শাহিন চাষীর কবিতাগুচ্ছ


শাহিন চাষীর কবিতাগুচ্ছ





শাহিন চাষীর কবিতাগুচ্ছ
শাহিন চাষীর কবিতাগুচ্ছ







অস্তিত্ব

নিজেকে খুঁজি-
সকাল- সন্ধ্যার ব্যবধিতে,
নিশুতি রাতে, ভোরের আভায়,
দরোজার চৌকাঠে, আকাশ গঙ্গায়,
কোনখানে আমি নেই!

মহত্বের উঠোনে, পশুত্বের বনে,
কবিতার শব্দে, গানের সুরে,
ফসলের মাঠ হতে নদীর তীরে,
সবখানে খুঁজেছি অবিশ্রাম
সেখানেও আমি নেই!

শান্তির ছায়া থেকে দ্রোহের মিছিল
বিনাশী রোদে, সৃষ্টির উষ্ণতায়,
সত্যের উদ্ভাসে, মিথ্যার মায়ায়,
সবখানে রেখেছি চোখ
ওখানেও আমি নেই!

বিশ্বাসী নিঃশ্বাসে, অবিশ্বাসী চোখে
স্বর্গ মোহনায়, নারকীয় গলিতে
শয়তানের ভ্রুকুটি, সাধুর হাসিতে,
হেঁটেছি সেখানেও একাগ্র আনমনে
আমি নেই, আমি নেই!

প্রেমের সুধায়, ঘৃণার বিষে
অভিশাপ আঁধারে, আশীষ ফেনায়,
অভিমানী দোলে, দীর্ঘশ্বাস হাওয়ায়,
দেখলাম রুদ্ধবাক বিস্ময় ভরে
তার মাঝেও আমি নেই!

পৃথিবীর সমস্ত মাটি কণায়
বাতাসের আঁচলে, সময় ভগ্নাংশে
বৃক্ষের শাখায়, ফুলে বা ঘাসে-
আমার ছায়া দৃশ্যমান হতেই
বিলীন- উধাও- অদৃশ্য
আমি এক পরম শুন্য



স্বপ্ন চক্র                                                                 

সময়ের বুকে বিন্দু বিন্দু ব্যথা--
ক্লান্ত কৃষকের বিধ্বস্ত শরীর ছোঁয়া ঘামের ঘামাচি,
মুক্তির অন্বেষায় চোখ--
           প্রখর রোদে চাতকের হা করা ঠোঁট

ঈশানের আঁচলে নিগ্রো মেঘ,
রোদের আগুন ঠেলে ঊনপঞ্চাশ বায়ু,
ভয়ের পিছনে পিপীলিকা স্বপ্ন:
                   জীর্ণ ধুলোর ডানায় ব্যর্থতা দূর

বাউল পায়ে মেঠো পথে বৈশাখ,
মনের বাঁশিতে নতুন আশার লাল- সাদা সুর
চারিদিক, চারপাশ....

কালের পথিক সময়ের গায় আবার সঞ্চিত--
ঘামের বিন্দু:
নতুন ব্যথা, অপত্য দীর্ঘশ্বাস



ক্ষেদ

লৌহের গলনাংকে সূর্য উত্তপ্ত হতেই
তোমার কাছে চেয়েছি মেঘের ছায়া
বিকিরিত তাপে পুড়েছে সমস্ত শরীর,
পাঁজর কাঠিতে হৃদপিণ্ড কাবাব,
তুমি প্রশান্ত নিরুদ্বেগ-অবিচল স্থির

রুক্ষ মেঘের রুদ্র হুংকার শুনে
ভয়ার্ত শঙ্কায় চেয়েছি এক মুঠো আলো
বিজলির বিদ্যুৎ পাখায় ঝলসালো মন,
শিলার পাথুরে ঢিলে ক্ষত-বিক্ষত মাথা,
তুমি- পাষাণ, পাহাড় মূর্তি অকারণ

বিদঘুটে গাঢ় অন্ধকারে হারিয়েছি পথ,
চাঁদের জন্য হয়েছি করজোড় নতজানু,
বন্ধুর পথে হেঁটেছি যেমন ঘাণির বলদ !
কাঁটায় কাঁটায় রক্তাক্ত বিক্ষত পা,
তুমি এক মাছের মা অত্যাশ্চর্য অদ্ভুত

কবিতার জন্য ভিখারী হলাম অনুক্ষণ,
অশ্রুর অক্ষরে খুঁজেছি নীহারিকা,তারা,
ভাবনা উড়েছে আহত পাখির ডানায়-
কেঁদেছি আমি ঝিমধরা নীল ব্যথায়-
অদৃশ্য তোমার মুখ মেঘের ঘোমটায়

সংকট- সংশয়-দ্বিধায় তোমার কাছে
শরমের মাথা মুড়ে যতবার গেছি ছুটে-
প্রেরণা কাতর-  অবজ্ঞা অবহেলায়!
আমার দীর্ঘশ্বাসে বয়ে গেছে ঝড়-
তুমি হেসেছ বোসে উপহাস মোহনায়!

