সাঈদ কামালের গল্প: বাউল চুল


বাউল চুল

সাঈদ কামাল



agooan - golpo - story - syeed kamal - আগুয়ান - গল্প - ওয়েবম্যাগ - সাঈদ কামাল
সাঈদ কামালের গল্প: বাউল চুল




আমার লম্বা চুলকে কেন্দ্র করে দুটো দল তৈরী হয়েছেএক দল পক্ষে অন্যটা বিপক্ষেপক্ষের সংখ্যা সীমিত বিপক্ষে অধিকউভয় দলই আমার প্রতি আন্তরিকতারা কেউ গরম বা এলোমেলো বা অসুন্দরের কারণে চুলকে না করেনপক্ষের সংখ্যারা সুন্নত কিংবা পাগল পাগল ভাবের কারণে বিনোদনের জন্য চুলকে সমর্থন করেন দু দলকে নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ আমাকে বিপন্ন হতে হয়বিপক্ষ দল মাঝে মধ্যে এমন প্রশ্ন উপস্থাপন করে আমি ভড়কে যাইচুল রাখছেন কেন, কোন পীরের শিষ্য, কোন দলে যোগ দিছেন, বাউল হলেন কেন, গাঞ্জা টানবেন নাকি এইসব প্রশ্ন আমাকে বিভ্রান্ত করেতাদের দৃষ্টি এইরকম যে, সুদ নেওয়া, ঘুষ নেওয়া, প্রাণ নেওয়া, মান নেওয়া, অবৈধভাবে অর্থ নেওয়ার চেয়ে চুল লম্বা রাখা অধিক অন্যায়আমি এদেরকে কিছু বলি নাবলতে ইচ্ছে করে নাসেরূপ চুল সমর্থনকারীরাও আমাকে বিপদগ্রস্থ করেতারা বলে যে, -‘আপনাকে আমাদের পীর বানাবআপনি মানুষ হিসেবে এক নম্বরকেউরে কথা দিলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে হলেও তা পূর্ণ করেনমিথ্যা বলেন নাকারো এক টাকা খান নালোভাতুর দৃষ্টিতে নারী দেখেন নানামাজ টামাজ তো সব সময় পড়েনআপনাকে দিয়ে হবেআপনি হবেন আমাদের পীরআমরা শিষ্যআমি যখন তাদের জিজ্ঞেস করি যে,- ‘পীর হয়ে আমি করব কী?  জবাবে তারা বলে,-‘আপনি শুধু বসে বসে লম্বা চুল নাড়াবেন, মাঝেমধ্যে পানি পড়ে দিবেনএই একটু আধটু ফুঁ টুঁ দিবেনবাকি সব কাজ আমাদেররোগী ধরা, ওষুধ দেওয়া, সমস্যার সমাধান আমরাই করবঅবশ্য মাঝে মধ্যে আপনি চমকে দেওয়ার মত অলৌকিক কিছু বলবেনতার ফ্যামিলির তথ্য, সমস্যার কথা বলে বিমূঢ় করে দিবেনসে তথ্য অগ্রিম আপনাকে জানিয়ে দেবআপনি শুধু ভাব নিয়া হাত নাড়ায়া কখনো চুল নাড়ায়া বলে দিবেন


আমি এদের দিকে তাকিয়ে হাসিপীরের মত ভাব নিয়া বলি,- ‘তাহলে ট্যাকা পয়সার সমস্যা হবে নাদোকানদারি না হয় ছেড়েই দেবমানুষের সেবা করে ঝুমঝুম টাকা কামাব
ওরা আমার কথা শুনে হাসেসিগারেট ধরায়গলায় ভাব নিয়ে মৃদু গলায় বলে, -‘আমরা একজন ডিজিটাল বাবাকে পাচ্ছি

এসব কথাও আমার মনকে মেঘলা আকাশের মত বিষাদগ্রস্থ করেভাবি যে লম্বা চুল রাখাও এক শ্রেণির ভণ্ডামিলম্বা চুলকে আশ্রয় করে বাবা নাম রেখে একটা গোত্র ছাড়পোকার মত রক্ত না খেয়ে বিশ্বাস খেয়ে অশ্লীল ব্যবসা করেসে অপরাধ যেন আমারইলম্বা চুল রাখাই একমাত্র সে অপরাধতবুও বন্ধুদের মধ্যে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে চুল রাখছেন কেন? জবাবে বলি, -‘ বিখ্যাত হতে, পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকতেসেটা কীরকম ভাবে?- তারা পাল্টা পশ্ন করলে বলি,- ‘এই যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মধুসূদন দত্ত  অমর হয়ে আছেন লম্বা চুল রাখার কারণেআমিও তো তাদের দলে দ্যাখবা একদিন আমিও তাদের মত অমর হয়ে থাকব
ওরা আমার কথা শুনে হো হো হাসে

