শীতল স্পর্শ: ডলি মনিরের গল্প


শীতল  স্পর্শ  

ডলি মনির



agooan - golpo - bangla golpo- story- doly monir- আগুয়ান - গল্প - ডলি মনির- ওয়েবম্যাগ -
Add caption








লাশের গাড়ি নিয়ে সবাই একাডেমির দিকে গেছে, ঘরটা এখন কিছুটা শান্ত, আত্মীয়স্বজন সবাই চলে  গেছে, বীথি জানালার কাছে বসে স্মৃতির বইটা উল্টায়, একেকটা পৃষ্ঠা একেকটা দীর্ঘশ্বাস। 
 
কিসের থেকে কি যে হয়ে গেলো, বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো সুস্থ্য অথচ কিছুক্ষণ পর ফোন আসলো,লিটন  হাসপাতালে, তাড়াতাড়ি আসেন, হাসপাতালে যে  একটা লাশ দেখতে  হবে বীথি  কল্পনাও  করেনি, ফুঁপিয়ে  কেঁদে ওঠে, ওর  ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে কাউকে দেখাতে পারছে না

 নিঃসন্তান বীথির ত্রিশ বছরের সংসারে মতের অমিল তেমন হয়নি, বিথির সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ছিলো স্বামীকে সুখি  করা, তাছাড়া স্বামীর সাহিত্য প্রতিভা তার  কাছে  গর্বের বিষয়  ছিলো। 


অন্যরুম থেকে কাজের মেয়েটা  ফোন নিয়ে  আসে, খাল্লাম্মা মোবাইল নেন, কে জানি  ফোন করছে

 হ্যালো ভাবি,  আমি  মিজান, লাশতো একাডেমিতে ঢুকতে দিচ্ছে না, ওরা  বলছে ভাই নাকি প্রতিষ্ঠিত লেখক না, এজন্য একাডেমিতে ঢুকতে দেবে না, দুই ঘন্টা ধরে চেষ্টা  চালাচ্ছি কোনো লাভ হচ্ছে না



কি বলো এসব, একাডেমির পরিচালকতো তোমার ভাইকে খুব ভালো চিনে, তুমি ওনার কাছে যাও

ওদের কাছে গিয়ে লাভ নেই ভাবি, খুব  খারাপ ব্যবহার করলো, ওরা খুব নিষ্ঠুর অন্য ব্যবস্থা করতে হবে, ইন্টিলেকচুয়াল লোকদের যেখানে কবর দেওয়া হয় সেখানে নিয়ে যাই, লাশ বেশি  সময় ফেলে রেখে দেওয়া  ভালো হবে না। ঠিক আছে, তোমরা যেটা  ভালো মনে করো, তাই করো


বীথির বুক ফেটে চিৎকার  আসছে, ওর মনে পরছে এক অনুষ্ঠানে  লিটনের সাথে একাডেমিতে গিয়েছিলো, সবাই  লিটনের খুব  প্রশংসা করেছে, পরিচালক নিজ থেকে এসে বীথির সাথে পরিচিত হয়েছিলো, সেদিন  ওর স্বামীর  জন্য খুব গর্ব  হয়েছিলো, বোন বান্ধবী সবার সাথে সাহিত্যিক স্বামীর  খ্যাতির গল্প করেছিলো। বীথি  বিশ্বাস করতে পারছে  না, মানুষ  এতোটা বদলে  যেতে পারে, একাডেমির  কেউ লিটনের পক্ষ  নিয়ে কথা বল্লো  না! বুকের  ভেতর আর্তনাদ  ওঠে, এতোগুলো বই বের হবার পরও যদি লিটনের কোন অবদান না থাকে, সাহিত্যের  সব শাখায় বিচরণ  করেও যদি  কিছুই  হতে  না পারলো  তবে বেঁচে  থাকতে ওর  সাহিত্যকর্ম  নিয়ে  সবার  মুখে  কথার  ফুলঝুরি  কেনো ছিলোএসব  মানুষগুলোর দুইরকম চেহারা লিটন যদি  দেখতো তবে আমাকে  সময় না দেওয়ার  জন্য  আফসুস করতো। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে পৃথিবীটা ওকে ওল্টো  করে বেঁধে রেখেছেআহা সাহিত্যের জন্য   কতকিছুই না করেছে,  সংসারে একটুও সময় দেয়নি, রাতদিন  একাডেমির লোক নিয়ে পড়ে থাকতো, একাডেমির উন্নয়নের জন্য  ধারে ধারে ঘুরে বিভিন্ন বিল পাশ  করিয়েছে, আজ  ওর লাশটাকে  সম্মান দিতে  পারলো না, ভিতরে ঢুকতে  পর্যন্ত  দিলো  না, বীথি কান্নাগুলো ভারি হয়ে যায়


 বীথি  মনে পড়ে  লিটনের  সাহিত্যিক  বন্ধুদের  রান্না করে খাওয়ানোর  কথা, ওদের উচ্ছাসিত  প্রশংসার কথা, আজ এসব বন্ধুরা  কোথাও  নেই, বিথি  ঢুকরে ঢুকরে  কাঁদতে  থাকে। 

ফোনের  শব্দে হকচকিয়ে  মোবাইল  অন  করে চুপ করে থাকেহ্যালো ভাবি, এখানেও  সমস্যা, ওরা বলছে  এলিট শ্রেণীর  লোক ছাড়া এখানে কাউকে  কবর  দেওয়া  হয় না। 