সময়ের সাথে আমি আজ যুদ্ধবাজ
বিষের জ্বালা সয়ে হয়েছি নীলকণ্ঠ,
তুমি এখন আমার এক নষ্ট কবিতার
দলা পাকানো পরিত্যক্ত টুকরো কাগজ,
আবর্জনার স্তূপে যার নিষ্কন্ট অধিকার



কাল্পনিক দৃশ্য

একটি কাল্পনিক দৃশ্য
চোখের প্রেক্ষাগৃহে এইবেলা চলচ্চিত্রময় নদী

মানুষ রেসের ঘোড়া,
সামনেই বিস্তৃত কেবল আগুন আর অন্ধকার;
কালের ভৌগলিক রেখায় সদা তৎপর
দ্বিতীয় মেধার চতুর শিম্পাঞ্জী, হনুমান, বানর

বাতাসে বিলুপ্তির ধ্বনি
দিগন্তের গাঁয়ে উজ্জ্বল কাহিনীর ধূসর অক্ষর:
কোন একদিন মানুষ ছিলো এই পৃথিবীর 'পর



ধরিত্রীর স্বর                                                 

কাপড় খুলে নিয়েছো আগেই,
মিনতি করি-- অন্তর্বাসটুকু শরীরে থাকতে দাও
কান হারালেই হেঁটে যাবো ঠিক মধ্যরেখায়

এই যে তোমরা লোলুপতায়
যেমন ইচ্ছে টেনেই যাচ্ছো আমার ভরাট স্তন,
দুধের শূন্যতায় যদি এলো রক্তের ধারা
পুষ্টিহীনতায় তোমরাই কঙ্কালসার অবশেষে!

কখনো কী অনুভব করো--
তোমাদের অসহ্য অত্যাচারে সদা শঙ্কিত আমি!
শেষ পর্যন্ত যদি গণরিয়া শরীর ছুঁলো
পারবে নাকি ডুব দিতে সুখের অতল ঘুমে?

বুকে নির্ঘুম আগুনের তাপ,
আমার জমাট ব্যথাতে আজ গলনের পূর্বাভাস,
যদি মুক্ত হলো অতীতের সজীব ক্রোধ
তোমরা ভেসে যাবে ভয়ানক বিভীষিকায়!

বিলাসের নগ্নতা ভুলে যাও,
কষ্টের সুক্ষ্ম পরমাণু হৃদয় কবরেই ঘুমন্ত থাক;
তোমাদের ঠোঁটে কেবল আনন্দ নেচে যাক



বিড়ম্বনার রেণু                                           

সুক্ষ্ম চাতুরীর খেলায়
মৃত্যু এখন বুক পকেটে নিঃশব্দে একান্ত আপন
বাষ্পীয় ডানায় দূরের পথে যাবতীয় স্বপ্ন!

সারাক্ষণ বলে মন--
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সুনিশ্চিত- চরম এক মিথ্যুক;
সংশয়ে, এক টুকরো প্রমাণ:
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি
মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি...

আমি বেশ দ্বিধাহীন--
জীবনানন্দ দাশ ভেতর মনে ঠিক উন্মাদ পাগল;
তাইতো কলম বকেছে প্রলাপ:
শাদা শাদা ছোটো ঘর নারকেলক্ষেতের ভিতরে
আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে--

আমি বুঝতে পারছি--
মুক্ত ভাবনার সকল মহান- যথাবোধেই প্রবঞ্চক,
তাঁদের খেয়ালেই চেতনায় স্থির:
তুমি মিশ্রিত লগ্ন মাধুরীর জলে ভেজা কবিতায়
আমার দেশ সব মানুষের, সব মানুষের...

আজন্ম শুনেছি--
এই মাটি ঠিক মায়ের আদরে মাখা খাঁটি সোনা
অথচ এখানে অরণ্য আগুন
নাগরিক চোখে ঘুমহীন উৎকণ্ঠার নীলাভ ঢেউ
প্রাণের গহীনে অচেনা ভয়ের বরফ কুচি!

