তামীম চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ

তামীম চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ





agooan bangla webmag online magazine poem kobita tamim chowdhury আগুয়ান ওয়েবম্যাগ বাংলা অনলাইন ম্যাগাজিন কবিতা গদ্যকবিতা পদাবলি কবি তামীম চৌধুরী
তামীম চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ




তৃষ্ণাগ্রস্ত

দীর্ঘক্ষণ তাকিয়েছিলাম
কিন্তু কিচ্ছু দেখিনি কসম!
মুখখানি প্রস্ফুটিত হয়েও
কেমন যেন অগোচরে আছে

ভালোবাসায় তৃষ্ণা ফুরালে
সেই ভালোবাসা বিকলাঙ্গ
এক মুখ এতো করে দেখেও
কিঞ্চিত তার দেখা হয় না
অদেখাই থাকে!

তোমার দর্শন পাওয়া মানে
একটি ঘোড়া অনেক পথ দৌড়ে
সমুদ্রগ্রাসী তৃষ্ণায়
সবেমাত্র এক ঘটি জল পেয়ছে

ভালো করে একটু দেখার জন্যে
আমার দৃষ্টির জিহ্বা বেরিয়ে
নিচে পড়ে যাচ্ছে

ঘোড়াটা
হাঁপাচ্ছে!


পাখি

আমার ম্লানমুখ দীর্ঘজীবী হলেও
ফুলের মুখ যেন মলিন না হয়
জীবনের মাকড়শা এখানে
হাসির জাল বুনে বুনে ক্লান্ত হোক

তোমার তুষার চাপাপড়া বসন্ত
উদ্ধার করতে গিয়ে যদি আমার
সমূহ বসন্তটি হারিয়ে যায়, যাক!

স্বর্গে পল্লব-আচ্ছাদিত
গাছ হয়ে জন্ম নিতে পারবো
রকম খানিক নিশ্চয়তা পেলে
অনায়াসে ছেড়ে দেবো মানবজীবন

জোড়া হয়ে এসে
তুমি বসবে শাখা-প্রশাখায়
আর তোমার পায়ের আঘাতে
মহানন্দে দুলে ওঠবে
আমার সব পত্রপুষ্প

কারো পায়ের স্পর্শেও
কারো জীবন সার্থক হয়

... করুণ গাছটিতে তোমার দয়ার্দ্র পা দুটি রেখো!



তোমাকে দেখা

তোমাকে দেখলে ভয় পাই
আলমারি থেকে পরিধেয় জামা তুলে আনতে গিয়ে
কাপড়ের স্তুপে আমি যেন আকস্মাৎ একটি সাপ দেখে
        চমকে উঠেছি
আবার তুমিই সকল ভীতি দূরীভূত করো
সাহস-সঞ্চারিণী তোমার মুখদর্শনে
চোখের দ্যুতি বাড়ে
তোমাকে দেখা মানে
প্রাণপণ দৌড়াতে দৌড়াতে দীর্ঘসময় পর
চিতার দৃষ্টি এড়িয়ে লুকিয়ে পড়া হরিণের প্রশান্তি
তোমাকে দেখলে বুকের ভেতর
এটা-ওটা এই-সেই
তোমাকে দেখলে একটি গাছের সকল শাখায়
দমকা হাওয়ার হঠাৎ দুলনি



অমরত্ব

পাখিটাকে বললাম, শিস্ দাও
পাখিটা শিস্ তো দিলোই না
বরং ডানা নাড়িয়ে বিরক্তি দেখালো

উঁচু কামরাঙা গাছের
টিয়েটাকে বললাম, ওড়ো
টিয়েটা চিকন ডালে বসে থেকেই
এক পা উপরে টান দিয়ে অপমান করেছে

অথচ তুমি (!) সেদিন বিকেলে
বারান্দার প্রান্তসীমায় পড়ে থাকা
ডানাভাঙা মাটির পাখির দিকে
খানিক তাকাতেই
পাখিটা আকাশে
              উড়াল
                     দিয়েছে (!)

তোমার চোখের ইশারায়
ওড়ে মাটির শালিক
আমার গোপন বিশ্বাস রকম
তুমি যাকে 'ভালোবাসি' বলবে
                সে পাবে অমরত্ব


পাথর

প্রতিদিন কিছু-না-কিছু পাথরের সাথে পরিচয় হয়
এই বুকে একটিও গোলাপ নেই, অসংখ্য পাথর আছে
যতোবার বুক উন্মুক্ত করে আমি মানুষকে দিয়েছি প্রেম
ততোবার আমার বুকের মধ্যে তারা পাথর ফেলে চলে গেছে

মানুষের নামে আমি পাথরের নাম রেখেছি
আমার বুকের ওপর এখন
অগণিত পাথর আছে মানুষের নামে...