কিন্তু একদিন বিপত্তি ঘটে গেলরাত্রিবেলায় ফাতেহা ফোন দিয়ে জানাল আধঘণ্টার মধ্যে তার সঙ্গে দেখা করতে হবেতখন রাত সাড়ে এগারটাজিজ্ঞেসু করলাম ,- ‘এত রাতে কেন, ফোনে বলা যায় না?’ সে একরোখামি গলায় বলল,- ‘দেরি করো নাযা বলেছি তা করো
ফাতেহা এমনিএকটু বেশি আহ্লাদীবাবার একমাত্র সন্তান হলে যা হয়ওর সঙ্গে আমার পরিচয় তিন বছরেরপ্রথম যেদিন দেখা হয় সেদিন আকাশে অনেক মেঘ ছিলআমি দোকানে বসে ঝিমুচ্ছিলামদোকান আমার বন্ধু আতিকেরআমি মাঝেমধ্যে এসে বসিসেদিনও বসেছিলাম
সে ডাকল,- ‘এই যে

আমি মাথা তুলে ওর দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার প্রশংসা করলাম এবং বললাম আলহামদুলিল্লাহতিনি কত বড় বিজ্ঞানী যিনি নারীর মধ্যে এত এত মায়া ঢেলে দিলেনফাতেহা বলল- ‘আমি একটা জিপি সিম কিনবদাম কত?’ বললাম ওর চোখে তাকিয়ে,- ‘ দাম নিয়ে ভাববেন না, আপনি বসুন
ফাতেহা বসলতার বসার ভঙ্গি অতি সুন্দরনারিকেলের পাতা যেমন অল্প হাওয়াতে শান্তভাবে হেলে তার বসার ভঙ্গি এমনজিজ্ঞেস করলাম- ‘ছবি তুলতে আপত্তি আছে?’ ফাতেহা ইতস্তত বোধ করেখানিক সময় দেয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে থেকে মোলায়েম গলায় বলে,- ‘অনেক বেশি আপত্তি তাতেছবি ছাড়া সিম দিতে পারবেন?’
ফ্যানের লঘু বাতাসে ওর চুল উড়েযেন একটা হলুদ পাহাড়ের বুকে কালো রঙের কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছেদূর থেকে দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয় কাছে থেকে দেখলে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়আমি যেন বহুদূর থেকে ফাতিহার চুল দেখছি আর একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিফাতেহা আমার নীরবতায় বিদ্রোহ প্রকাশ করে বলে - ‘যদি না হয় বলে দেন আর বসে থাকতে পারব নাআমি স্থির গলায় বলি- ‘আপনার পরিবর্তে অন্যকেউ ছবি তুললে হবেসিম তার নামে হবেএই আর কি!’

ফাতেহা বলল- ‘তবে আপনার নামে তুলে দেন না
আমি অবাক হয়ে বলি- ‘আপনার ফ্যামিলির কেউ হলে ভালো হতফাতেহা কপাল হতে চুল সরায়কোমল গলায় বলে- ‘আমি খুব লুকিয়ে একটা ফোন কিনেছিএখন আরোও লুকিয়ে একটা সিম নিতে চাচ্ছিআপনি দেখছি সেটা প্রকাশ করে দিতে বাধ্য করছেনভারি ড্যাঞ্জারাস তো আপনে
তার সরলতায় আমি মুগ্ধ আনন্দিত হই, হেসে ফেলিবলি- ‘আমি আপনার নামও জানি নাতারপর আমার নামে সিম তুলে নিয়ে আপনি কি করেন বা না করেন এরপর বিপদে ডুবে মরব আমি