মৃত্যু এখন সঙ্গী আমার
আমি বলি তাই কণ্ঠ ছেড়ে একদম অবলীলায়,
কালোকে যারা চিনালো সাদা বলে
সেইসব কুশীলবের যথার্থ বিচার চাই



নীল সময়ের কবিতা                                      

বেশ বুঝতে পারছি--
রমনার বটতলায় যেতে ইচ্ছেরা অবাধ্য ভীষণ;
আমারও মন উড়ছে বেয়াড়া রকম--
হাকিম চত্বরে মুখোমুখি বসে,
তোমার চুমুর স্বাদ নিই পিঁয়াজু বা চায়ে

ধারণা করছি,
আবীর অভিমানী হলেই--
তোমাকে ঘিরে ধরে সবুজ পাহাড়, প্রমত্ত সমুদ্র..
আমিও নীরবেই ভাবছি খুব--
তোমার সাথে পাশাপাশি, মুখোমুখি
সুরমার তরঙ্গে তন্ময় শুনি অনুযোগের বাঁশি

আমি জানি,
আবদ্ধ ঘরে মনমরা আজ তোমার হাসি দম;
আমারও নয় তার ব্যতিক্রম!
কতদিন হাঁটিনি হাত ধরে, একসাথে
কতদিন হয়নি ভাসা রঙিন স্বপ্নের মোহনায়

আর কয়েকটা দিন,
জনহীন দ্বীপেই ঘণীভূত হোক প্রতীক্ষা প্রেম;
সামনেই গোলাপ উচ্ছল দিন,
অদূরেই কাশ কোমল আলোর আয়োজন
আবারও হবেই উষ্ণতার সালোক সংশ্লেষণ

এখন বাতাসে বিষ,
এসো আজ কোরাসেই গাই-- বিচ্ছিন্নতার গান;
কালের মাঠে নাচুক ভাবনাহীন স্বজন
তারই সাথে আমাদের সেই চির দুরন্ত প্রাণ



প্রশান্তির খোঁজে                                            

বিশ্বাস করো,
তোমাকে ভাবিনি এতটুকুন বিগত বাহাত্তর ঘন্টায়
আকাশেও ভাসেনি মুখ মায়াময় উষ্ণতায়

অথচ আমরা একসাথে--
চৌহাট্টার মোড় হয়ে ব্যস্ততম কোর্ট চত্বরে,
পাঁচ ভায়ের ছায়া ছেড়ে প্রশান্ত সুরমার তীর ধরে

কখনো আবার
হাকালুকির বুকে জ্যোৎস্নার নৌকায়
হৃদয়ের উচ্ছ্বাসে হয় জীবনানন্দ নয় রবীন্দ্রনাথ,
অথবা টিলাগড়ে অমৃত প্রহর-
চোখে বাঁধা চোখ, ঠোঁটের সাথে ঠোঁট, হাতে হাত..

আবার হঠাৎ
সুরমা গেটে সাত রঙ চায়ের সাজানো দোকান,
মাধবকুণ্ডু, জাফলং বা জৈন্তিয়া' মনখেমে গান..

কখনো চুপচাপ
স্বপ্নময় ভালবাসার টানে
দরগার দরোজায় পাশাপাশি কত প্রার্থনা করে
অথবা মুখোমুখি দূর পাহাড়ে কারুজ ছোট্ট ঘরে

সত্যি এখন আর
তোমাকে ভাবি না এতটুকু ভুলেও সকাল- সাঁঝে,
অথচ ঘুমেও প্রশান্তি খুঁজি কবোষ্ণ বুকের মাঝে



শান্তির ক্যানভাস                                            

গোপনে- প্রকাশে বারবার
ভালবাসার রঙে শব্দের দাগ- বৃত্তাকার খেয়ালে,
কল্পনার কাঁধে সতেজ পৃথিবী, মুক্ত আকাশ...

হৃদয়ের গহীনে খুশির বৃষ্টি:
বাঁধাহীন নদীতে ছোট- বড় ঢেউ দুরন্ত প্রজাপতি
ফুলেদের ঠোঁটে হাসির গোল্লাছুট
ঘাসের ডগায় মিষ্টি ঘ্রাণের ঘুমহীন লোবান
আলোর সরোদে কূজনের ঠাঁটে বিমূর্ত স্বরলিপি

বাকহীন, অপলক দেখছি--
সীমাহীন সুখে মাথার উপর মাছেদের উড়াউড়ি
বেজির হাত ধরে হেঁটে চলে প্রেমিক সাপ
সাঁতার প্রতিযোগিতায় নিমগ্ন পাখি ঝিঝি
আর প্রশান্ত মনেই স্বপ্নের শয্যায় চুপচাপ ঈশ্বর

আমি আকাশ আঁকছি,
পৃথিবীর পথে ভাবনাহীন প্রাণের অরূপ মিছিল
বাতাসের দোলনায় আযান, ঘন্টা, শঙ্খ...

No comments

Powered by Blogger.