কিন্তু নিরুপায় নীলিমার কিছু করার নেই। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে আজ। বাসায় সেই সন্ধ্যা থেকে সাকিব এসে বসে আছে। ওর মা একটু পরপর সেটা ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছেন। মাঝেমাঝে হালকা ধমক। সাকিব ওর এখন হবু বর। সামনের মাসেই ওদের বিয়ে। সাড়ে পাঁচবছরের প্রেম শেষে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছে দু’জন। আরও আগেই হতো, সাকিব পড়াশোনার জন্য গত তিনবছর যাবৎ দেশের বাইরে ছিল, আজই ফিরেছে সে। নীলিমার সঙ্গে দেখা করার জন্য সেই সন্ধ্যা থেকে বসে অপেক্ষা করছে! অবশ্য সাকিব ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু নীলিমাই মানা করে দেয়। কেন যে মানা করতে গেল...!
'হঠাৎ আকাশে বিজলী চমকালে নীলিমা ছায়ার মতো কিছু একটা দেখতে পায়। এবার সে অনেকটাই নিশ্চিত, সত্যিই তার পিছনে কেউ রয়েছে। নীলিমার হাত-পা কেমন অবশ হয়ে আসে। সে বুঝতে পারছে না, পিছনে কে হতে পারে। যে আছে অন্যদিনের সে নয়, কেমন যেন বেখাপ্পা টাইপের মনে হচ্ছে নীলিমার! একবার পিছনে ফিরে তাকাবে কিনা, সে সাহসও কেমন হারিয়ে ফেলেছে আজযদি অন্যকিছু হয়, তখন! নীলিমা শুনেছে, এই রাস্তা দিয়ে মানুষের তেমন একটা চলাফেরা না করার অন্যতম একটি কারণ হল এই রাস্তাটা বেশি ভালো নয়। মানে জ্বীনভূতের ভয় রয়েছে।যদিও সেটাকে নীলিমা তেমন একটা গায়ে মাখেনি।যদিও সাহস করে পিছনে তাকাবে কিনা বুঝতে পারছে না সে। অল্প একটু রাস্তা তার কাছে আজ অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে। মনে মনে সে আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দেয়। যা জানে সব সূরা পড়া শেষ হয়ে যায় ওর। আবার নতুন করে পড়তে থাকে সে। আর নিজেকে বুঝাতে থাকে, ঐটা গাছের ছায়া ছিল, আর কিছু না। মানুষ বা অন্যকিছু হলে নিশ্চয়ই সে ছায়াটা দেখতে পেতো আবার! কিংবা এতোক্ষণে সে বেঁচে না- থাকতে পারতো। তারমানে সব তার মনের ভুল। ওর মা সবসময়ই বলে, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়

নীলিমা এবার একটু জোরেই হাঁটা শুরু করে। হঠাৎ সে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। আবারও চমকে উঠে সে এবং সে সাহস করে পিছনে তাকায়। কাউকেই দেখতে পায় না সে। দূর থেকে একটা ট্রাক এসে চলে যায়। আজব লাগে নীলিমার কাছে। এ রাস্তায় কোনো রিক্সা গাড়ি থামে না নাকি!
আবারও সে মনের ভুল ভেবে হাঁটতে থাকে। না, পায়ের আওয়াজটা আরও স্পষ্ট হয় ওর কাছে। কেমন ধপধপ করে পা ফেলছে। নীলিমার হঠাৎ' মাথাটা ঘুরে উঠে এবং সে দৌড়াতে থাকে। কতোদূর এসেছে, কোথায় এসেছে, কোথায় যাচ্ছে, বাসায় যেতে আর কতোক্ষণ লাগবে কিছুই জানে না নীলিমা। সে শুধু দৌড়াতে থাকে। হঠাৎ একটা গর্তে তার পা আটকে গেলে পড়ে যায় নীলিমা। তাকিয়ে দেখে চারপাশটা অদ্ভুত রকমের নীরব। কোথায় এসেছে বুঝতে পারে না সে। আবার এদিকে পা-টা গর্ত থেকে উঠাতেও পারছে না। মনে হচ্ছে কেউ তার পা ধরে রেখেছেসামনের দিকে তাকাতেই লম্বা একটি দীর্ঘছায়ার অবয়ব দেখতে পায় সে, ভয়ঙ্কর সে অবয়ব দেখার পর নীলিমা একটা চিৎকার দেয় শুধু

