মাইশা: মাহবুবা স্মৃতির গল্প

মাইশা

মাহবুবা স্মৃতি






agooan - mahbuba smrity - golpo - maisha - webmag - আগুয়ান - মাহবুবা স্মৃতি - গল্প - মাইশা - ওয়েবম্যাগ
মাহবুবা স্মৃতির গল্প - মাইশা







গভীর অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটিতার দুহাত ওড়না দিয়ে ঢাকা, অন্ধকারের জন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না
আলো থাকলে দেখা যেত, মেয়েটার হাতে ধরে রাখা ছুরি থেকে টপটপ করে রক্তের ফোঁটা পড়ছে!
হ্যাঁ, মেয়েটি একটু আগে একজনকে খুন করে হেঁটে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে, আঁড়াল হতে চাচ্ছে সমাজ থেকে! এই সমাজ তার পছন্দ নয়

পিছনে হঠাৎ কিসের একটা শব্দ হয়, মেয়েটা ভিতরে ভিতরে চমকে উঠলেও নিজেকে সামাল দেয়।তারপর প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের বাসায় আসে।কোনোমতে দরজা লাগিয়েই সে হাঁপাতে থাকে! পুরো বাসা নিরব। ওর বাবা-মা গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেছে। অসহায় লাগে মেয়েটির খুব
এক পর্যায়ে হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে হাতভর্তি রক্ত! বমি আসার উপক্রম হবার আগেই সে বেসিনে তার হাতটা ধুয়ে নেয় ভালোভাবে। রুমে এসে শান্তভাবে ভাবতে থাকে, সারাদিনের ঘটনা
হ্যাঁ, অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছিলো সে। মন বেশি ভালো না ওর। ফাহাদের সঙ্গে গত তিনধরে কথা হয় না। কথা হবে কি করে? নিজেই ফাহাদের সঙ্গে ব্রেকআপ করে দিয়েছিল। সেটার জন্যও মন খারাপ নয়মন খারাপ তখনি হলো, যখন সে ফাহাদকে একটা মেয়ের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে ঢুকতে দেখে। মাথা গরম হয়ে যায় ওর। অফিস বন্ধ হবার পরও দীর্ঘক্ষণ সে তার অফিসে বসে থাকে।পরে অফিস থেকে বের হয়ে কিছুক্ষণ শহরটায় ঘুরে একা একা। এক পর্যায়ে রিক্সা ছেড়ে দিয়ে হাঁটা শুরু করে। আজিমপুরের গোরস্তানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাশের একটা ভাঙা বিল্ডিং থেকে হঠাৎ সে কারো গোংরানোর শব্দ শুনতে পায়ভয় লাগলেও এগিয়ে যায় শব্দের দিকে। যা ভেবেছিল তা'ই। মাথায় রক্ত চেপে যায় ওর।একটা মেয়ের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছিল কুৎসিত দেখতে একটা ছেলে! মেয়েটার হাত-পা- মুখ বাঁধা। আর কি! ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে পেছন থেকে ইচ্ছা মতোন আঘাত করতে থাকে লোকটিকে, লোকটা চিৎকার করে উঠে। তবুও থামে না সে। তারপর কোনোমতে মেয়েটির হাত-মুখের বাঁধন খুলে। মানুষের শব্দ পেয়ে দ্রুতই স্থান ত্যাগ করার জন্য পা বাড়ায়। আহত মেয়েটি অস্ফুট শব্দে কিছু একটা বলে। সে বুঝতে পারে।তাই উত্তরে বলে,"মানবী!"

আর দাঁড়ায় না সে, দ্রুত হাঁটা দেয়
হ্যাঁ মানবী নামের মেয়েটি আজ একটা ছেলেকে খুন করেছে। যদিও এটা তার সঙ্গে ঘটা প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও দুবার এরকম ঘটনা ঘটিয়েছে সে
বয়স যখন তের, তখন প্রথমার খুন করার চেষ্টা করেছিল ওর চাচাত ভাইকে। কিন্তু পারেনি! দ্বিতীয় বার যখন ভার্সিটিতে পড়ে তখন। হাসপাতাল মারা গিয়েছিল লোকটি। প্রতি ঘটনার পিছনে একটাই কারণ ছিল। আর তা হল ধর্ষণ!
ঘৃণা করে সে পুরুষ সমাজকে। কিন্তু ফাহাদকে অন্যরকম ভেবেছিল মানবী। সে- কি! আর কিছু ভাবতে পারে না সে

হয়তো ফাহাদের রাগটাও ছেলের উপর পড়ে। তে মানবী কোনোভাবেই ভেবে পায় না, যে দেশে বিশ-ত্রিশ টাকায় পতিতা পাওয়া যায়, সে দেশে কেন ধর্ষণ হবে! কেন জোরজবরদস্তি করে নিজের চাহিদা মেটাবে একটা মানুষরূপী পিশাচ!
মানবী নিজেই নিজের মাথা নাড়ায়, "একদম ঠিক করেছি। উচিৎ শিক্ষা হয়েছে কুলাঙ্গারটার। যে দেশে বিচার হয় না, সে দেশে এভাবেই মারতে হবে!"
তারপর মানবী আবার ওর হাতটা বেসিনে ভালোভাবে ধোয়। গা ঘিনঘিন করছে ওর। বমি করে দেয় সে। তারপর চোখেমুখে ভালোভাবে পানি ছিটায় ও। ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে দেখে ফাহাদ ফোন দিচ্ছে। ধরবে না ধরবে না করেও ফোন ধরে সে