গ্রামে  নিয়ে যাও, বলে কাঁদে অবিরত, কান্নার  শেষ  নেই যেনো

ভাবি কাঁদবেন না, বিপদে  ধৈর্য রাখেন। গ্রামেই  ভালো হবে, আমরা গ্রামের পথেই  রওনা দেই

মাথা  ঝিমঝিম  করতে থাকে, সারা শরীর অবচেতন  মনে হচ্ছে, ওর চিৎকার করে কেঁদে  লিটনের  মাথায়  ঝাকুনি দিয়ে  জাগাতে  ইচ্ছে করছে,  উঠো লিটন , তামাশা  দেখো। তুমি  মানুষের   কথা  ভাবতে,  বন্যা   ঝড়ে নিজের টাকা দিয়ে,  চাঁদা  তুলে কত দূর দূরান্তে চলে যেতে  তোমার  হাত এতো  প্রসারিত ছিলো আজ   মানুষগুলোই  তোমাকে  কত অপমান  করছে


বীথি ঘোরের ভেতর  চলে যায়, লিটনের  সাথে থিয়েটার দেখা, কবিতা পড়ার  দিনগুলো চোখের  সামনে চলে আসে, লিটনের প্রিয় উপন্যাসের লাইন, কবিতার লাইনগুলো   বিড়বিড় করে বলতে  থাকে,  উপন্যাসের যে  পাণ্ডুলিপিটা নতুন তৈরি করেছিলো, বীথি সেটা বারবার পড়েছিলো, মনে হচ্ছে উপন্যাসের প্রতিটা অক্ষর  জীবন্ত হয়ে  বিথির  বুকে হাতুড়ি  পিটাচ্ছে। ত্রিশ  বছরের সংসারে  কোন সন্তান ছিলো না তবু 
কোনো  ক্ষোভ নেই,  লিটনের  প্রতিটা বই সন্তানের মতো আগলে রাখতো। ধর্মের  প্রতি কিছুটা উদাসিন ছিলো, ধর্মের কুসংস্কার গোঁড়ামী ওকে  পীড়া দিতো, মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করতো, বিভিন্ন পত্রিকায়  ধর্মীয়  গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে লেখালেখি  করলে অনেকে  লিটনকে নাস্তিক ভাবা শুরু করে, অথচ ধর্মের  বিরুদ্ধে  ওর কোনো অবস্থান  ছিলো  না, আশেপাশের  অনেকেই  বিথিকে  খোঁচা দিয়ে  কথা বলতো, ধর্ম পালন না করার  কারণে   গোড়া আত্মীয়  স্বজনরা ওদের বাসায় আসা  বন্ধ করে দেয়। একবার  বীথি তার বড় ভাইয়ের  সাথে অনেক তর্ক করে, লিটনকে  নাস্তিক বলে যখন অবজ্ঞা  করতে শুরু  করলো, জাহান্নামী  বলে গালি দিলো তখন বিথি সহ্য করতে পারেনি, ভাইকে  তুলোধোনা  করেছিলো, সে থেকে বড় ভাই ওর  বাসায়  আসে না, বীথি  কাছে  তার স্বামী ছিলো  সব ,যাই করতো  তাই সঠিক  মনে করতো। এজন্য ওর পরিবারের  সাথে দূরত্ব বাড়ে। 




লিটনের  ধ্যানজ্ঞানে ছিলো সাহিত্য, আড্ডা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে সবসময় প্রাণবন্ত থাকতো, শব্দের উপর শব্দে দেয়াল তারপর খাঁচা বানিয়ে নিজেকে পুষে রাখতো, নিয়তির পরিহাসে মৃত্যুর পর সাহিত্য তাকে আশ্রয়  দিচ্ছে না, চরম অবহেলা টানা হেঁচড়ানোয় লিটনের নির্জীব দেহটাও যেনো অভিমানে ভারি হয়ে যায়।   বীথি ফুপিয়ে কেঁদে বলতে থাকে, এটা ওর প্রাপ্য ছিলো না, এটা  ওর প্রাপ্য ছিলো না। হঠাৎ বিথির মনে আশঙ্কা  জাগে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন  গ্রামের মানুষগুলো  যদি, ফোনের শব্দে বীথি  চমকে ওঠে, আতঙ্কিত  কন্ঠস্বরে
হ্যালো "ভাবি, এখানেও  সমস্যা, ওরা  বলছে  ভাই নাকি নাস্তিক, গ্রামে নাস্তিকের জায়গা হবে না বলে কেউ কেউ মিছিল শুরু করছেভাবি কি  করবো বুঝতে  পারছি না, সকাল থেকে শুরু করেছি  এখন রাত দশটা  বাজে।"




বীথি  চুপসে যায়, ফোনটাও  হাত থেকে পড়ে যায়, মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, বুকে বালিশ  চাপা দিয়ে উপুর হয়, লিটন কেনো তুমি মরে গেছো, তোমার  লাশটা যদি  বুকে বেঁধে রাখা যেতো তবে সমস্যা হতো না। 

বীথি কিছু একটা অনুভব করছে, ঠান্ডা একটা হাত ওর কাঁধে, হিম শীতল কন্ঠে," বীথি চলো বাইরে যাই, তোমার ভালো লাগবে, রাতের অন্ধকারে তোমাকে কবিতা শুনাবো, নতুন লেখা কবিতা। "

বীথির শরীর যেনো ঠান্ডা হয়ে আসছে, ভয়ে পিছনে তাকাতে পারছে না, ঘন নিঃশ্বাসে  গোঙানির  মতো করে কাজের মেয়েটাকে  ডাকছে




No comments

Powered by Blogger.