নীলিমার সেন্স ফিরে রাত ১২টার দিকে। তাকিয়ে দেখে সাকিব ওর পাশে বসা, দরজা খোলা, বসার ঘরে বসে আছে সাকিবের ছোটভাই ফয়সাল। নীলিমার সেন্স ফেরার সঙ্গে সঙ্গে সাকিব বলে উঠে, "Welcome madam... অবশেষে আপনার জ্ঞাণ ফিরলো। শোকরিয়া।"

নীলিমা উঠে কিছু একটা বলতে যাবে, ওমনিই সাকিব ওকে ইশারায় শুয়ে থাকতে বলে। "উঁহু... কোনো কথা নয়, উঠারও দরকার নেই। বিশ্রাম দরকার তোমার। তুমি শুয়ে থাকো, আমি বরং দেখি..." কথাটা বলেই সাকিব সবসময়ের মতো স্নিগ্ধ একটা হাসি দেয়। নীলিমার অবাক লাগে, ছেলেমানুষ এতো সুন্দর করে কিভাবে হাসতে পারে? নীলিমা কিছু বলতে যাবে এমন সময় নীলিমার মা মানোয়ারা বেগম গরম পানি নিয়ে এসে দেখেন নীলিমার সেন্স ফিরেছে।গরম পানিটা রেখেই তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন
"মা কাঁদছো কেন? আমার কিছু হয়নি তো, আমি ঠিক আছি।"
-"কাঁদি কি আর সাধে? কেন এতো রাত করতে গেলি শুনি? তুই বুঝি আজ রাস্তা দিয়ে আসছিস! তা- একা একা! আর আসবিই যদি, রিক্সা নিয়ে আসবি না? জানিস না, তুই অল্পতেই ভয় পাস?"
-"রাস্তায় কোনো রিক্সা ছিলো না মা, যার জন্য... তাছাড়া বাসায় ফেরারও তাড়া ছিল।ভাবলাম শর্টকাট রাস্তা দিয়ে ফিরলেই বরং ভালো হবে।"
"হুমআর শর্টকাট রাস্তা দিয়ে আসতে গিয়ে গর্তে পা আটকে যায় মানুষের।" পাশ থেকে উত্তর দেয় সাকিব। এতোক্ষণে সব মনে পড়ে যায় নীলিমার। পা নড়াতে গিয়ে দেখে পা নড়াতে পারছে নাচিনচিন ব্যথা করছে পা "হয়েছে, পা আর তোকে নাড়াতে হবে না।পা মচকে ফেলেছে, আবার সে পা নড়াতে যায়! ভাগ্যিস সাকিব বাবা ছিল!" মায়ের কথা শুনে নীলিমা সাকিবের দিকে তাকায়। তারপর ভাবে, রুমে আসলো কি করে সে! মায়ের দিকে তাকিয়ে নীলিমা বলে, "মা আমি রুমে আসলাম কি করে?"
-"শুনো বোকা মেয়ের কথা! এতোক্ষণ ধরে আমি কি বলছি তবে। তোর দেরি দেখে সাকিব যায় তোকে আনতে। গিয়ে দেখে রাস্তার মাঝখানে একটি গর্তে তোর পা আটকে গেছে। সাকিবকে হঠাৎ দেখে নাকি ভয় পাইছিস! ভেবেছিস কে না কে! একেবারে সেন্স হারিয়ে ফেলছিস! তারপর কতো কাণ্ড! তোকে ঘরে নিয়ে আসে। ফয়সালকে ফোন করে কিছু ঔষধ নিয়ে আসতে বলে..."