আমার কথা তার কানে অর্ধেক প্রবেশ করা মাত্র সে তড়িৎ উঠে দাঁড়ালপা দুটো নৃত্যের ছন্দের মত প্রসারিত করলচার পা অগ্রসর হয়ে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে বাহিরটা দেখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে ঝাঁজ মেশানো গলায় বলল,- ‘লাগবে না, আপনার জিনিশ আপনার কাছেই থাকুক
আমি তার চোখের কোণে তিল দেখিতিলটা হলুদ হয়ে গেছেরাগে যে তিলের রঙ পরিবর্তন হতে পারে যে এক বিরল ঘটনাআমাকে ভীষণ মুগ্ধ করেমুখের দু পাশে কদম ফুলের মত স্নিগ্ধ হয়ে গেছেমানুষের রাগ যে এত সুন্দর হতে পারে এর আগে কখনো মনে হয়নিরাগলে যে মানুষকে সবচেয়ে অসহায় লাগে বাক্যটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেলরাগলে তাকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে বিষয়টি এমন হয়ত নয়, বলা চলে অন্যরকম সুন্দর লাগেযে সুন্দরের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে এক গভীর ভালোলাগার জন্ম নিয়ে বুকের খুব গভীরে অন্যরকম শান্তি এনে দিতে পারে
অনেক দিন মেঘলা ভাব নিয়ে ফিরে যাওয়া আকাশে হঠাৎ মিষ্টি একটা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলহয়ত এর কারণ হতে পারে ফাতেহামানুষের মালিক ফেরেশতাকে আদেশ দিলেন যে, মিষ্টি একটা বৃষ্টি দ্যাওযে বৃষ্টিতে একটা রাগ দেখে কারো হৃদয় হলুদ হয়ে যেতে পারেসে হলুদ উষ্ণ বরফের মতযে বরফ সেখানটিতে একটা স্বপ্নের রেখা এঁকে দিয়ে জীবনকে মধুর করে দিতে পারেআমার কাছে মনে হয় যে জীবনের বেদনাগুলো দূরতম গ্রহের দিকে দ্রুত উড়ে যাচ্ছেহাসিরা তাদের বিশাল ডাল মেলে দিয়েছে আমার চারপাশেআমি বসে আছি নতুন এক আনন্দের গ্রহেসে গ্রহে আমি আর ফাতেহা

ফাতেহা বসলতার বসার ভঙ্গির প্রশংসা করতে হয়এটা যেন স্বরবৃত্ত ছন্দের মতবোধয় এমন দৃশ্য দেখে কাব্য জগতে প্রথমে স্বরবৃত্ত ছন্দের জন্ম হয়েছিলআমি বলি- ‘আপনার রাগ ভারি মিষ্টিফাতেহা এক পলক আমাকে দেখে উদাস গলায় বলল- ‘আপনারা ছেলেরা যে আসলে কি ভয়াবহ ড্যাঞ্জারাস, চেনা খুব মুশকিলআমি হেসে হেসে বলি- ‘মেয়েরাও কখনো কখনো ড্যাঞ্জারাস হয়ফাতেহা চোখ ঘুরিয়ে বলল- ‘ইশ, বললেই হল
আমি বাইরে তাকাইবৃষ্টি দেখিঘরের সামনে অনেক জল জমে গেছেসে জলে একটা হাঁস সাঁতার কাটছে আর প্যাঁক প্যাঁক করছেহয়ত সে তার সঙ্গীনিকে ডাকছেওদিকে তাকিয়ে বললাম-‘আমি আপনাকে সিম দিচ্ছিআমার জাতীয় পরিচয়পত্রই তাতে ব্যবহার করব
ফাতেহা কথা বলল নাআড় দৃষ্টিতে আমাকে দেখলসিম নিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে আমার ছাতাও নিয়ে গেল এবং বলললম্বা চুলে আপনাকে চমৎকার লাগে

সে সময় আমার চুল খুব একটা লম্বা হয়নি প্রথম পর্যায় অতিক্রম করে ঝিম মেরে ছিলআমি ওর দিকে ফিরে হেসে বললাম- ‘যাক একজনের ভালো লাগার কারণে চুলকে না হয় স্থায়ী করে ফেলবফাতেহা ছাতা মেলে বলল- ‘চমৎকার বলেছিভালো লেগেছে তো বলিনি
সেদিন থেকেই শুরুদশ মাস আমরা আমাদের বুঝতে সময় নিলামএবং একদিন বুঝতে পারলাম উভয়ে উভয়ের জন্যবৃক্ষের জন্য যেমন পাতা, দিনের জন্য যেমন আলো, অসুখের জন্য যেমন ওষুধ তেমনি আমার জন্য ফাতেহা এবং ফাতেহার জন্য আমি