...আর এইসব পাথরের একটিও আমি সরাতে পারিনি



উন্মোচন 

মাংসের আড়ালে লুকিয়ে রাখা
মাছের সুবিন্যস্ত কাঁটার মতো নিজের ভেতর
বিন্যাস করে সাজিয়ে রেখেছি 'দুঃখ'

অথবা তোমাকে!

আমার হাড়গুলো খুলে খুলে দেখতে পারো
কোন হাড় কাকে চেয়েছিলো
কেনো আমি কাস্তে হাতে
পাহাড়ের সমুখে দাঁড়িয়েছিলাম?


কাক 

তোমাকে না পাওয়াতে
যেটুকু কষ্ট পেয়েছি, সয়ে যাবে
তবে যে আক্ষেপটি আমি কিছুতেই
দূর করতে পারবো না তা হলো-
তোমার জোড়াটা খুব বেমানান
শুনলাম- বিয়ের দিন অতিথিরা
তা নিয়ে পেছনে এটা ওটা বলেছে

আমারো এই ভেবে খুব খারাপ লাগে যে-
এখন একটি টিয়েপাখি রোজরাতে
একটা কাকের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে
একেকটি পালক খুলে খুলে তার সৌন্দর্য দেখায়

আজকাল চোখ বন্ধ করলেই
কামরাঙা গাছে টিয়ের ওপরে টিয়ের বদলে
একটা কাককে বসতে দেখি- কী বিশ্রী দেখায়!

পারলে তোমার জোড়াটাকে
একটু ন্যায় অন্যায় শিক্ষা দিয়ো;-
সেদিন এই সর্বভুকটিকে
অন্য আরেকটা দূর্বল কাকের
খাদ্য ছিনতাই করে ঠোঁটে নিয়ে ওড়ে যেতে দেখেছি



গতকাল সারারাত

মদ খেতে খেতে
একটি জোনাকপোকা হয়ে
গতকাল তোমার আঁধারে হারিয়ে গিয়েছিলাম
আর আমার পাখনায় মুহুর্মুহু আঘাত করেছে
                   স্মৃতির শিলাবৃষ্টি

গতকাল মদ খেতে খেতে
নদীর কিনারে একাকী শৃগাল হয়ে
ওপারে চলে যাওয়া প্রতারককে আমি
                       মধ্যনিশিতে ডেকেছিলাম

গতকাল খুব করে মদ খেয়েছি
তোমাকে ডেকেছি মদ্যপ হলে
ফসকা গিঁটের দঁড়িতে টান দেবার মতো
খুলতে থাকে অতীত মনে পড়ে- যৌবনের
প্রথম চুম্বন মনে পড়ে- সমুদ্রের তলে
আমাকে টেনে নেয়া কুমিরের মুখ
           খুনী হাঙরের চোখ

মনে পড়ে- মাচায় সুবজের সৌন্দর্য আমাকে
মোহাচ্ছন্ন করে ফেলায়, আমি লতায় প্যাঁচানো
বর্ণচোরা লাউঢুগিটাকে না দেখেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম

মনে পড়ে মনে পড়ে মনে পড়ে
মদ খেতে খেতে মদ খেতে খেতে
মনে পড়ে মনে পড়ে মনে পড়ে
মদ খেতে খেতে মদ খেতে খেতে
নদীর কিনারে শৃগাল হয়ে দাঁড়াই
তোমাকে ডাকি তোমাকে ডাক দেবার
পর মুহূর্ত থেকেই ভোরের আযান অব্দি
আমাকে তাড়িয়ে মেরেছে স্মৃতির কুকুর

গতকাল সারারাত
সাপের মুখে ব্যাঙ ছিলাম


লক্ষ্য 

সব ফুল ছিঁড়ে  নিলেও  কমতি হবে না
আমার ডালপালায় শীতেও বসন্ত রবে

            প্রত্যুষে বিকেলে
              দুপুরে রাতে
       সকাল কিংবা গোধূলিতে

সকল সময় আমি ফুল ফোটাতে জানি
কয়টি ফুল তুমি খোঁপায় গাঁথবে, গাঁথো

তোমার খোঁপায় ফুল জোগান দিতে
বারোমাসি  ফুলগাছ  হয়ে  জন্মাবো
               তোমাদের
                উঠোনে