নীলিমা দূরে বসা ফয়সালের দিকে তাকিয়ে একটু হাসি দিয়ে সাকিবের দিকে তাকায়। কিন্তু তারমনে অনেক প্রশ্ন! সে যাকে দেখে ভয় পেয়েছে, সেটা কোনোভাবেই সাকিব হতে পারে না। কিন্তু…"
"কি ম্যাডাম, এতো কি ভাবছেন শুনি? এতো ভাবনার দরকার নেই। ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার এখন ঘুম দরকার।" তারপর মনোয়ারার দিকে তাকিয়ে বলে, "আন্টি আমরা এবার বাসায় যাই... অনেক রাত হয়ে গেছে।"
-"কি বলো বাবা! এতো রাতে তোমরা বাসায় যাবে নাকি!"
-"না আন্টি, যেতেই হবে। তাছাড়া ফয়সালের কাল একটা পরীক্ষা আছে। না গিয়ে উপায় নেই। নীলিমার জ্ঞান ফেরার জন্য এতোক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। কাল প্রয়োজনীয় মেডিসিন নিয়ে সকালেই আসবো আমি।" এই বলে সাকিব নীলিমার দিকে তাকিয়ে আরেকবার হাসি দিয়ে আস্তে আস্তে বলে, "আন্টি... নীলিমার খেয়াল রাখবেন। আর ওঁর সঙ্গে আপনি রাতে থাকবেন প্লিজ। নিষেধ করলেও থাকবেন!"

এই বলে সাকিব আর ফয়সাল বের হয়ে যায়। চিন্তিত সাকিবকে দেখে ফয়সাল বলে, "ভাইয়া কি ভাবছো? ভাবীর কি পা বেশিই ভেঙ্গেছে?"
সাকিব ফয়সালের দিকে তাকায়, কিন্তু উত্তর দেয় না। তারমনে শুধু কতোগুলো বিষয় ঘোরপাক খাচ্ছে! নীলিমা তো অল্পতে এতো ভয় পাওয়ার মেয়ে নয়! যদিও সবসময়ই নীলিমা সাকিবকে বলেতো, "সাকিব তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না, কিন্তু এটাই সত্য! কেউ একজন আমাকে সবসময় ফলো করে। আমি বুঝতে পারিহোক সেটা ভূত বাবাজি!" বলেই হেসে ফেলতো নীলিমা।তাহলে আজ?
কি এমন জিনিস দেখেছে নীলিমা, যা দেখে এতো ভয় পেয়েছে আর মূল রাস্তা ছেড়ে গোরস্তানের দিকেই বা গেল কেন? তাছাড়া চিৎকার না শুনলে তো সাকিব বুঝতেই পারতো না নীলিমা কোথায় আছে! চিৎকারের শব্দ শুনেই সাকিব দৌড়ে যায় গোরস্তানের দিকে। গিয়ে দেখে নীলিমা সেন্সহীন অবস্থায় পড়ে আছে এবং একটা গর্তে তার পা আটকে আছে।যদিও সেটা গর্ত ছিলো না, ছিল কবর!

পরেরদিন খুব ভোরে ফোন পেয়ে সাকিব এসে দেখে নীলিমার প্রচণ্ড রকম জ্বর। ওর মা মাথায় পানি দিচ্ছেন। মনোয়ারার কাছেই জানতে পারেন, ওঁরা চলে যাবার পর নাকি নীলিমা ঘুমিয়ে পড়ে। ওনারও ঘুম চলে আসে চোখে। হঠাৎ' নীলিমা চিৎকার করে উঠে। জানালায় নাকি ভয়ঙ্কর চেহারার কে দাঁড়িয়ে আছে এবং লম্বা একটি হাত ওরদিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ওর মা কিছুতেই বুঝাতে পারে না মেয়েকে যে জানালায় কেউ নেই। নীলিমা ভয়ে কাঁপতে থাকে কেবল। শেষ রাতে জ্বর আসে। নিরুপায় হয়ে মনোয়ারা তাই ভোরেই সাকিবকে আসতে বলেন। কারণ, বাসায় পুরুষ মানুষ কেন শুধু, তৃতীয় কোনো মানুষই নেই। মেয়েকে নিয়েই মনোয়ারা ছোট্ট একটি বাসায় থাকেন