সে রাতে ফাতেহার ফোন পেয়ে আমি আর বিলম্ব করিনিহয়ত ওর বড় রকমের বিপদ হয়েছে, এই রকম ভেবে দ্রুত হাঁটতে শুরু করিআকাশে চমৎকার চাঁদকয়েকটা তারা তাকে  পাহাড়া দিচ্ছেআমি হাঁটছিরাস্তায় কেউ নাইতিনটি  কুকুর দাঁড়িয়ে আছে তাদের একজনের মুখে শুকনো রুটিব্রিজ পাড় হয়ে কলেজের রাস্তার কাছাকাছি চলে এসেছিআর চারটে বাড়ির পরেই ফাতেহাদের বাড়িবড় বৃষ্টি গাছের নিকট যখন এলাম তখন দেখতে পেলাম দুজন লোক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেএই বৃষ্টি গাছটি আমার চেয়েও অনেক বড়আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখনই তাকে বড় দেখেছিলোক দুটো আমার দিকে এগিয়ে এলআমার হাত ধরে বলল- ‘বাবা, ধন্য আমরাআপনার সাক্ষাত পেয়েছিএই নেন, ঢেলে খান

ওদের একজন আমাকে একটি বোতল দিতে উৎসুক হলওরা কে বা কারা বুঝতে পারছিলাম নাওদের কি বলব ভাবতে পারছিলাম নাআমি চুপ করে থাকিওদের একজন আবার বলল,-‘বাবা, আপনাকে ভালোবেসে নয় মাস ধরে চুল রাখছি; এই দেখুন আমার লম্বা চুলওরা দুজন তাদের লম্বা চুল আমাকে দেখাল আমি বুঝতে পারছিলাম না ওরা কারাকখনো মনে হচ্ছিল কোন বন্ধু হয়ত মজা করতে এই ফাঁদ পেতেছে কখনো মনে হচ্ছিল ওরা হয়ত ভুল করে ভুল মানুষকে বাবা ডাকছে জিজ্ঞেস করলাম- ‘তোমরা কারা?’ বোতলটা ব্যাগে ভরে একজন বলল, -আমার নাম আজিজুলঅন্যজন বলল-‘আমার নাম কাশেম
আমি ওদের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে বললাম- ‘আমি বাবা না, ভাইতোমরা ভুল করছ
আজিজুল তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করে- ‘তবে চুল লম্বা যে
আমি বলি- ‘ভাই, দুনিয়াতে কি চুল রাখার স্বাধীনতা নাই? এটা আমার শখ, ভালোলাগা
কাশেম মাথা নেড়ে বলল- ‘আপনি আমাদের বোকা বানায়েন নাএত তপস্যা করে আপনাকে পেয়েছি সহজে ছাড়ছি না
-‘কই নিবা?’                                                                          
মাজারে লইয়া যায়ামআজিজুল জবাব দেয়
-‘কোন মাজারে? আমি মাজারে যাব কেন?’
আজিজুল আবার বলে-‘বাবা, আপনি আমাদের সঙ্গে রাইগা আছেন এহনোআপনার পায়ে ধরি রাইগা থাইকেন না আর
বিপদে যে ডুবে গেছি বুঝতে পারছি কিন্তু উদ্ধারের কোন পদ্ধতি মাথায় আসছে নাবলি -‘রাগ করব কেন?’