-"কি ম্যাডাম? ঘুমিয়ে পরেছিলেন? "
-"ফোন দিছো ক্যান তুমি?"
-"ইচ্ছা হয়েছে, এজন্য দিয়েছি। তাছাড়া ফোনটা আমি আমার হবু বউকে দিয়েছি, কোনো সমস্যা? "
-"হ্যাঁ সমস্যা, ফোন কেন দিবা তুমি? তুমি ফোন দিবা না"
-"ফোন দিবো না! আচ্ছা এখন নাহয় একটু কথা বলে রেখে দেই, তারপর যখন তোমার মাথা ঠাণ্ডা হবে, তখন চুটিয়ে প্রেম করবো, কেমন! "
-"আমি নিষেধ করছি ফোন দিতে, আর তুমি প্রেম করার চিন্তা করো! ফোনই দিবা না আর তুমি.."
-"আমি ফোন দিবো না!"
-"না দিবা না তুমি, দিতে পারো না, রেস্টুরেন্টে যখন মেয়ে নিয়ে যাও, তখন মনে থাকে না বউয়ের কথা? এখন কেন ফোন দিবা তুমি! পুরুষ মানুষকে চেনা আছে.." বলেই মানবী অনেকক্ষণ বকাঝকা করে ফাহাদকে, ফাহাদ চুপচাপ শুনে, তারপর বুঝানোর চেষ্টা করে। যাকে সে দেখেছে, মেয়ে তার কাজিন, দেশের বাইরে ছিলো অনেকদিন। যার কথা সে মানবীকে অনেক আগেই বলেছিল, দেশে এসেছে দুইদিন আগে। সামনের মাসেই বিয়ে।বিয়ে উপলক্ষ্যে ওকে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে যায়, সব থেকে বড় কথা, ফাহাদের কাজিন ওর চেয়ে বয়সে বড়!
সব শুনে মানবী শান্ত হয়
হঠাৎ' ফাহাদ বলে, "জানো, আজিমপুরে আজ একটা খুন হয়েছে কিছুক্ষণ আগে।খুন হয়েছে বলতে মারাত্মক জখম করেছে লোকটাকে কেউ।এম্বুলেন্স আসতে না আসতেই মারা যায় লোকটি! সবগুলো চ্যানেলেই দেখাচ্ছে সেটা।সমস্যা হলো জখম হওয়া লোকটার পাশেই একটা আহত মেয়ে সেন্সহীন পড়ে ছিল,এখন অবশ্য হাসপাতাল ভর্তি আছে মেয়েটি। জ্ঞাণ ফিরলে জানা যাবে, কি ঘটেছিল সেখানে।অদ্ভুত না বলো!"
মানবী কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে, "আমি পরে কথা বলছি তোমার সঙ্গে।"বলেই ফোনটা রেখে দেয় সে।তারপর টিভি অন করে কয়েকটা চ্যানেল ঘুরায়। নিউজ দেখে রাগ হচ্ছে ওর
"টিভি লোকদের কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই! নিজেদের মতো করে গল্প বানিয়ে সেটা প্রচার করছে চ্যানেলগুলোতে! ওদের ধারনা, যে খুন হয়েছে তাকে কোনো ধর্ষক খুন করেছে! আর আহত হওয়া মেয়েটি খুন হওয়া লোকটার পরিচিত কেউ! "গালি লাগায় সে।তারপর টিভি বন্ধ করে ঘুমাতে যায়
সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যায়, অফিসে গিয়ে ছুটি নেয় সে। তারপর ঢাকা মেডিকেলের দিকে দৌড়ায়। হাসপাতাল গেলে গেটে একজন পুলিশ ওকে আটকায়
"আপা ভিতরে যাওয়া নিষেধ।"
মানবী হতাশ হয়ে বলে,"মেয়েটা কেমন আছে?"
-"বাসায় গিয়া টিভি খুইল্যা দেখেন, কেমন আছে।এইখানে ভিড় করবেন না তো..."মানবী রেগে গেলেও কিছু বলে না। কিছু না বলে সে বাসায় চলে আসে। টিভি ছেড়ে দেখে একই অবস্থা। ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা। তবে মন্দ লাগে না ওর! অপরাধীর বিচার হচ্ছে তো! সেটাই বা কম কিসের? হোক না সেটা নিজের আদালতে! কেমন পুলকিত বোধ করে মানবী

তবুও কিছু ভালো লাগছে না ওর। ফাহাদের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছেগতকাল কথা না বলেই ফোন রেখে দিয়েছিল। ফোন দেয় সে ফাহাদকে
"-হ্যালো কে বলছেন?" ফাহাদ একটু ভাব নেয়ার চেষ্টা করে
"একজন মানবী! যে কিনা পৃথিবীর কোনো পুরুষকে বিশ্বাস না করলেও একজনকে করে, সে হচ্ছে ফাহাদ!"
-"তাই নাকি! মানবী এতো পাগল! জানতাম নাতো! তা আপনার নামটা কি ম্যাডাম?"
-"মাইশা! আমার নাম মাইশা।এবার চিনে নাও মাইশাকে!"


No comments

Powered by Blogger.