সাকিব থার্মোমিটার দিয়ে নীলিমার জ্বর মাপে, জ্বর ১০৪ ডিগ্রির উপরে। জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বকছে নীলিমা। নীলিমার মা নিরবে পানি ফেলছেন এখন
"দেখো না বাবা, মেয়েটার কি হলো। আমার মেয়ের কখনো এতো জ্বর আসেনি। তুমি তো ডাক্তার মানুষ... আমার মেয়েটা এমন করছে কেন?"
-"আন্টি আপনি চিন্তা করবেন না, নীলিমার কিছু হয়নি।পায়ে ব্যথা পেয়েছে তো, এজন্য জ্বর এসেছে। দেখছি আমি।"
এরপর নীলিমার হাতটা ধরে দেখে আগুনগরম হয়ে আছে হাতটা! তিনটা কম্বল দেয়া সত্ত্বেও সে কাঁপছে।দুটো ইনজেকশন দেয়া হয় ওকে। নীলিমা আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে। সাকিব ওর হাতটা ধরে রাখে। সাকিবের মাও এসেছেন। মনোয়ারা বেগম কাঁদছেন দেখে বুঝাতে থাকেন।"কাঁদবেন না বেয়াইন। সাকিব দেখছে তো। নীলিমা মায়ের কিছু হয়নি। খারাপ হলে নিশ্চয় সাকিব হাসপাতাল নিয়ে যেতো।"
এদিকে সাকিব নীলিমার হাত ধরে বসে থাকে। হঠাৎ অনুভব করে সে, নীলিমার হাতটা বরফের মতো শীতল হয়ে গরম হয়ে গেছে পুনরায়নীলিমা আবার চিৎকার করে উঠে। "মা আমাকে নিয়ে গেল..." মনোয়ারা মেয়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে আসেন

"মারে তোর কি হয়েছে? কেউ তোকে নিয়ে যেতে পারবে না। আমরা সবাই তোর পাশে আছি, সাকিব তোর পাশে আছে... দেখ..."
নীলিমা আস্তে আস্তে সাকিবের দিকে তাকায়। "সাকিব আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! তোমার পিছনে বিদঘুটে চেহারার লোকটা দাঁড়িয়ে আছে।গতকালও দেখেছি…"
"তুমি কিচ্ছু দেখোনি নীলিমা। কিছু হয়নি তোমার। জ্বর এসেছে তো, তাই এমন মনে হচ্ছে।"
-"আমার মেয়ে এসব কি বলছে সাকিব! গতকাল কি দেখেছে? কে দাঁড়িয়ে আছে?" এই বলে মনোয়ারা আবার কেঁদে উঠেন। সাকিব ওর মাকে ইশারা করলে ওর মা মনোয়ারাকে মেয়ের ঘর থেকে নিয়ে যান বসার ঘরে
-"সাকিব, সে হাসছে এখন... বিদঘুটে… "
-"নীলিমা... কিছু হয়নি, কেউ হাসছে না। চোখটা বন্ধ করে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো প্লিজ…"
-"বিশ্বাস করো সাকিব, আমি মজা করছি না। সত্যিই সে তোমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, আমার খুব ভয় করছে সাকিব, তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না প্লিজ, তুমি আমার হাত ধরে পাশে বসা থাকো।"
-"আমি কোথাও যাবো না। বউকে রেখে কোথায় যাবো বলো?"
-"সাকিবআমার গলা..." কথাটা বলেই নীলিমা চুপ হয়ে যায়। গোংরানোর শব্দ শুনতে পায় সাকিব। নীলিমার গলার কাছে হাতটা রেখে সূরা ইয়াছিন, আয়তুল কুরসি পড়ে ফুঁ দেয়। গোংরানো বন্ধ হয়ে যায়। নীলিমা ঘুমিয়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে। নীলিমার গলায় কালো ছোঁপ ছোঁপ দাগগুলো স্পষ্ট দেখতে পায় ও। সাকিব বুঝতে পারে, খুব খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে নীলিমার সঙ্গে। কিন্তু নীলিমার কোনো ক্ষতি হবার আগেই ওর যা করার করতে হবে! হাসিখুশি আর প্রাণবন্ত মেয়েটার সঙ্গে কিছুতেই সে খারাপ কিছু ঘটতে দিতে পারে না। ভালোবাসে ভীষণ ওকে