কাশেম আমার হাত ধরেতার শরীর থেকে বিশ্রী একটা গন্ধ আসেসে বলল- ‘আপনার চুলের কত গুণের কথা শুনেছিআপনার চুল ধোয়া পানি পান করে কত রোগী আরোগ্য লাভ করেছেকত মানুষ বিপদ মুক্ত হয়েছেধনবান হয়েছে অনেক মানুষছাত্ররা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেভাঙা সর্ম্পক জোড়া লেগেছে কত শত
আমি অবাক হয়ে বলি-‘সত্যি নাকি?’
কাশেম বলল,- ‘বাবা, আপনার চুল আবার আপনিই জিজ্ঞেস করছেনমজা করছেন নিশ্চয়?’
আমি একটু রাগের ভাব নিয়ে বলি-‘মজা তো আপনারা করছেনমধ্য রাতে আমাকে একা পেয়ে বাবার দোহাই দিয়ে আটকে রেখে আমোদ নিচ্ছেন
আজিজুল বলল-‘গত আট মাস তের দিন যাবৎ আপনার খবর নাইকত কোথাও আপনার সন্ধান করেছি যে হিসেব নেইঅবশেষে পাইলাম, এখন আপনি ভাঁওতামি করে ছাড় নেওয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ করে জানাচ্ছি লাভ হবে না তাতেআপনাকে ধরে হলেও নিয়ে যাব
কাশেম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়গলার আওয়াজ উঁচু করে বলে- ‘বাবাকে পেয়ে হারানোর চেয়ে ধরে নিয়ে  বেআদবি করা এরচেয়ে বরং ভালো
আমার ভয় হয় এদের কাণ্ড দেখেএদের থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করি মনে মনেকিন্তু কীভাবে সম্ভব হবে বুঝতে পারছিলাম নামিথ্যার আশ্রয় নিয়ে  একটু আসছি, তোমরা বসোএমন কিছু বলে ওদের মানানো যে যাবে না বেশ বুঝতে পারছিসে সময় আমার ফোনে রিং হয়ফাতেহার ফোনফাতেহা সেই ঝাঁজ মেশানো গলায় বলল- ‘তোমাকে সেই কখন আসতে বললাম, এখন কই তুমি? দেরি কেন এত বেশি?’ আমি শান্ত গলায় বললাম- ‘দুটা লোক বাবা বলে ডেকে আমার পথ আটকে রেখেছেওরা বলছে আমি নাকি চুল বাবা...! আমার কথা শেষ হওয়ার পূর্বে ফাতেহা বলল-‘কি সব মাতালের মত বলছ, মদ খাইছ নাকি?’
ফাতেহা এমনিযখন যেটা চায় তখনই সেটা পাওয়া চায়ব্যতিক্রম হলে কি বলে না বলে বুঝতে পারে নাবললাম- ‘বিশ্বাস না হলে দেখে যাও, বৃষ্টি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছিফাতেহা ফোন কেটে দিলে আমি আজিজুল কাশেমের দিকে তাকিয়ে বললাম- ‘কী ভায়েরা, বুঝতে তো পারছ এবার কাশেম মাথা চুলকে বলল ,-‘সত্যি আপনি আমাদের চুল বাবা , না?’
আমি তো প্রথম থেকেই বলছিআমি বাবা দাবা কিছু নাআপনারা তো বিশ্বাস করছেন না’-বললাম আমি


আজিজুল মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকেচাঁদের ক্ষীণ আলোয় মাটিতে পড়ে থাকা পাতা দেখে
কাশেম দু পা এগিয়ে আমার সামনে দাঁড়ায়-‘আপনি নিশ্চয় খলিফা ওমরের সময়ের সেই ঘটনা জানেনওই যে এক মহিলা উনুনে হাঁড়ি বসিয়ে জল গরম করে খাবারের কথা বলে বাচ্চাদের ফাঁকি দিচ্ছিল; আপনি কি আমাদের এমনি ফাঁকি দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন?’
কাশেমের বুদ্ধিদীপ্ত কথা আমার খুব ভালো লাগে মনে হয় না যে ওরা অজ্ঞগভীর অন্ধকারের জগৎ থেকে বের হওয়ার  বোধ ওদের আছেওরা  পুষ্পের সুগন্ধী নিয়ে সফেদ পায়রাদের উড়ে যাওয়া দেখে দেখে এক আলোকিত ভালোবাসার সন্ধান পেতে পারেঅথচ ওরা ছুটে চলছে অমাবস্যার পিছনেযে ভালোবাসা ওদের  উজ্জীবিত করবে ওরা সেদিকে না তাকিয়ে ছুটে অসীম শূন্যতার দিকেযার চারদিকে ক্ষুধিত পশুদের বসতিওরা আলিঙ্গন করতে উন্মাদ সে সব ছদ্মবেশী জীবদেরবেদনা হয় ওদের কথা ভেবেশান্ত গলায় বলি- ‘নিজেকে যে ফাঁকি দেয় অন্যরা তাকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করতে পারে নাতোমরা তো নিজেকে ফাঁকি দিচ্ছ
সে মুহূর্তে ফাতেহা আসেতার হাতে ছোট র্টচসে সরাসরি আমার চোখে আলো ফেলে বলল- ‘কি ব্যাপার, মধ্যরাতে জ্ঞান বিতরণ হচ্ছে, না?’
-‘মধ্যরাতে রাস্তায় খাড়ায়া জ্ঞান দিতে যে কারো কারো ভালো লাগে না, তুমি বুঝতে পারো, ফাতেহা?’
-‘তো হয়েছে কী শুনি
আজিজুল নম্র গলায় ঈষৎ মেঘের ফাঁকে অর্ধেক ডুবে যাওয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,-‘সুরেশ্বরী মাজারে চুল বাবা থাকতেনতিনি অনেক কামেল ছিলেনতার চুল ধোয়া পানি অনেক রকম সমাধানের ওষুধ হয়ে কাজ করতকিন্তু গত কয়েক মাস ধরে বাবার খবর নেইআজকের রাতে উনার লম্বা চুল দেখে ভাবছিলাম পেয়েছি আমাদের চুল বাবাকে
ফাতেহা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেটর্চের আলো মাটিতে ফেলে আস্তে আস্তে বলে- ‘আপনাদের দেখি কোন খবর নাইটিভি না হয় দেখেন না, পত্রিকা না হয় পড়েন না কিন্তু ফেইসবুকে ভাইরাল হলো যে এও জানেন না? সুরেশ্বরী মাজারের চুল বাবা যে গত আট মাস ধরে পুলিশের হাতের ভাত খাইতেছে তাও জানে না?’