বিলুপ্তপ্রাণী

এখানে দাঁড়িয়ে
কে বলতে পারবেন
'আমি মানুষ'

যখন পুষ্পিত বৃক্ষ নেই
রমণীর চোখের ভেতর
বুকের কাছে আছে
খটখটে নদী

যখন ঈগলের শিকারি পা
আত্মগোপন করে আছে
প্রেমিকের আঙুলে

এক খাটে শুয়েও যখন
মনের ভিতর থাকে পৃথক পালঙ্ক
প্রতিশ্রুতি মানে আড়ালে প্রবঞ্চনা
গাছের সৌন্দর্য খুন করে
তোমরা সজ্জিত করো ঘর

ঘর্মাক্ত দুপুরে এতো দূর এলাম
লোকারণ্যের ভেতরেই ছিলাম
জনসভা পেরিয়ে এসেছি
তবু মানুষের সাথে দেখা হলো না
তোমাদের সাথে বাক্যব্যয় হলো
মানুষের সাথে কথা হলো না

কেউ একজন
এখানে দাঁড়িয়ে
বলুন 'আমি মানুষ'

মানুষের সাথে পরিচিত হবো
একান্তে কাটাবো কিছুটা সময়

কর্মজীবন

একটা চাকরি নিয়ে
তাতে মজা পেয়ে গেছি
অতএব ছুঁটিছাটা নিচ্ছি না কিছু
কেউ আমাকে পদচ্যুত করতে চাইলে
তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে দেবো
এমনকী যে আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন
সে- যদি ছাঁটাই করতে চায়
তার নাকেও বড়সড় একটা ঘুষি
               
চাকরিটা অবশ্য অবৈতনিক
টাকাকড়ি পাই না যদিও
তবে নিয়োগকর্তার সহিত
অন্য এক ধরণের লেনাদেনা আছে
আমি তার দুঃখে সমব্যথী হই
সে- আমার ভারাক্রান্ত সময় পাশে দাঁড়ায়
দুজন এক মুখে হাসি
তাই আনন্দের পরিমাণটা সমান

আমার নিয়োগকর্তার সাথে আমার সম্পর্কটা
নদী জলের সাথে তুলনা করলে তা- করতে পারেন-
আমি তাকে 'জল' দিই, বিনিময়ে
সে আমাকে প্রতিমুহূর্তে 'ঢেউ' ফেরত দেয়

এমনটা কখনো দেখেছেন
কর্মী মালিককে ধমকাতে?
হুম, আমাদের মাঝে
মালিক কর্মচারীর আচরণ নেই;-
চোখ-টেপাটিপি আছে
গোপনে আরেকটা জিনিসও আছে
গোপনে সে আমাকে যৌবন দিয়ে
পুরুষ বানিয়ে তুলছে

আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই, এটুকুর বিনিময়ে
এতো বড় একটা প্রতিষ্ঠানের সকল নথিপত্র
আমি একাই ঘাঁটাঘাঁটি করে ঘাম ঝরাচ্ছি
আমি একাই টেবিল থেকে টেবিলে দৌড়াচ্ছি
উক্ত প্রতিষ্ঠানের আমিই প্রথম শ্রেণি
আমিই তৃতীয় শ্রেণি, আমিই দ্বিতীয় শ্রেণি

যোগদানের আগেই বলে রেখেছি
দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি যেন তার প্রতিষ্ঠানের
বারান্দায় পর্যন্ত পা রাখতে না পারে

অর্থাৎ,
আমিই কেরানি
আমিই পিয়ন
আমিই ব্যবস্থাপক
আমিই বাধ্যগত দারোয়ান

এলোমেলো দুরবস্থা 

তুমি আমাকে ভালোবাসার সময়
আকাশে শালিক দোয়েল টিয়ে নয়
আমি উটপাখিদেরও উড়তে দেখেছি

তারপর একদিন
আমাকে ছেড়ে তোমার চলে যাওয়া
আমি ডুবে গেছি কুমিরভর্তি
                নদীর ভিতর

এখন স্বপ্নের উঠোনে দৌড়ায়
জোড়াভাঙা বাসনার গলাকাটা কবুতর...
বিশেষ কেউ চলে গেলে পায়ের গোড়ালি খুলে যায়
তোমার চলে যাওয়াতে আমার দু পায়ের গোড়ালি
হারিয়ে ফেলেছি; দ্যাখো;- ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারছি না

No comments

Powered by Blogger.