নীলিমা আবার চিৎকার করে উঠে।পাশের রুম থেকে ওর মা দৌড়ে আসেন।সাকিবের মা ওনাকে ধরে রাখেন। নীলিমার নাকেমুখে ফেনা বের হতে থাকে, সাকিব দ্রুত কিছু সূরা পড়ে ওর কপালে ফুঁ দেয়। তারপর ওকে কোলে তুলে হাসপাতালের জন্য রওনা হয়

হাসপাতালে ওর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো হয়। মাস্ক লাগানো সত্ত্বেও নীলিমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। যেন কেউ ওর নিঃশ্বাস জোর করে আটকে রেখেছে। সাথে রয়েছে গোংরানোর শব্দ। সাকিব হাসপাতালে নীলিমার বেডের পাশেই বসা। কি করবে বুঝতে পারছে না সে। জ্বরের ঘোরে নীলিমা যখন আবোলতাবোল বকছিল, তখন কয়েকটা কথা বারবার বলছিল, "দুটো ছায়া, খারাপ ছায়া, বিদঘুটে, মেরে ফেলবে…"সাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নীলিমার দিকে তাকায় ও।কষ্ট পাচ্ছে নীলিমা, চেহারা কেমন নীলবর্ণ হয়ে আছে। মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে ও। কপালে হাত রাখে জ্বর বুঝার জন্য। কারেন্টের মতো শর্ট খায় সাকিব! কিছুই বুঝতে পারে না সে। আবার কপালে হাত রাখে, একই অবস্থা! ওর হাতটা কেমন লাল হয়ে যায়। হঠাৎ' রুমে সে বিদঘুটে একটা হাসির শব্দ শুনতে পায়। গা শিরশির করা সে হাসি অনেক বেশিই ভয়ঙ্কর। আবার রুমের মধ্যে ধস্তাধস্তির শব্দও মনে হল শুনতে পেল সে। সাকিব নিজেকে সামলে নিয়ে নীলিমার দিকে তাকিয়ে দেখে, নীলিমা কোনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। অক্সিজেন মাস্কটা মুখ থেকে খুলে নেয় সে। নাকে হাত রাখে, না নিঃশ্বাস পড়ছে না। পালস্ বন্ধ! তাহলে কি... সাকিবের সারা শরীর অবশ হয়ে আসে, মনের অজান্তেই ওর চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। নীলিমাকে ধরে কেঁদে উঠে ও। হঠাৎ দেখতে পায় কে যেন দাঁড়িয়ে আছে ওর বিপরীত পাশে। তাকাতেই দেখে অদ্ভুত চেহারার একজন লোক দাঁড়িয়ে, একটা হাসি দিয়েই মিলিয়ে যায় ছায়াটা। সাকিব অনুভব করে, নীলিমার পালস্ চলছে পুনরায়। দ্রুত নীলিমার দিকে তাকায় সে। হ্যাঁ, নীলিমার নিঃশ্বাস পড়ছে এবং এটা স্বাভাবিক নিঃশ্বাসসাকিব নীলিমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়...



No comments

Powered by Blogger.