ফাতেহা এবার আমার দিকে তাকাল- ‘তোমাকে কত দিন বললাম চুল ছোট করোলম্বা চুলে তোমাকে বিশ্রী লাগেতুমি বাউল হইবা, লম্বা চুল নাড়ায়া নাড়ায়া হাঁটবা, বিখ্যাত হইবা, অমর হইবা, হও এবারআপনেরা ওরে ধইরা নেন, ওই আপনাদের চুল বাবা
আজিজুল কাশেম এবার বুঝতে পারে সত্যটাকাশেম বলে- ‘দোষ আমাদেরইবুঝতে পারিনিআমরা আসলে চোখে দেখেও ডুবে যাচ্ছিলামক্ষমা করবেন
ওরে সঙ্গে আজিজুলও বলল-‘আমরা আসলে এত বেশি চুল বাবার ডাক্তারির কথা শুনেছি যে ভুলেই গিয়েছিলাম লম্বা চুলের সবাই চুল বাবা নালম্বা চুলের কেউ কেউ সুন্দর মানুষযা করেছি তার জন্য দুঃখিত
ফাতেহা বলল-‘আপনারা যান এখননইলে ওকে চুল বাবার সঙ্গে জেলখানায় পাঠিয়ে দেব
ওরা আর বাক্য খরচা না করে দ্রুত প্রস্থান করেফাতেহা বলল-‘শিক্ষা না যদি হয়ে থাকে তবে আরোও লম্বা করে বাউল সাজোতারপর পাগলের ভাব নিয়ে পথে মাঠে ঘুরে বেড়াও
আমি বললাম- ‘তোমার জন্যই তো ঘটল এই ঘটনাকী জন্য ডেকেছিলে শুনি?’
ফাতেহা বলল- ‘যে জন্য ডেকেছিলাম সেটা আর বলব নাতবে নতুন করে যদি বলি তবে বলব কাল দিন পর তোমাকে যেন বাউল চুলে না দ্যাখি

আমি চুল কাটাইনিইচ্ছে করেনিচুলের মায়ায় আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলামসপ্তাহ পরে ফোনে ফাতেহা জানতে চেয়েছিল চুল কেটেছি নাকি, কাটাব নাকিআমি বলেছিলাম যে, আমার ভালো লাগে বাউলের মত লম্বা চুল আন্দোলিত করে নিরুদ্দেশে হেঁটে যেতেফাতেহা বলেছিল, বেশ তোতাই করোবাউল হওবড় বাউল
এরপর দীর্ঘদিন কেটে গেল, ফাতেহার চোখে এক পলক আর তাকানো হলো নাজানানো হলো না ফাতেহার মত চুলও আমার থেকে  অর্ধেক প্রস্থান করেছেভালোবাসার মানুষের প্রার্থনার চেয়ে অভিশাপ যে বেশি প্রভাব ফেলে বলা হলো না একদিনও

No comments

Powered by Blogger.